দায় কি শুধু ঐশীর একার!

ঐশী রহমান। বয়স ১৭ কি ১৮। পুলিশ ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও স্বপ্না রহমান দম্পতির একমাত্র মেয়ে। ইতিমধ্যে এই ঐশী নামটি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে খুনি হিসেবে পরিচিত। আর কেউ নয় বাবা আর মায়ের খুনি এই ঐশী! তাই ঐশীকে নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে বিস্তর আলোচনা। খুনের দায়ে অভিযুক্ত এই মেয়েটির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই? কেন সে এই কাজ করল, কারাই বা তাকে প্ররোচিত করল- সেদিকে নজর অনেকটাই কম। আমাদের সমাজের কাছে এখন ঐশীর পরিচিতি ইয়াবা-গাঁজা সেবন করে রঙিন দুনিয়ার বন্ধুদের সঙ্গে দিন-রাত কাটানো, সবশেষে বাবা-মায়ের হত্যাকারী? কিন্তু ঐশী আজ কেন এই জায়গায়— এই প্রশ্নটির উত্তর নেই? ঐশী বাবা-মাকে হত্যা করেছে, ধরেই নিলাম সবটাই সত্যি! কিন্তু একদিনে কি ঐশী এই পথে গেছে? যে কেউ এর জবাব দেবেন- না। তাহলে দিনের পর দিন ঐশী খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে মিশেছে, নানা ধরনের মাদক সেবন করে রাতে বাসায় ফিরেছে, তখন তার বাবা-মা কোথায় ছিলেন? ধরে নিলাম বাবা চাকরির প্রয়োজনে মেয়ের দিকে সময় দিতে পারেননি। কিন্তু তার মা তো কোন চাকরি করতেন না। তাহলে তিনিই বা কি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন যে একটি ছেলে আর একটি মেয়েকে দেখে রাখতে পারেননি? মেয়ে ‘নষ্ট’ হয়ে যাচ্ছে তিনি টেরও পেলেন না। আর যখন পেলেন তখন মেয়েকে বন্দি করে রাখার চেষ্টা করেছেন। তাতে ফল হয়েছে হিতে বিপরীত। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বলেছেন, কোন কারণে যদি মেয়ে বা ছেলে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে তাহলে তাদের উপর নির্যাতন না করে নিরাময় কেন্দ্রে বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কেউ যদি আটকে রাখেন তাহলে ফল উল্টো হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। পুলিশ ইন্সপেক্টর এখন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা। তাদের চলাফেরা, মেলামেশা সবকিছুই উঁচু স্তরে। কিন্তু তারা মেয়েকে বোঝার চেষ্টা না করে আটকে রেখে, মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে মেয়েকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছেন। মেয়েরও যে কিছু কথা থাকতে পারে, থাকতে পারে কিছু চাওয়া-পাওয়া সেদিকে তারা একেবারেই নজর দেননি। শুধু তাই নয়, ঘরে আটকে রেখে মেয়েকে বোঝানোরও চেষ্টা তারা করেছেন এমন তথ্যও মিলছে না। শুধু শাসনই করে গেছেন দিনের পর দিন। ক্ষোভ, দুঃখ আর হতাশা থেকে ঐশী কিন্তু নিজেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তখন সে একটি ‘সুইসাইডাল নোট’ও লিখে ফেলে। সেখানে উঠে এসেছে তার হতাশার কথা। নির্দিষ্ট কারো প্রেমে পড়ে বা ঘনিষ্ঠ কোন বন্ধুকে যে সে চিঠিটি লিখেছে তাও নয়। চিঠিতে সে লিখেছে, ‘আমি জানি না এই চিঠি আমি কাকে লিখছি। তারপরও কাউকে না কাউকে কিছু একটা বলতে খুব ইচ্ছে করছে। আমি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। খুবই কঠিন সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার পর আরো কঠিন মনে হচ্ছে, বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে। আত্মহত্যার কারণ আমি কাউকে বলতে চাইছি না। একজনের দুঃখ সাধারণত আরেকজন কখনোই মন থেকে বুঝতে পারে না। আমার আত্মহত্যার কারণ তোমার কাছে খুবই অপ্রয়োজনীয় ও হাস্যকর মনে হতে পারে। সুতরাং সেই ঝামেলাই গেলাম না। আমার এই চিঠিটাকে সুইসাইডাল নোট বলা যেতে পারে। তুমি নিশ্চয় অবাক হচ্ছো জীবনের শেষ কথাগুলো আমার আত্মীয়-স্বজন, বাবা-মাকে না জানিয়ে কোনো একজন অপরিচিত কাউকে কেন জানাচ্ছি। তারা কোনোদিনও আমাকে বুঝতে পারিনি। আমার অনেক খারাপ দিক আছে? সেই খারাপ দিকগুলো চালাকি করে বুঝে ফেলা ছাড়া ভালো দিকগুলো কখনোই তারা বোঝার চেষ্টা করেছে কি-না সন্দেহ?’ বাবা- মা যে কখনই ঐশীকে বুঝতে পারেনি সে কথা এই চিঠি পড়লে স্পষ্ট হয়ে যায়। তার ভেতরে কিছু কথা ছিল যে কথা সে পরিবারের কাউকে বলতে পারেনি, তাই চিঠি লিখে অপরিচিত কাউকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলেছে। তদন্তকারীদের কাছে ঐশী বলেছে, গেল ঈদের আগে সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর এই বিষয়টি বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করে। তখন তারাই ঐশীকে বলেছে, তুই কেন মরে যাবি, তোর বাবা-মা’রই বেঁচে থাকার অধিকার নেই। সেই থেকে ঐশী বাবা-মায়ের উপর আরো বেশি ক্ষুব্ধ হতে থাকে। এক পর্যায়ে ঘটে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড। বিদ্যালয়ের দেয়া তথ্যে জানা যায়, ঐশীর জন্ম ১৭ আগষ্ট ১৯৯৬। এতে বয়স দাঁড়ায় ১৭ বছর। তদন্তকারীরা বলছেন, তার আসল বয়স এর বেশি। এর জন্য ঢাকা মেডিক্যালে পরীক্ষাও হয়েছে। বয়স যাই হোক ১৭ বা ১৮ বা ১৯ বছর হলেও ক্ষতি নেই। সে তো আসলেই একটা শিশু। অনেক কিছুই বোঝার বয়স বা ক্ষমতা তার হয়নি। সেই ঐশী কি-না খুন করল তারই বাবা-মাকে? বাবা-মায়ের আদর-স্নেহের চেয়ে শাসনই বা দিনের পর দিন তার খোঁজ না নেয়ার কারণেই আজকে ঐশীর এই পরিণতি। আমাদের সমাজে ঐশী কিন্তু একজন নয়? অনেক ঐশীই এখন ড্যান্স পার্টি, ডিজে পার্টিতে রাতভর আড্ডা দিচ্ছে। অনেকের সঙ্গে মাকেও এসব জায়গায় দেখা যায়? মেয়ের এইসব উপার্জন নিতে ওইসব মা কোন দ্বিধাই করে না। কিন্তু এরপর কিছু ঘটে গেলে সব দায় ঐশীদের? ঐশীর পরিবারের লোকজন কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের গল্প বিশ্বাস করছেন না। নিহত মাহফুজুর রহমানের একমাত্র ভাই ও এই হত্যা মামলার বাদী মশিউর রহমান রুবেল এ প্রতিবেদককে বলেছেন, তার ভাই ও ভাবি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে অন্য কোনো ‘রহস্য’ রয়েছে। বিষয়টি রহস্যজনক। সেটা খুঁজে বের করতেই অনুরোধ তার। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম অবশ্য মনে করেন, একটা বাচ্চা বাবা-মাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে এই ধরনের ঘটনা ঘটাতেও পারে। তিনি বলেন, এখন মেয়েদের মাদক গ্রহণের পরিমাণ উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে। দেশে ৮০ লাখ মাদকাসক্তের ৩০ ভাগই এখন মেয়ে ? তাদের বয়স ১৪ থেকে ২১ বছরের মধ্যে। তিনি বলেন, কেউ মাদকাসক্ত হলে তার চিকিত্সা না করিয়ে আটকে রাখা হলে তার মধ্যে প্রতিহিংসার জন্ম নেয় এবং এই নির্মম ও করুণ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তাই মাদকাসক্ত সন্তানদের চিকিত্সার উপর জোর দেন তিনি। ঐশী সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাক আর না থাক, পরিকল্পনা, বাবা-মাকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো আর লাশ টেনে বাথরুমে নিয়ে যাওয়ার কথা এ প্রতিবেদকের সামনেই তদন্তকারীদের কাছে স্বীকার করেছে। এমনকি মাকে প্রথম ছুরিকাঘাত করার কথাও সে স্বীকার করেছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দিনের পর দিন পরিবারে নিগৃহীত হওয়ার কারণেই মেয়েটাকে এই পথে নিয়ে গেছে। কারণ সে তার কষ্টের কথা, দুঃখের কথা কারো সঙ্গেই শেয়ার করার সুযোগ পায়নি। পরিবারে যদি এমন একজন অভিভাবক থাকত যার কাছে ঐশী তার সব কথা শেয়ার করতে পারতো, তাহলে হয়তো এমনটি নাও হতে পারতো। ঐশী আজ সমাজের সামনে খুনি না হয়ে ভালো কোন দৃষ্টান্তও হতে পারত। ঐশী যে একসময় মেধাবী ছিল তা তার শিক্ষাজীবন বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। আইডিয়াল স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় সে প্রথম হয়েছিল। কিন্তু সেই ঐশীই অষ্টম শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। আর অক্সফোর্ড থেকে সে ছাত্রত্বই হারিয়েছে। তাই মনোবিজ্ঞানীরা বললেন, ঐশীদের দূরে ঠেলে শাসন করার চেয়ে, কাছে টেনে ধীরে ধীরে চিকিত্সা করিয়ে সুস্থ করলে আর এই ধরনের কোন ঘটনা আমাদের দেখতে হবে না? ঐশী সন্তান নয়, মাদকাসক্ত বিপদগ্রস্ত তরুণী হিসেবে এ কাজ করেছে — ড. মোহিত কামাল মনোচিকিত্সক মাদকাসক্তি চিকিত্সা বিশেষজ্ঞ সন্তান পিতা-মাতাকে হত্যা করতে পারে একথা বিশ্বাস করতে পারছি না আমরা অনেকে। প্রশ্ন হল ঐশী কি তার পিতা-মাতাকে খুন করেছে? নাকি একটি মাদকাসক্ত কিশোরী খুন করেছে এক দম্পতিকে, যে দম্পতি তার মা-বাবা। নাকি ‘ইয়াবা’ নামক ভয়াবহ মাদকই খুন করেছে ঐশীর পিতা-মাতাকে। মাদকে অভ্যস্ত তরুণ-তরুণী হঠাত্ মাদক গ্রহণ বন্ধ করে দিলে আক্রান্ত হতে পারে শিথিলতা, নিষ্ক্রিয়তা, অবসাদগ্রস্ততায়, তীব্র যাতনায় দিশেহারা হয়ে মাদকের জন্য বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভয়াবহ কান্ড ঘটিয়ে ফেলতে পারে। ঐশীর ক্ষেত্রেও ঘটেছিল এমন অনিয়ন্ত্রিত নির্মম, নিষ্ঠুর, বিবেকহীন কান্ড। আমাদের সমাজে মাদক ক্ষতি করছে তরুণ-তরুণীদের ভবিষ্যতকে। এক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কিশোর-তরুণ-তরুণীদের নাম বেশি শোনা যাচ্ছে। এদের সংখ্যা বেশি হলেও মধ্যবিত্তদের সন্তানদেরও এ তালিকা থেকে বাদ দেয়া যাবে না। মাদক ছড়িয়ে যাচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। সন্তান মাদকাসক্ত জানার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক আঘাত পান অভিভাবকরা তারা বিশ্বাস করতে চান না। যখন বিশ্বাস করতে বাধ্য হন তখন রাগারাগি, বকাঝকা, মারপিট, ঘরে আটকিয়ে রাখা, সমালোচনা করা চলতেই থাকে। যা তাদের দুর্বল মনকে প্রভাবিত করে। এ সময় তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। মাদকাসক্তি চিকিত্সা বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ কোনো কাউন্সিলর, অভিজ্ঞ সাইকোলজিস্ট বা অভিজ্ঞ কোনো চিকিত্সকের সাহায্য নিতে হবে। বিফল হলেও লেগে থাকতে হবে। কারণ একবারেই চিকিত্সা সফল হতে নাও পারে। তাই বার বার চেষ্টা করলে সফলতা আসবে। আর একটা কথা আমাদের সন্তানেরা যখন বিপদগ্রস্ত হয় তখন তাদের অবস্থান অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তানা হলে আমাদের ঘরে ঘরে যে অনেক ‘ঐশী’ অজানা আছে— তারা ভাববে আমি এমন অন্যায় করলেও মাফ পেয়ে যাবো। যা ঠিক হবে না।