বি শি ষ্ট জ নে র ম তা ম ত

নতুন মূল্যবোধ প্রয়োজন —ইমদাদুল হক সাবেক বিভাগীয় প্রধান সমাজ-বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমরা যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছি, তার ভাল— খারাপ প্রভাব সমাজে পড়ছে। অনেক টাকা সমাজে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের হাতে চলে আসছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় জীবন বদলে যাচ্ছে। পুরাতন মূল্যবোধগুলো ভেঙ্গে পড়ছে। আমরা ভাঙ্গাগড়ার মধ্যে আছি। সমাজের এই অস্থিরতা দূর করতে নতুন মূল্যবোধের প্রয়োজন। আমি জানি না, নতুন মূল্যবোধ কি হবে। প্রথমত আমি বলতে চাই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ভাল মানুষ তৈরি করতে পারছে না। প্রতিবছর হাজারও সার্টিফিকেটধারি চাকুরে বের হয়। সুশিক্ষিত মানুষ না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল একটি গবেষণা ও প্রবন্ধ কবে প্রকাশিত হয়েছিল তা বলা মুশকিল। অক্সফোর্ড ক্যামব্রীজের টিউশনফি কয়েকগুণ বেড়েছে। যাতে শুধুই মেধাবী ও সম্পদশালীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তারা যখন প্রশাসনে কাজ করবে তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তাদের স্খলন সহজে ঘটে না। বাকিরা উচ্চ মাধ্যমিকের পর বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন কাজে ছড়িয়ে যাবে। এত ডিগ্রিধারিরা না পারে চাষ করতে না পারে ভাল কাজ করতে। দ্বিতীয়ত আমাদের ভৌগোলিক অবস্থা অনুযায়ী মানুষের মানসিক অবস্থা এখনও এমন পর্যায়ে আসতে পারে না, যে মেয়ে তার বাবা-মাকে হত্যা করে। আমার মনে হয় ঐশী তার বাবার শত্রুতার শিকার। বাবা রাজনৈতিক বিভাগে কাজ করতেন। তার এমন কোন শত্রু হয়েছিল যিনি তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়নি। তাকে অনুসরণ করেছেন মেয়ের ক্ষোভ জেনেছেন, তাকেই কাজে লাগিয়েছে। সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ড এমন বলে আমার মনে হয়। তৃতীয়ত স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণের সাথে সাথে তা ভোগ করার ক্ষমতাও তৈরি হওয়া দরকার। আমার কতটুকু যেতে হবে, কি করতে হবে সে বিষয়েও আমার সচেতন হওয়া জরুরি। এসব মানসিকতা গঠনের জন্য সামাজিক, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন। ০০০০০ বাবা-মায়ের দায়িত্ব অনেক বেশি ছিল —তাসমিমা হোসেন মানবাধিকার কর্মী আমাদের সামাজিক এবং পারিবারিক মূল্যবোধ ভেঙ্গে পড়ছে। আমাদের এই মূল্যবোধগুলো ধরে রাখা সামাজিক কারণেই অনেক কঠিন হয়ে পড়ছে। কিন্তু অসম্ভব বলে মনে করি না আমি। আমাদের সন্তানদের মানুষ করার দায়িত্ব আমাদেরই। পরিবার সন্তান সবার জন্যই ঘরের গৃহিণী আর বাবা-মায়ের ভূমিকা থাকে। মায়ের দায় একটু বেশি কারণ, প্রকৃতগতভাবেই নারী ঘরমুখো, সন্তান মা নির্ভর। তাই মায়ের সাথে সন্তানের যে সহজগতিময় একটা সম্পর্ক থাকে, তা যত্ন করতে হবে। ঐশীকে আমরা খারাপ বলছি, তাকে সমাজ পিতা-মাতার ঘাতক বলে ধিক্কার দিচ্ছে। কিন্তু ক্রমেই যখন ঐশী আদুরে নিষ্পাপ সন্তান থেকে মাদকাসক্ত খুনি হয়ে উঠছিল তখন তার মা-বাবা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিলেন। আমরা ছেলে-মেয়েদের এই পরিস্থিতি লুকিয়ে রেখে নিজেদের সন্তানের কারোই মঙ্গল করতে পারি না। সময়ের অভাব আমাকে আপনাকে যেন সন্তানদের প্রতি উদাসীন না করে, প্রত্যেক বাবা-মা তো বটেই মাকে বেশি সতর্ক হতে হবে। আপনার ঘরে ঐশীকে না দেখতে চাইলে, সন্তান কোথায় যায়, কার সাথে মেশে, কি করে তা খোঁজ রাখুন। সন্তানের মনে প্রতিহিংসা তৈরি করবেন না, সহযোগিতার হাত বাড়ান। আমাদের সমাজ আজও ঐশীদের দায়িত্ব নেয়ার মতো প্রতিষ্ঠান পর্যাপ্তভাবে গড়ে উঠেনি, তাই দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। ০০০০০ সোস্যাল সার্ভিস দরকার —আক্তার সুলতানা বিভাগীয় প্রধান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাবি আমি প্রথমেই একটা কথা বলে নিতে চাই, ঐশী কিন্তু এখনও তার বাবা-মার ঘাতক হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। আমরা পুলিশের ধারণা মতে গণমাধ্যমে তার সম্পর্কে নানা রকম অভিযোগ দেখছি। ঐশীর সুন্দর একটা মনও আছে, ও কিন্তু ছোট ভাই ও বাড়ির গৃহপরিচালিককে ফেলে যায়নি। ওর বেপরোয়া জীবনযাপনের কথাও উঠছে। কিন্তু এই জীবন যাপনের অনুসঙ্গগুলো কিভাবে পাচ্ছে তাও বিবেচনা করতে হবে। এই বয়সে বাবা-মার উপর ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য আমাদের সমাজে যে সকল প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন তা নাই। আমরা অনেক সময় নিজেদের ব্যস্ততার জন্য সন্তানদের সময় দিতে পারি না। ফলে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এই দূরত্বের জন্য ক্রমেই সন্তান বদলে যেতে থাকে। যখন কোন নেতিবাচক কাজ করে আমরা নিজেদের অপারগতা ঢাকতে সন্তানের উপর চওড়া হই। অপমান করে কথা বলি। নিজে তাকে ফিরিয়ে আনতে বিফল হলে স্বামীকে অবলম্বন করি। এসব ক্ষেত্রে বাবার কাছে নালিস করার জন্য মা তো শত্রু হয়ই, মায়ের কথা শুনে সন্তানকে নিজের পক্ষ নেয়ার সুযোগ না দিয়ে, সমস্যা কি জানতে না চেয়ে বাবার রাগের জন্য তিনিও সন্তানের শত্রু হন। আমাদের সমাজে মা-বাবার ব্যস্ততার কারণে সন্তানের দেখাশোনার জন্য সুব্যবস্থা করা কঠিন। তাই বয়স অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানে তাদের রাখতে হবে। দিবাযত্নকেন্দ্রগুলো সেভাবে আমাদের নেই। উন্নয়নের ভাল খারাপ যা আছে সমাজে তার প্রভাব পড়ছে। যখন তারা নেতিবাচক প্রভাবে প্রভাবিত হয় তখন কাউন্সিল করার মতো প্রতিষ্ঠান কম। বিয়ে করে সংসার করা, সন্তান মানুষ করা সব কিছুর জন্য কাউন্সি এখন আমাদের সমাজের প্রয়োজন।