জাতীয় কবির মহাপ্রয়াণ দিবস আজ
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৩, ২১:৫৯
‘অজানা অসীম পূর্ণতা নিয়ে জন্মেছি আমি। এ আমার অহংকার নয়, আত্মবিশ্বাসজাত আত্মোপলব্ধির চেতনালব্ধ সহজ সত্যের সরল স্বীকারোক্তি।’ বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত বাঙালির রুচি ও মননের অধীশ্বর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের উক্তি এটি।
আজ ১২ ভাদ্র বাংলাদেশের জাতীয় কবি, সাম্যের কবি, বেদনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৩৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। ইংরেজি সাল হিসাবে দিনটি ছিল ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট। বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ সালের ২৫ মে, বাংলা ১১ জ্যৈষ্ঠ তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় এবং পিতার অকাল মৃত্যুতে পরিবারের ভরণপোষণের জন্য তিনি শিশু বয়সেই মক্তবে শিক্ষকতা, হাজী পালোয়ানের মাজারে খাদেম এবং মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন। দুঃখ-দারিদ্র্য ছিল তার নিত্যসঙ্গী। সে কারণে শৈশবেই ‘দুখু মিয়া’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মানবতা ও মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক। অবিভক্ত উপ-মহাদেশে কবিতার মধ্য দিয়ে অন্যায়, শোষণের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদী হয়ে ওঠার মন্ত্র ছড়িয়ে ছিয়েছিলেন। আজো যে কোন অন্যায়, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নজরুল আমাদের প্রেরণা হয়ে আবির্ভূত হন। ১৯৭২ সালের ২৪ মে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবি সপরিবারে বাংলাদেশে আসেন। বাংলাদেশ সরকার কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে এবং ‘জাতীয় কবি’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশেই ছিলেন। তার জীবনকাল ৭৮ বছর হলেও ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর দীর্ঘ ৩৪ বছর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি অসহনীয় নির্বাক জীবন কাটিয়েছেন।
কাজী নজরুল ইসলাম প্রেমের কবি, বিরহ-বেদনা ও সাম্যের কবি, মহাবিদ্রোহের কবি। বাংলা সাহিত্য-সঙ্গীত তথা সংস্কৃতির প্রধান পুরুষ। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তার লেখনী ধূমকেতুর মতো আঘাত হেনে জাগিয়ে দিয়েছিল ভারতবাসীকে। তিনি পরিণত হন মহাবিদ্রোহের কবিতে। আজও তার বিচিত্র সৃষ্টির মাঝ থেকে বিদ্রোহের পংক্তিমালা বাঙালির হূদয়ে অনাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের দুন্দুভি বাজিয়ে চলে। তার কবিতা ‘চল্ চল্ চল্’ বাংলাদেশের রণসঙ্গীত।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল থেকেই নজরুলের কাব্য প্রতিভার প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়। ৪৯নং বাঙালি পল্টনের একজন হাবিলদার হিসেবে যুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন তিনি। তখন বাংলা সাহিত্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবলভাবে বিরাজমান। কাজী নজরুল ইসলাম এলেন নতুন দিনের ভাষা নিয়ে, যেন সময়ের সারথী তিনি। ‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু, এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু’। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই তরুণ কবিকে স্বাগত জানালেন কবিতার ভাষাতেই: ‘আয় চলে আয়রে ধূমকেতু/ আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু/ দুর্দিনের এই দুর্গশিরে/ উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন/ অলক্ষণের তিলক রেখা/ রাতের ভালে হোক না লেখা/ জাগিয়ে দেরে চমক মেরে/ আছে যারা অর্ধচেতন।’
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং আধুনিক বাংলা গানের ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত কাজী নজরুল ইসলাম বিশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে উপ-মহাদেশে অবিভক্ত বাংলার সাংস্কৃতিক সম্প্রচার ও গণমাধ্যম জগতে সবচেয়ে বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ব্যর্থ অনুকরণ ও অনুসরণের কৃত্রিমতা থেকে আধুনিক বাংলা কবিতাকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে ফলপ্রসূ। তাই তিনিই রবীন্দ্রোত্তর সাহিত্যে আধুনিকতার পথিকৃত্। নজরুল তার কবিতা, গান, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, উপন্যাসসহ অন্যান্য লেখনী ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পরাধীন ভারতে বিশেষ করে অবিভক্ত বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা, সামন্তবাদ, সাম্রাজ্য ও উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বলিষ্ঠ ও সোচ্চার কণ্ঠ ছিলেন। সে কারণে ইংরেজ সরকার তার গ্রন্থ ও রচনা বার বার বাজেয়াপ্ত করেছে এবং কারাদণ্ড দিয়েছে। কারাগারেও বিদ্রোহী নজরুল টানা চল্লিশ দিন অনশন করে ঔপনিবেশিক সরকারের জেল-জুলুমের প্রতিবাদ করেছেন।
দিবসটি স্মরণে যত কর্মসূচি
দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সকালে কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিনের কার্যক্রম শুরু হবে। এর পর রয়েছে দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও স্টেশন দিনব্যাপী স্মরণ করবে মহান কবিকে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র।
জাতীয় কবির প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিনদিনের জাতীয় নজরুল সম্মেলনের শেষদিন আজ। জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে এদিন থাকছে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাংলা একাডেমী একাডেমীর সেমিনার কক্ষে একক বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এতে ‘নজরুল ইসলামকে কোন পরিচয়ে জানব’ শিরোনামে বক্তৃতা প্রদান করবেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমীর সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।