সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল নিজেই সংক্রমিত
প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৩, ২৩:০৯
দেশের সংক্রামক রোগের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা কেন্দ্র মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। কিন্তু হাসপাতালটি নিজেই যেন আজ নানা রোগে সংক্রমিত হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের অভ্যন্তর ও চারপাশ ময়লা, আবর্জনায় পরিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, দুর্গন্ধে টেকা দায়। সামান্য বৃষ্টিতেই হাসপাতালে প্রবেশের রাস্তায় হাঁটুপানি জমে যায়। হাসপাতালের চারপাশ ঘিরে ইয়াবাসহ মাদক ও অস্ত্রের ব্যবসা জমজমাট।
সাততলা হাসপাতাল ভবনের অভ্যন্তর কিংবা আশপাশের চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখলে যে কেউ চমকে উঠবে। গোয়ালঘরের পরিবেশও যেন এর চেয়ে উন্নত। হাসপাতালের এই নোংরা পরিবেশ নানা সংক্রামক ব্যাধিরই উত্সস্থল। চিকিত্সক, নার্স ও কর্মকর্তারা নিজেরাই বলেন, আসলে হাসপাতালটি নিজেই সংক্রমিত। সামান্য দূরে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনার প্রধান কার্যালয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেখানকার শীর্ষ কর্মকর্তাসহ প্রায় সকলেই এ হাসপাতালের অবস্থা সম্পর্কে অবগত। অনেক কর্মকর্তা নিজ চোখেই দেখেছেন হাসপাতালের চরম অব্যবস্থাপনা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং এর আশেপাশে প্রকাশ্যে মাদক ও অস্ত্র বেচাকেনার দৃশ্য। অথচ দায়িত্বপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তা সেসব দেখেও না দেখার ভান করেন কিংবা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছেন দীর্ঘদিন। হাসপাতালের চার চিকিত্সক ও কর্মকর্তা হাসপাতালের দুরবস্থার কথা স্বীকার করে বলেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিত্সা দিতে গিয়ে তারা নিজেরাই নানা রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। রোগীরা তো বটেই, তাদের অভিভাবকদেরও অনেকে এ হাসপাতালে এসে নতুন করে রোগজীবাণুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। দুর্নীতি ও অনিয়মের দিক দিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল প্রথম সারিতে রয়েছে বলে উক্ত চিকিত্সক ও কর্মকর্তারা জানান।
অপর দুই কর্মকর্তা জানান, হাসপাতাল চুনকাম ও মেরামতের নামে ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য খাতের ৩৩ লাখ টাকা আত্মসাত্ করা হয়েছে। হাসপাতালের বাইরের অংশ অল্প খরচে চুনকাম করে বাকি টাকা আত্মসাত্ করা হয়। গণপূর্ত বিভাগের কতিপয় প্রকৌশলী ও রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট ঠিকাদার এবং স্থানীয় কতিপয় নেতা ঐ টাকা আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) এক নেতার আত্মীয় ক্ষমতাধর একজন চিকিত্সক ঐ হাসপাতালে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। নেতার নিকটতম আত্মীয় হওয়ায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা ঐ চিকিত্সকের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করার সাহস পান না বলে জানালেন অপর এক কর্মকর্তা।
হাসপাতালটির নামে ৩৫ একর জায়গা রয়েছে। মাত্র ৫ একর জায়গায় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলেও বাকি ৩০ একর জায়গা অবৈধ দখলে রয়েছে। সেখানে বস্তিসহ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে নানা ধরনের লোকের কাছে ভাড়া দেয়া হয়। বহু বছর ধরে ঐ ৩০ একর জায়গা অবৈধ দখলে থাকলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর জায়গাটি দখলমুক্ত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। অবৈধ দখলের সঙ্গে হাসপাতালের একশ্রেণীর কর্মচারী জড়িত। সন্ত্রাসী, পেশাদার কিলার ও মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়স্থল ঐসব অবৈধ বস্তি ও বিভিন্ন স্থাপনায় দিন-রাত চলে ইয়াবাসহ মাদক বেচাকেনা এবং সেবন। পাশাপাশি চলে অস্ত্র বেচাকেনা। রাতে হাসপাতাল চত্বরেও এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড চলে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, অবৈধ বস্তি ও স্থাপনার মালিকদের প্রতিজনের মাসিক আয় ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা। অভিযোগ রয়েছে এ টাকার ভাগ স্বাস্থ্য অধিদফতর ও মন্ত্রণালয়ের কতিপয় কর্মকর্তার পকেটে যায় নিয়মিত। এ কারণে অবৈধ বস্তি ও স্থাপনা উচ্ছেদে প্রশাসন নীরব।
হাসপাতালের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা সেখানকার মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পেয়ে থাকেন। এ কারণে সেখানে নিরাপদে মাদক ও অস্ত্র বাণিজ্য চলে আসছে দীর্ঘদিন যাবত্। এরকম পরিস্থিতিতে হাসপাতালে আগত রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। সন্ধ্যার পর হাসপাতালে যাতায়াত করার সময় অনেকে ছিনতাইয়ের শিকার হন।
গুলশান জোন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার লুত্ফুল কবীর বলেন, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও আশপাশে প্রায় প্রতিদিনই মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করা হয়ে থাকে। আবার দিন সাতেক পর ছাড়া পেয়ে এসে তারা পুনরায় মাদক ব্যবসা শুরু করে। এদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। ঐ সিন্ডিকেট দ্রুত মাদক ব্যবসায়ীদের জামিনে বের করে আনে। ঐ এলাকায় মাদক ব্যবসা ও অপরাধ দমনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. সিফায়েত উল্লাহ বলেন, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও আশপাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি বিভিন্ন দায়িত্বশীল মহলের সহযোগিতা কামনা করেন। হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।