ওই ছবিটা
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০১৩, ১৯:২৪
বলতে গেলে প্রতিটা বিকেলেই মাত্র খানিকটা সময় বাড়ির ছাদে গিয়ে মৃদু পায়ে হাঁটাহাঁটি করে থাকে শাদি। এটা দারুণ একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে তার। ওই মুহূর্তেই মনটা তরতর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ওই সময় পশ্চিম আকাশটা যেন তার আপন থেকে আপন হয়ে ওঠে। সে ওদিকে তাকিয়েই আনন্দ অনুভব করে থাকে। চেষ্টা করেও চোখের দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে নিতে পারে না।
আকাশের তলা দিয়ে ছাই রঙের অসংখ্য মেঘ ভেসে উড়ে উড়ে যাচ্ছে। খানিকটা দূর এগিয়ে আবার উধাও হয়ে যাচ্ছে। ওদের কি কোনো ঠিকানা নেই? না, পুরো আকাশটা জুড়েই ওদের ঠিকানা। শাদির মনে ওরকম প্রশ্নের যেন শেষ নেই।
সূর্যটা ডুবু ডুবু করছে। যে কোনো মুহূর্তে টুপ মেরে যাবে। মুছে যাবে তার চিহ্ন। তার চারদিকে কেমন যেন একটা মায়াবী আবেশ। ঘুড়ির সুতোর মতো তার কচি কোমল মনটাকে টানতে থাকে। তখন যে কি আনন্দ। আরো আনন্দ পেতো। যদি একটা রঙিন ঘুড়ি থাকতো। তার হাতে থাকতো নাটাই। সে কেবল ছাড়তেই থাকতো। এক সময় ঘুড়িটা আকাশে হারিয়ে যেতো। কোনো কিছু হারানোর মাঝেও এক প্রকার আনন্দ আছে।
শাদির ছাদে ওঠা একদম নিষেধ। মা সেদিন জানিয়ে দিয়েছেন। একা যেন কোনোদিন ছাদে না ওঠে। কারণ ছাদ কোন অবস্থাতেই নিরাপদ জায়গায় নয়। বিপদ-আপদের আশঙ্কাটা খুবই বেশি।
মায়ের ওই উপদেশ শাদির একটুও ভালো লাগেনি। তার সকল কাজেই মায়ের সেকি বাড়াবাড়ি। যা তাকে রীতিমতো বিরক্তি ধরিয়ে দেয়। একা একার মজাটা কি মায়ের সঙ্গে পাওয়া যাবে? একটুও না।
কিসব উপদেশ আর উপদেশ। শাদি টবের কাছাকাছি যেয়ো না। মশা থাকতে পারে। ওসব মশা কামড়ালে ডেঙ্গু হতে পারে। ডেঙ্গু জ্বরটা খুবই খারাপ। আর উদার ওই দূর আকাশটার দিকে তাকিয়ে কেবল মেঘের খেলা দেখে আনন্দ নিয়ো না। আকাশের মতো উদার হতে চেষ্টা করো। এই যে স্নিগ্ধ বাতাসের ছড়াছড়ি। তাতে শুধু শরীরটা শীতল করে নিয়ো না। বাতাসের মতো গতিশীল হতে চেষ্টা করো। আরো হাজারো কথা। এতো উপদেশ শুনতে কি ভালো লাগে? তবে উপদেশ আর শাসনের মাঝেও মায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়ে থাকে শাদি। কারণ তার চিন্তা ভাবনার প্রসারতা অনেক বেশি। তিনি ছোটদের নিয়ে অনেক ভাবেন। অনেক রঙিন স্বপ্ন আঁঁকেন। যে কোনো সমস্যার কথা বললে তিনি মন দিয়ে শোনেন এবং সমাধান করতে চেষ্টা করেন। না পারলে আফসোস করে থাকেন। কাউকে সাহায্যের ব্যাপারে তার হাত অনেক বড়। ইস্কুলে মাকে নিয়ে শাদি অনেক গর্ব করে থাকে। একদিন এক বন্ধুর সঙ্গে তার সেকি তর্ক। পৃথিবীতে তার মা-ই সবচেয়ে ভালো মা। এমন মা আর দ্বিতীয়জন নেই। বন্ধুটি বলে ওর মা-ই নাকি সেরা মা। এমন মা আর একজনও নেই।
ইস্কুলের একজন ম্যাডাম তাদের এই ব্যাপারটা ফয়সালা করে দেন। তিনি প্রথমে তাদের দু’জনকেই ধন্যবাদ দেন। মায়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্য। কারণ পৃথিবীতে মায়ের তুলনা মা-ই। এর দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ নেই। প্রত্যেকটি সন্তানের চোখেই তার মা সেরা। এই ব্যাপারে তোমাদের আর আর কোনো প্রশ্ন আছে?
ওই ছেলেটি বলল, জ্বি না ম্যাডাম।
শাদি! বলো।
এ ব্যাপারে আর কিছু বলার থাকতে পারে না ম্যাডাম।
তোমাদের দু’জনের মতো এদেশে প্রত্যেকটি ছেলে হোক। গোটা জাতির কছে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সকাল। এটা অন্য দশটা দিনের মতো নয়। পুরো অন্যরকম এটা সকাল। যা হাজারো সকাল থেকে ভিন্ন। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই মা-র মনটা খুবই খারাপ। এমন খারাপ। যার পরিমাণটা ভাবাই যায় না। চোখ দুটোতে পানি টলমল করতে করতে শুকিয়ে যায়। চোখের কোণে লেপ্টে আছে তার চিহ্ন।
শাদি একবার মায়ের মুখের দিকে তাকায়। ইচ্ছে ছিল একটা কিছু জিজ্ঞেস করতে কিন্তু পারেনি। ঠিক হবে না ভেবে, পড়ার ঘরে চলে যায়।
শাদি আজ ইস্কুলের যাবতীয় প্রস্তুতি সে নিজেই নিচ্ছে। মাকে বলেনি। যাবার সময় কেবল মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো, মা আমি ইস্কুলে যাচ্ছি। মা তার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বললেন, খুব সাবধানে যেয়ো।
ক্লাসের সবাই কেমন যেন এক ধরনের উত্ফুল্লে মেতে আছে। কেবল চুপচাপ বসে আছে শাদি। অন্যদিনের মতো তার মনে কোনো আনন্দ নেই। মুখটাও শুকনো হয়ে আছে।
ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকেই বললেন, বলো তো, এটা কি মাস?
অনেকেই দাঁড়িয়ে বলল, আগস্ট মাস।
বারো মাসের মধ্যে এই মাসটা ব্যতিক্রম একটি মাস। কেন? বলো তো?
শাদি দাঁড়িয়ে বললো, এটা শোকের মাস।
কেন?
এই মাসেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। তাঁকে শুধু একা নয়, স্বপরিবারে আঠারোজন সদস্যকে। এমন কি শিশু রাসেলকেও ওরা ক্ষমা করেনি।
তোমাকে অনেক ধন্যবাদ শাদি।
এই মাসটিতে মা সব সময় শোকে কাতর থাকেন। বোধকরি, মুহূর্তের জন্যও ওই লোমহর্ষক ঘটনাটা ভুলে যেতে পারেননি। তাই সব সময় কেমন যেন মন মরা হয়ে থাকেন। বাবা ওসবের ধারও ধারেন না। তিনি সকালে বেরিয়ে যান। অফিস শেষ করে সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফিরে আসেন। তারপর বসে যান টেলিভিশনের সামনে। তবে মায়ের মনের অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করে শাদি। আর ওই শোক তো মায়ের একার নয়। গোটা জাতির শোক। তবে মা-তা গভীর ভাবে অনুভব করে থাকেন।
শাদি মনে মনে পণ করেই নিয়েছে। এই শোকের মাসে মা যাতে বড় রকমের একটা সান্ত্বনা পান, সেই রকম একটা ব্যবস্থা করবে। সেজন্য তাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তাই ওই বিষয়টি নিয়ে দিনরাত কাজ করে যেতে থাকে শাদি। তার বিশ্বাস ওই পরিশ্রম কখনো বৃথা যাবে না। যেতে পারে না। কারণ শাদি যে কাজটি-ই করে গভীর আত্মবিশ্বাস নিয়েই করে। তাই রেজাল্ট কোনো দিনই খারাপ হয় না। এজন্যই তাকে নিয়ে মায়ের অনেক গর্ব।
শাদি ইস্কুল থেকে ফিরছে। তার মুখ জুড়ে উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে আছে। কিছুতেই আনন্দটা ভেতরে চেপে রাখতে পারছে না। তার প্রকাশ ঘটেই যাচ্ছে, সে বারবার মায়ের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর ব্যাগ থেকে তার আঁকা ছবিটা বের করে মায়ের হাতে দিয়ে বলে ইস্কুলে প্রতিযোগিতায় আমি ফার্স্ব হয়েছি। এখন তুমি দেখো মা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিথর দেহটা সিঁড়িতে পড়ে আছে। তাঁর বুকটা গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে আছে। পাশে অসহায় ভাবে পড়ে আছে তাঁর ভারি কাঁচের চশমাটি।
মা একবার ছবিটি বুকে জড়িয়ে ধরেন। আরেকবার শাদিকে। তারপর গর্ব মিশ্রিত গলায় বলেন, এই শোকের মাসে এটাই আমার বড় সান্ত্বনা।