ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ভিনদেশ থেকে পড়তে এসেছে ওরা

গুরু মালয়েশিয়া মালয়েশিয়া থেকে পড়তে এসেছেন গুরু। কথা হলো তার সঙ্গে। তিনি বলেন, পড়াশোনা করতে এসে প্রথমে কিছু সমস্যায় পড়েছি। তবে বন্ধুদের সহায়তা পেয়েছি সব সময়। শিক্ষকরাও সহায়তা করেছেন। পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশে থাকবেন কিনা জানতে চাইলে- পড়াশোনা শেষ করে অবশ্যই নিজের দেশে চলে যাবো। তবে সময় পেলেই বাংলাদেশে চলে আসবো। গৌরব নেপাল নেপাল থেকে পড়তে এসেছেন গৌরব। কথা হলো তার সঙ্গে। কাছাকাছি দেশ হওয়ায় এখানকার সংস্কৃতির সাথে খাপ খাওয়াতে তার কোন সমস্যা হয়নি বলে জানায়। এদেশে নেপালের প্রচুর ছাত্র অধ্যয়নরত থাকায় নিজ দেশেরও অনেক বন্ধু পাওয়া যায়। হলের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সে বেশ সন্তুষ্ট। শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে মেস পরিচালনা করে খাবার ব্যবস্থা করে। তার মানও বেশ ভালো। মিনজুর ভুটান ভুটান থেকে পড়তে এসেছেন মিনজুর। হল নিয়ে তিনিও খুশি। তবে এটিকে পুরোপুরি আন্তর্জাতিকমানের হল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আরো কিছু সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো দরকার বলে সে মনে করে। বাংলাদেশি মানুষের আন্তরিকতা খুব ভালো লাগে। এ দেশের মানুষ খুব বেশি আবেগপ্রবণ। বিকেলে হলের মাঠে আমরা খেলাধুলা করি। এটা আমার বেশ প্রিয়। খেলার কথা আমার মনে থাকবে সারা জীবন। মুনিম খান পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে এসেছেন মুনিম খান। বাংলাদেশ কেমন লাগছে জানতে চাইলে সে জানায়, প্রথমে ভালো লাগত না। কারণ তখন কারো সঙ্গে পরিচয় ছিল না। এখানকার সংস্কৃতির সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। কিন্তু এখন অনেকের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। এখন ভালো লাগে। মেসে খাই। মাঝে মধ্যে নিজে রান্না করে খাওয়ার চেষ্টা করি। ওরা সবাই এক সঙ্গে থাকে। গল্প করে। আড্ডা দেয়। পড়াশোনা করে। একের সুখে সুখী হয়। অন্যের কষ্ট ভাগ করে নেয়। ওরা এসেছে বিভিন্ন দেশ থেকে। একেক জনের সংস্কৃতি আলাদা। চেহারা আলাদা। তবুও ভালো আছে। ওরা আমাদের ভিনদেশি। কথা হয় কয়েকজনের সঙ্গেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়ছে এসব বিদেশি শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার পিজে হার্টগ ইন্টারন্যাশনাল হলে থাকছে তারা। একাধিক বিদেশি শিক্ষার্থী জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে অনেক টাকা খরচ হয়। বিদেশি ছাত্রদের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন তার সামান্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিতে পারে। একাডেমিক কার্যক্রমে জটিলতা, ক্লাসে ইংরেজি না বলাসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা এখানে আসতে আগ্রহবোধ করে না। তবে নানা কারণে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আগ্রহ হারাচ্ছে বিদেশিরা। বছর বছর কমছে তাদের সংখ্যা। জানা গেছে, শেষ তিন শিক্ষাবর্ষে এখানে স্নাতক শ্রেণিতে পাঁচজন ও স্নাতকোত্তরে তিনজন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। এক সময় ক্যাম্পাসে বিদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে চোখে পড়লেও বর্তমানে তাদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। তবে আন্তর্জাতিক ভাষা ইনস্টিটিউটসহ বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে। জটিল ভর্তি প্রক্রিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ভর্তি সংক্রান্ত তথ্যের অযথার্থতার কারণে বিদেশি শিক্ষার্থীদের বিপাকে পড়তে হয়। এসব কারণে বিদেশি শিক্ষার্থীরা বিমুখ হচ্ছে বলে জানা যায়। কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার দিকে নজর দিলেই এ দুরবস্থা চোখে পড়ে। জানা যায়, ২০০৫-২০০৬ থেকে ২০১২-২০১৩ সেশন পর্যন্ত মাত্র ৪২ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। যারা ভর্তি হয়েছেন তাদের অধিকাংশ নেপাল, ভারত, চীনসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্কভুক্ত শিক্ষার্থীদের বার্ষিক ৫০০ ইউএস ডলার ও সার্কের বহির্ভূত শিক্ষার্থীদের ১২০০ ইউএস ডলার ফি দিতে হয়। এ অর্থ দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করা যায়। জানা গেছে, আন্তর্জাতিকভাবে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে অনেক জটিলতা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে সংযোজিত ই-মেইলের মাধ্যমে ভর্তির ব্যাপারে আবেদন করার সুযোগ থাকলেও জটিল এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা সম্পাদিত হয়। প্রথম পর্যায়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তিনটি ফরম দেয়া হয়। এর একটি থাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। অন্য একটি ফরম পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় থেকে কনফার্মেশনের মাধ্যমে সার্টিফিকেট পাওয়ার পর একটি ফরম পাঠানো হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। শিক্ষা সচিবের স্বাক্ষর পাওয়ার পর একটি ফরম ফেরত পাঠালেই কেবল শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে। সব মিলিয়ে দীর্ঘ এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগে দুই থেকে তিন মাস। অনেকেই দীর্ঘ এ জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আগ্রহ বোধ করে না। এছাড়া ওয়েবসাইটে ভর্তির ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য না থাকায় সেখান থেকে তারা প্রয়োজনীয় তথ্য পায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের তুলনায় ছাত্ররা কম ভর্তি হচ্ছে এটা ঠিক তবে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে বিদেশি ছাত্রদের চাহিদা কমেনি। বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়ার অনাগ্রহের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীরা বর্তমানে প্রযুক্তি ও মেডিক্যাল শিক্ষার দিকে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। উপাচার্য আরো বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সব সময় শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ক্ষেত্রে আন্তরিক। আমরা বিদেশী শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করব। ছবি: জিলফুল মুরাদ