সমকালীন দুর্ভাবনা
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৪
পরমতসহিষ্ণুতা গণতান্ত্রিক সমাজের মূলকথা। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে সত্যিকার অর্থেই আজো গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে উঠতে পারেনি। তাই পরমতসহিষ্ণুতা এখানে যেন সোনার হরিণ। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র চর্চায় অগণতান্ত্রিকতার আধিপত্য সর্বত্র বিরাজমান। রাজনৈতিক নেতাদের গণতন্ত্রের নামে অগণতান্ত্রিক শাসন জনমনে ক্লান্তি এনে দিয়েছে। জনগণ হতাশ, ব্যথিত। আগামী দিনে রাজনীতিকেরা যে জনগণকে কিছু দেবেন, এ আশায় এখন আর বুক বাঁধতে ভরসা পাচ্ছে না কেউ। গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতিকেরাই হলেন জনগণের পথপ্রদর্শক, দেশের চালিকাশক্তি। তাই এঁদের ওপর যদি জনগণ ভরসা রাখতে না পারে, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় জনগণকে পথ দেখাবে কে? আর দেশ চলবেই বা কী করে?
সব মিলিয়ে দুর্ভাবনায় ডুবে আছে জনগণ। গণতন্ত্রের কুম্ভীরাশ্রুবর্ষণকারীরা ক্ষমতার মোহে অন্ধে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রীর মুখ থেকে যে বক্তব্য দেশবাসী উপহার পাচ্ছে, তাকে আর যাই হোক গণতান্ত্রিক ভাষা বলা যায় না। উদাহারণ টেনে সচেতন মহলের বিরক্তির উদ্রেক ঘটাতে চাই না। তবে এটুকু বলা যায়, তাঁদের কথা পরমতসহিষ্ণুতার বদলে পরমত ঘায়েলের শাণিত উপাদানে সমৃদ্ধ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পারস্পরিক অনাস্থার বাতাবরণ বিদ্যমান। এর সৃষ্টি শুরু থেকেই। স্বাধীনতার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতি ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সদ্যস্বাধীন দেশের নির্বাচিত সরকার উত্খাত ও জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করে যে সংকটের জন্ম দেওয়া হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের পথ যে কুসুমাস্তীর্ণ হবে না এটাই তো স্বাভাবিক। যারা গণতন্ত্রের ধারক, বাহক ও রক্ষক, তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উত্সাহ বা মদদে যখন তৃতীয় কোনো দেশের নির্বাচিত সরকার উত্খাত হয়, তখন সেখানে গণতন্ত্রের অবস্থান নড়বড়ে আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান গণতন্ত্র আজ চরম বাস্তবতার মুখোমুখি। এ বাস্তবতাই হচ্ছে আস্থার সংকট। এখানে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না, কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। এখানে ছলে বলে কৌশলে (এমনকি বিদেশি পরাশক্তির দাসখত দিয়ে হলেও) একবার ক্ষমতা দখল করতে পারলে আর ক্ষমতা ছাড়তে চায় না কেউ। এখানে সীমাহীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর মূল্যবোধের অবক্ষয় জাতীয় জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। এখানে শিক্ষিত, মার্জিত, রুচিশীল ও পরিশীলিত জনেরা নিঃসঙ্গ, উপেক্ষিত, মর্যাদাহীন এবং রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন নেতৃত্বের আসনে সমাসীন মাস্তান, চাঁদাবাজ, কালোটাকার মালিক ও নীতিহীন আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদারেরা। বর্তমানে নেতাদের অনেকে নির্মল রাজনীতি চর্চার চেয়ে ঠিকাদারি চর্চায় আগ্রহ বেশি। আগে ঠিকাদারদের আলাদা করে চেনা যেতো, এখন ঠিকাদার নেই বরং রাজনীতিকরাই ঠিকাদার বনে গেছে।
সমাজ পালটে গেছে, পালটে গেছে জনগণের মন-মানসিকতাও। তারাও এখন নগদপ্রাপ্তিতে বিশ্বাসী হয়ে পড়েছে। আসছে নির্বাচন। তারা জানে এখন তাদের তোয়াজ করা হবে। তাই ভোটের বাজারে বিক্রি হতে আপত্তি কোথায়? কারণ নির্বাচনের পর তো আর নেতাদের দেখা মিলবে না। বলা যাবে না সমস্যার কথা। তখন কথা শোনার মতো সময়ের বড় অভাব নেতাদের। নেতারাও ভাবেন যে, ভোট তো টাকা দিয়েই কেনা হয়েছে। তাই নৈতিকভাবে দায় এড়াতে সুবিধা পায়। ফলে মেধার ভিত্তিতে চাকরি মেলে না। চাকরিপ্রার্থীকে গুনতে হবে নগদ অর্থ, ঘুষ নয় ডোনেশন হিসেবে। এতে গ্রহীতার যেমন লজ্জার বালাই নেই, দাতারও রাখঢাক নেই। দাতা তো একরকম নিরুপায়, চাকরি যে তাকে পেতেই হবে। এই হলো বাংলাদেশের বাস্তব সমাজচিত্র।
বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির রূপ অরূপ রতন স্বরূপ— যাকে কল্পনা করা যায়, বাস্তবে ধরা যায় না। তাই সুখী সুন্দর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন সে তো প্রায় অর্ধ শতাব্দী বয়সকালেও স্বপ্নবিলাস হয়েই রয়ে গেলো। কিন্তু এ জাতির আছে গৌরবময় সংগ্রামের ইতিহাস। তার আছে অগ্রসর চিন্তা-ভাবনা। আছে বিশাল কর্মঠ জনগোষ্ঠী। সে কি নিছক নেতাদের খামখেয়ালি ও নেতিবাচক ভূমিকায় ডুবে থাকবে, আর দেশকে আঁধার বলয়ে ডুবিয়ে মারবে? না, তা কখনোই কাম্য হতে পারে না। এখন সময় এসেছে, যথার্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নেতাদের সচেতন হবার। দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থ পরিহার করে রাজনীতির ভাষা পরিশীলিত ও সহনশীল করতে হবে। পরমতসহিষ্ণুতাকে রাজনীতির ময়দানে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে এবং স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসের সঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। তাহলেই কেবল সমকালীন দুর্ভাবনা দূর হতে পারে।
ঝিনাইদহ