সমান্তরালে তারা

গতানুগতিক নায়িকা চরিত্রের মাঝে নিজেকে বন্দি করতে চান না মেহজাবীন। তার ভাষ্যে, ‘আমি লাক্স-চ্যানেল আই সুন্দরী প্রতিযোগিতা থেকে এসেছি বলে অনেকে হয়তো ধরে নিয়েছিলেন, অন্য কারও কারও মতো আমিও গতানুগতিক নায়িকা চরিত্রগুলোতে কাজ করব। কিন্তু তা না করে আমি একটু ভিন্ন পথে হেঁটেছি। আমি সব সময় সেই সব চরিত্রে কাজ করেছি, যেখানে আমার অভিনয়ের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আমার মনে হয়, আমি কিছুটা হলেও পেরেছি।’ মেহজাবীনের তারকা হয়ে ওঠার গল্পটা রূপকথার মতোই। লাক্স-চ্যানেল আই সুন্দরী প্রতিযোগিতার উত্সাহী দর্শক মেহজাবীন টিভি পর্দায় গুণবতী সব রূপের রাজকুমারীদের দেখে অনুপ্রাণিত হন তাদের কাতারে সামিল হতে। বাঁধভাঙা উত্সাহের এ পথ ধরেই ২০০৯ সালের প্রতিযোগিতায় রেজিস্ট্রেশন, অংশগ্রহণ এবং নিজের যোগ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ। আর ফলস্বরূপ আজকের এই তারকা মেহজাবীনের জন্ম। এর পরের গল্প সবারই জানা। এরই মধ্যে মেহজাবীন বেশ কিছু মানসম্পন্ন বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হিসেবে পারফর্ম করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—সিঙ্গার ফ্রিজ ও এসি, লেজারথ্রিট, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির বডি লোশন, প্রাণ বাবল গাম, নাভানা রিয়েল এস্টেট ইত্যাদি। সম্প্রতি শেষ করলেন আরও নতুন একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের কাজ। শুধু মডেল হিসেবেই নয়, মেহজাবীন অভিনয়েও ইতোমধ্যে চমক দেখাতে শুরু করেছেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলো—‘গহীনে’, ‘একজন মায়াবতী’, ‘ছায়াসঙ্গী’, ‘কেন্ডিডেট’, ‘এসেছিল’, ‘বিষটোপ’, ‘যে পথে ভালোবাসা’ প্রভৃতি। এসব নাটকে মেহজাবীন সুন্দর অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। মেহজাবীনের পথচলা শুরু হয়েছে একজন ভালো অভিনেত্রী হওয়ার লক্ষ্য নিয়েই। এক সময় অভিনয় করা নিয়ে তার মধ্যে একটা সংশয় কাজ করেছিল। তিনি মনে করতেন, আমি কখনোই অভিনয় করতে পারব না। কিন্তু এ প্রতিযোগিতার একটি পর্বে খ্যাতিমান অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা যখন মেহজাবীনের অভিনয় দেখে বললেন, ‘তুমি পারবে বড় অভিনেত্রী হতে।’ আর প্রিয় শিল্পীর এই কমেন্ট মেহজাবীনের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। তার কথায়, ‘আমি জানি একজন ভালো অভিনেত্রী হওয়ার জন্য অনেক সাধনার দরকার হয়। আমি প্রস্তুত এই পথে হাঁটতে।’ মডেলিং না অভিনয় কোনটি আপনার পছন্দের—এমন প্রশ্নের জবাবে মেহজাবীন বলেন, ‘মডেলিং ও অভিনয় দুটোই আমার ভালো লাগে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার প্রতিটি কাজে পরিবারের থেকে অনেক উত্সাহ ও সহযোগিতা পেয়েছি। সেজন্য আমি নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করি। মা-বাবার সহযোগিতা পেলে মিডিয়াতে কাজ করা অনেক সহজ হয়।’ লাক্সের ক্যাম্পে থাকার দিনগুলো মেহজাবীনের কাছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময় বলে জানালেন। এখান থেকেই অনেক কিছু অর্জন করেছেন এই অভিনেত্রী। ক্যাম্পের সোনালি সেই দিনগুলোর গল্প নিয়ে মেহজাবীন বলেন, ‘ক্যাম্পের দিনগুলো কখনও ভোলা যাবে না। ওখানে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। বিশেষ করে গ্রুমিং সেশনটা ছিল চমত্কার। এরফলে আমাদের কনফিডেন্স আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গিয়েছিল। আর এই অভিজ্ঞতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজে লাগছে বলে আমি মনে করি। টাইম সেন্স, ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে আমি বরাবরই সচেতন ছিলাম। লাক্সে আসার পর সেই সচেতনতা আরও জোরদার হয়েছে।’ তারকা হওয়ার আগের এবং পরের গল্প নিয়ে মেহজাবীন বলেন, ‘সত্যি বলতে কী, আমি সব সময়ই নিজেকে মানুষ হিসেবে দেখি। তারকা হয়েছি বলেই একটু ভাব নিতে হবে, আমি মনে করি এটা ঠিক নয়। আমি সবার কাছে নিজেকে একজন মানুষ হিসেবেই তুলে ধরতে চাই। লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতা আমাকে তারকা বানিয়েছে, আমি এর যথাযথ মূল্যায়নও করতে চাই। কখনও চাই না আমার কোনো আচরণে আমার ভক্তরা কষ্ট পাক।’ আসছে ঈদের বেশ কিছু নাটক নিয়ে এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মেহজাবীন। ভবিষ্যতের ভাবনার কথা জানতে চাইলে এই প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী বলেন, ‘ভালো অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের হূদয়ে টিকে থাকতে চাই। সর্বোপরি একজন ভালো অভিনয়শিল্পী হতে চাই।’ অন্যদিকে নাঈমের সঙ্গে যারা অন্তত একটিবারের জন্য হলেও কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন, তারাও নাঈমকে বলতে চান ‘অসম্ভব দিল খোলা’। যে কারও সঙ্গেই সহজে মিশে যান তিনি। প্রাণখোলা হাসি, ঠাট্টা, গল্প চালাতে পারেন দীর্ঘক্ষণ। ইউনিটের প্রোডাকশন বয় থেকে শুরু করে ডিরেক্টর সবাই তার সঙ্গে কাজ করে মজা পান ভীষণ। কারণ একটাই, বিরক্তির উদ্রেক করে এমন কোনো বিষয় নেই নাঈমের মধ্যে। ‘নায়কসুলভ’ কোনো ব্যবহারই তিনি দেখাতে চান না কারও সঙ্গে। আর তাই ক্যারিয়ার তাই দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। কিছুদিন আগের বিজ্ঞাপন মডেল আর নাটকে দু-একটি পাসিং শট দেওয়া নাঈম এখন অভিনয় করছেন মূল চরিত্রে। অথচ তিনি কিন্তু অন্য দশটা ছেলের মতোই ইংরেজিতে অনার্সে ভর্তি হয়েছেন। নিয়ম মেনে সকাল-বিকেল অফিস করেছেন। নাঈম চাকরি করতেন চ্যানেল আইয়ে। মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে। অভিনয়ের স্বপ্ন দেখার আগেই সুযোগ এসে ঝাঁকিয়ে দিয়ে গেছে তার দোরগোড়া। অন্যান্য অভিনয়শিল্পী থেকে এই জায়গায় কিছুটা ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা নাঈমের। তিনি চ্যানেল আইয়ে যোগ দিয়েছিলেন ২০০৪ সালে। এখন যে সময়ের কথা বলা হবে, সেটা ২০০৭; যথারীতি তখনও চাকরিজীবী ভালো ছেলেটি নাঈম। অফিসে তার সিনিয়র অফিসার অভিনেত্রী রুমানা রশীদ ঈশিতার পরিচালনায় ‘এক নিঝুম অরণ্যে’ নাটকের সেটে ঢুঁ মারতে হলো চাকরির কল্যাণে। সেখানেই চটজলদি ঈশিতা নাঈমকে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়ে ফেললেন। সিদ্ধান্তহীনতার গভীরে ডুবে যেতে যেতে হঠাত্ই তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন, ‘সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। ক্যামেরার সামনে তিনি দাঁড়াবেনই’। সেই ছিল শুরু, মাঝখানে অনেক বিজ্ঞাপনও জনপ্রিয় হয়েছে তার উপস্থিতির কারণেই। ইতোমধ্যে দু-দুটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন নাঈম। প্রথম চলচ্চিত্র ছিল খিজির হায়াত খানের ‘জাগো’। দ্বিতীয়টির কাজও প্রায় শেষ। সৈয়দ নাবিল আশরাফের ‘ভালোবাসার রংধনু’ নামের এই ছবিটি মুক্তি পাবে সামনেই। সব মিলিয়ে নাঈম প্রতিভার গুণে মিডিয়ার নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। সম্প্রতি আপেল মাহ্মুদের রচনা এবং রাশেদ রাহার পরিচালনায় এক খণ্ডের নাটক ‘প্যারালাল’-এ অভিনয় করলেন মেহজাবীন ও নাঈম। নাটকের গল্পে দেখা যাবে, খুব সকালে কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভাঙে দিনার। দরজা খুলে একটা পার্সেল পায়। পার্সেলের ভিতর কক্সবাজারের একটা টিকেট। শোভন ও দিনা বিষয়টা বুঝতে পারে না। তাদের ছয় মাসের বিবাহিত জীবনে এরকম পার্সেল এটাই প্রথম। দিনা ও শোভন দুজনেই খুব অবাক হয়ে যায় এ রকম একটা পার্সেলে। কিছুতেই কিছু মেলাতে পারে না তারা। দুদিন পর আবার টিকেটটা হাতে নেয় দিনা। ভালো করে দেখে। কী যেন মনে করে একটা হাসি দেয়! উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে দিনার মন। সন্ধ্যায় শোভন বাসায় এলে দিনা শোভনকে জানায় ১৩ তারিখ সে গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলে যাবে, তার মা অসুস্থ। শোভন দিনাকে যেতে দেয়। ১৩ তারিখ সকালে দিনা কক্সবাজারের একটি গাড়িতে ওঠে, হাতে পার্সেলে পাওয়া সেই টিকেটটি। একসময় কক্সবাজার পৌঁছে যায় দিনা। কাউন্টারে গিয়ে এদিক ওদিক তাকায়। দিনার সামনে এসে দাঁড়ায় অরূপ। দিনা অপলক চেয়ে থাকে, অরূপ আগের মতোই আছে। এক সপ্তাহ অরূপের সঙ্গে কক্সবাজারে কাটানোর পর দিনা বাসায় চলে আসে। এরপর আরও তিন মাস কেটে যায়। হঠাত্ করে আবার একটি পার্সেল আসে। দিনা পার্সেল খুলে দেখে রাঙামাটির একটা টিকেট। দিনার বুঝতে বাকি থাকে না যে এটি অরূপ পাঠিয়েছে। টিকেটটা পেয়ে আনন্দিত হলেও দিনার মনে একটা ভয় জেগে ওঠে শোভনের কথা চিন্তা করে। দিনা পার্সেলের বিষয়টি শোভনকে না জানিয়ে বান্ধবীর বিয়ের কথা বলে রাঙামাটিতে যায়। বাসায় চলে আসার সময় বারবার অরূপকে অনুরোধ করে আর কখনও এ রকম পার্সেল না পাঠানোর জন্য। অরূপ হাসি দেয়, কিছু বলে না। এবার এক সপ্তাহ কাটতে না কাটতেই দিনা একটা পার্সেল পায়। পার্সেল খুলে দেখে গাজীপুরের টিকেট। দিনা এবার সিদ্ধান্ত নেয় যাবে না। কিন্তু টিকেট অনুযায়ী শুক্রবার আসতে না আসতেই খুব বিচলিত হয়ে পড়ে দিনা। অস্থিরতা বাড়তে থাকে তার। শোভন বেশ কয়েকবার অস্থিরতার কারণ জানতে চায় দিনার কাছে। দিনা এড়িয়ে যায়। শুক্রবার সকালে একটা নাটক সাজায় দিনা। হঠাত্ করেই তার বোনের অসুস্থতার কথা বলে বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। তারপর গাজীপুর যায়। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিল অরূপ। দিনাকে দেখে প্রচণ্ড হাসতে থাকে অরূপ। দিনার মেজাজ খারাপ হয়ে যায় প্রচণ্ড। সে অরূপের সাথে রাগতে থাকে। অরূপ অবাক হয়ে দিনাকে বলে তুমি পার্সেল পাঠিয়ে আমাকে ডেকেছো আর তুমিই রাগ করছ? দিনা অবাক হয়ে যায়। কি বলছে অরূপ? সে তো অরূপকে কোন পার্সেল পাঠায়নি। তাহলে তাদের দুজনকে কে পাঠালো এই টিকেট? এভাবে এগিয়ে যায় নাটকের গল্প। এই নাটকে অভিনয় প্রসঙ্গে মেহজাবীন বলেন, ‘নাটকে আমার চরিত্রটি মজার। সব মিলিয়ে এই নাটকে অভিনয় করে আমার ভালো লেগেছে।’ আর নাঈম বলেন, ‘নাটকের গল্পটি বেশ মজার। আশা করি নাটকটি দর্শকদের ভালো লাগবে।’