সামাজিক সমস্যা দূর করতে উদ্যোগী হচ্ছেন তরুণরা
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০১৩, ২৩:০১
দেশের সামাজিক সমস্যা সমাধানে তরুণদের মনোযোগ বাড়ছে। এ লক্ষ্যে গড়ে উঠছে নানা ধরনের যুব সংগঠন। আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে উদ্যোমী তরুণরা বিভিন্নক্ষেত্রে সাফল্যও পেতে শুরু করেছেন। ছাত্রাবস্থায় সংগঠন গড়ে সমাজে নানাভাবে অবদান রাখার প্রচেষ্টাও অনেক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন ইস্যুতে তরুণদের খণ্ড খণ্ড এ চেষ্টা সফলভাবে সম্পন্ন হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে। এমনকি উন্নত বিশ্বের সারিতে অবস্থান করবে।
তরুণদের সকল প্রচেষ্টা ও সংগঠন সরকারিভাবে নিবন্ধিত না থাকার কারণেই এর সুনির্দিষ্ট তথ্য সংরক্ষিত নেই। দেশে তরুণদের সংগঠন বা যুব সংগঠনের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা কত তার সঠিক হিসেবও যুব মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। তবে শুধু রাজধানীতেই প্রায় দুই হাজার সংগঠন ক্রিয়াশীল বলে জানিয়েছে যুব কল্যাণ ফান্ড এবং বিভিন্ন এনজিও। ভবিষ্যত্ বাংলাদেশের সবচে বড় সম্পদ বর্তমানের শিশুরা। কিন্তু অনেক শিশুই সুবিধাবঞ্চিত। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারে জন্ম নেয়া শিশুরা বঞ্চিত থাকে শিক্ষার আলো থেকে। এ শিশুদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নস্থানে তরুণদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের বিদ্যালয়।
সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে সাড়া জাগিয়েছে জাগো ফাউন্ডেশন। ২০০৭ সালে ঢাকায় মাত্র ১৭ শিশু নিয়ে শুরু। এ প্রতিষ্ঠানের রায়ের বাজারে এখন শিশুশিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৬শ। রাজধানীর বনানীতেও একই ধরনের বিদ্যালয় পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। ঢাকার বাইরে গাজীপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, গাইবান্ধা ও বান্দরবানে বিদ্যালয় পরিচালনা করছে ফাউন্ডেশন। এ বিদ্যালয়গুলোর শিশুদের ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হচ্ছে। শুধু শিক্ষাদান নয়, শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখাটাও বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য নানা ধরনের কর্মসূচিও গ্রহণ করেছেন জাগো’র তরুণরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আশপাশের এলাকায় পথশিশুদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে কাজ করছে হিউম্যান সেফটি ফাউন্ডেশন। বৃক্ষমায়া শিশু বিকাশ কেন্দ্র নামে বিদ্যালয়টি রাজধানীর চারটি স্থানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, হাইকোর্ট মোড়, পলাশী মোড় এবং ওসমানী উদ্যানে পরিচালিত এ বিদ্যালয়গুলোতেও কয়েক হাজার পথশিশুকে বাংলা মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী পরিচালনা করছেন ফাউন্ডেশনটি। শুধু শিক্ষাদানই নয়, শিশুদের খাদ্য ও বস্ত্র সমস্যা মেটাতে কাজ করছে এ তরুণদল। এ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এমএ মুকিত বলেন, দেশের আগামী দিনের চালিকাশক্তি শিশুরা। অথচ এদের একটি বড় অংশই অশিক্ষিত থেকে যায়। সুবিধাবঞ্চিত এ শিশুদের মধ্যে শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে দেশের অগ্রগতি মসৃণ হবে। তিনি বলেন, জনগণের অর্থে আমরা পড়ালেখা করেছি। তাই জনগণের জন্য কাজ করার তাগিদ থেকেই শিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করেছি।
দেশের বিভিন্ন খাতে সমস্যা সৃষ্টি এবং দীর্ঘদিনেও তা নিরসনে প্রধান বাধা নেতৃত্বের সংকট। তাই এ সমস্যা চিহ্নিত করে তরুণ নেতৃত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেছেন অনেকই। তরুণ নেতৃত্ব তৈরিতে কাজ করছে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার। সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে দূরত্ব দূর করে শৃংখলা স্থাপন এবং সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধানে তরুণদের সংশ্লিষ্টতা আনতে কাজ করছে এ সেন্টার। কয়েকবছর ধরে বিভিন্ন কর্মশালা ও সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে নেতৃত্ব তৈরিতে সাফল্য দেখিয়েছে সংগঠনটি।
সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি এজাজ আহমেদ বলেন, দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সংগঠন গঠন একেবারে নতুন নয়। তরুণরা নিজেদের ভাবনা-চিন্তা থেকে বিভিন্ন ধরনের সংগঠন গড়ে তুলছে। তরুণদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী ঠিকভাবে বিকশিত হলে জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনের পথ অনেক সহজ হবে। তবে এ ধরনের সংগঠন গড়ার আগে উদ্যোক্তাদের মধ্যে অবশ্যই শিক্ষাগত ও পেশাগত দক্ষতা থাকতে হবে। তাদের মধ্যে চারিত্রিক সদগুণাবলী, উন্নয়ন নেটওয়ার্ক বা সহযোগিতা অর্জন এবং ঝুঁকি নেয়ার সাহস থাকতে হবে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বস্তিবাসীদের সমস্যা নিয়ে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সময় উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে বস্তিবাসীদের। এ বস্তিবাসীদের বিশুদ্ধ পানি সমস্যা ও আলো স্বল্পতা দূর করতে কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ শিক্ষার্থী। আজিমপুর, কমলাপুর ও মিরপুরে তারা প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করে সাড়া জাগিয়েছেন। তাদের এ প্রচেষ্টা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি না পেলেও অর্থ সংগ্রহ করে বিস্তৃত পরিসরে কাজ করার প্রত্যয় জানিয়েছেন দল নেতা হাসান আলী।
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী গবেষকদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন তরুণরাও। তাই আগামীর বাংলাদেশের জলবায়ুজনিত ঝুঁকি কমাতে জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ রয়েছে। বিশেষত উচ্চশিক্ষিত তরুণরা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। গ্রিন বেল্ট ট্রাস্টসহ তরুণদের বিভিন্ন সংগঠন এক্ষেত্রে সাফল্য পেয়েছে। বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে তারা কর্মসূচি ছড়িয়ে দিয়েছেন। সভা-সেমিনার-মানববন্ধন আয়োজনসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রচারে জলবায়ু পরিবেশ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার তীর দখলমুক্তকরাসহ বিভিন্ন দাবিতে শক্ত অবস্থানও করছে তরুণদের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।
বাংলাদেশ জাতীয় যুব কাউন্সিলের মহাসচিব একেএম নেয়ামত উল্লাহ বলেন, সমাজে বিরাজমান দীর্ঘদিনের সমস্যা তরুণদের হতাশ করে। এ সমস্যা সমাধানে তরুণরা বিভিন্ন সংগঠনের সাথে মিলে আগেও স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করেছে। তবে অধিকতর ভালো ফলের আশায় তারা এখন নিজেরাই সংগঠন গড়ার দিকে ঝুঁকছে। এতে একদিকে যেমন আত্মকর্মসংস্থান হচ্ছে, অন্যদিকে সমাজের সমস্যা দূরকরণেও কার্যকর ভূমিকা তারা রাখতে পারছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. নূরুল ইসলাম বলেন, আমাদের তরুণের সংখ্যা অনেক বেশি। এটি আমাদের জন্য অনেক বড় সম্ভাবনা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য তরুণদের ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। পৃষ্ঠপোষকতা করছি না। কিন্তু তরুণরা সবসময়ই উদ্যোমী। অবসর সময়ে তারা কিছু করার চিন্তা করে। এ থেকেই তারা বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কাজের সাথে যুক্ত হয়। দীর্ঘদিন ধরে যখন সমস্যার সমাধান হতে দেখেন না, তখনই স্বতন্ত্র সংগঠন গড়ার দিকে আগায়। আমাদের বর্তমান তরুণদের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করা তরুণ সংঘ বেড়েছে। এটি ইতিবাচক। এতে একদিকে তরুণরা যেমন আশা পূরণের পথে হাঁটতে পারছেন, অন্যদিকে বেকার সমস্যাও কমছে।’