গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার উদ্বোধন সেপ্টেম্বরেই

নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে নির্ধারিত সময়ের আগেই চালু হতে যাচ্ছে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার। আগামী মাসের শেষ দিকে দেশের বৃহত্তম এই ফ্লাইওভার উদ্বোধনের জোর প্রস্তুতি চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের একমাত্র বেসরকারি বিনিয়োগে নির্মিত স্বপ্নের এই ফ্লাইওভারের উদ্বোধন করবেন। নির্ধারিত সময়ের তিন মাস আগেই উদ্বোধন হতে যাচ্ছে এ ফ্লাইওভার। চুক্তি অনুযায়ী এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের বৃহত্তম এই ফ্লাইওভারের কাজ সম্পন্ন করার সর্বশেষ সময় বেধে দেয়া হয়। সরকারের বিশেষ নজরদারির কারণে নানা প্রতিকূলতার মাঝেও ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ এগিয়ে গেছে। ২০১১ সালের ৩০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে প্রথম পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় গৃহীত এ প্রকল্পের নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এতে সম্পূর্ণ অর্থায়ন করছে ওরিয়ন গ্রুপ। ১৯৯৮ সালে গুলিস্তান থেকে যাত্রাবাড়ি পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়। এজন্য বিশ্বব্যাংক আড়াই শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এ ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ফ্লাইওভারটি নির্মাণ কাজ বাস্তবায়নের কথা ছিল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের। কিন্তু এর নির্মাণ কাজ শুরু নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতার সৃষ্টি হয়। ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর দীর্ঘ প্রায় দুই বছর এ ফ্লাইওভার নির্মাণ লাল ফিতার দৌরাত্মে চাপা পড়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালে তত্কালীন সরকার বেসরকারি বিনিয়োগে ফ্লাইওভার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন ৬.৭ কিলোমিটার দৈর্ঘের এ ফ্লাইওভারের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৭০ কোটি টাকা। দরপত্রের প্রক্রিয়া শেষ করতে আরো প্রায় দুই বছর পার হয়ে যায়। ২০০৫ সালের ২১ জুন ফ্লাইওভারটি নির্মাণে ওরিয়ন গ্রুপের সাথে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের চুক্তি হয়। কিন্তু কাজ শুরুর পূর্ব মুহূর্তে তত্কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে এ প্রকল্পের সকল কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়। এরপর বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে ফ্লাইওভারটি ‘জনগুরুত্বপূর্ণ’ হিসাবে চিহ্নিত করে এবং বাস্তবায়নের কাজ হাতে নেয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ আগ্রহে পুনরায় সমীক্ষা পরিচালনার মাধ্যমে ফ্লাইওভারের নকশা আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সংশোধিত নকশায় ফ্লাইওভারের মোট দৈর্ঘ্য বেড়ে দাঁড়ায় ১১ কিলোমিটার। ফ্লাইওভারের দৈর্ঘ্য ও আনুষঙ্গিক সুবিধা, নির্মাণ সামগ্রির মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি প্রভৃতি কারণে এ প্রকল্পের বিনিয়োগ ব্যয় দফায় দফায় বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। প্রকল্প এলাকায় বিভিন্ন সেবা খাতের স্থাপনা সরানোর কাজে মন্থরগতি এবং হরতাল-অবরোধের মতো বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে শেষ মুহূর্তে এসে প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হয়। এমনকি প্রকল্প এলাকায় বিভিন্ন সেবা খাত যথা ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি), তিতাস গ্যাস এবং বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) বিদ্যমান লাইন সরানোর কাজ ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার সময় বেধে দেয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঢাকা ওয়াসার পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও ড্রেনেজ কোন লাইনই সরানো হয়নি। এসব লাইন ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে মারাত্মক অন্তরায় হয়ে রয়েছে। ওয়াসার লাইন অপসারণ না করার কারণে ফ্লাইওভারের ফাউন্ডেশনের ডিজাইন পুনরায় সংশোধন করে এর নির্মাণ পদ্ধতি পরিবর্তনের মাধ্যমে কাজ শুরু করতে হয়। প্রকল্প এলাকায় রাস্তার ওপর অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাস টার্মিনাল সরানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও তা কার্যত বাস্তবায়িত হয়নি। গত বছর ডিসেম্বর মাসে সেবা খাতের স্থাপনা সরানো, রাস্তার ওপর যানবাহন পার্কিং বন্ধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কারের জন্য সেনাবাহিনী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এরপর গত এপ্রিল মাসে সংশ্লি¬ষ্ট মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এ কাজে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু বিজিবি সদস্যদের এখনো নিয়োজিত করা হয়নি। তবে এসব প্রতিকূলতার মাঝেই কাজ এগিয়ে যায়। এই ফ্লাইওভার প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, যাত্রাবাড়ি সংলগ্ন কুতুবখালি প্রান্ত থেকে পলাশি পর্যন্ত ফ্লাইওভারের মূল অংশের কাজের ৯৬ ভাগ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন এই মূল অংশের কার্পেটিং এবং উভয়প্রান্তে টোল প্লাজা নির্মাণের কাজ চলছে। সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে মূল ফ্লাইওভার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হবে। এরপর দুই মাসের মধ্যে ফ্লাইওভারের বাকি প্রবেশ ও বহির্গমন ‘র্যাম্প’গুলো চালু করা হবে।