মক্কা ও মদিনায় হাজীদের এক দিনের কার্যাবলী

১. ওজু সহকারেই মসজিদুল হারাম সমূহে প্রবেশ করুন। ওজু খানায় প্রচন্ড ভীড়ের কারণে হোটেল থেকেই ওজু বানিয়ে নিন। ওজুর শুরুতে বলুন ’বিসমিল্লাহ’। ওজু শেষে কালেমা শাহাদাত্ পাঠ করুন। তারপর নিম্নের দো’আটি পড়ুন—‘আল্লাহুম্মাজ ’আলনী মিনাত তাউওয়াবীনা ওয়াজ’আলনী মিনাল মুতাত্বহহীরীন’ (হে আল্লাহ! আমাকে তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভূক্ত করুন)। ২. মিসওয়াক করুনঃ ‘মিসওয়াক মুখের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যম, আল্লাহর সন্তুষ্টির উপায়’ (মুসলিম)। ৩. বাথরুম/টয়লেটে প্রবেশ কালে দো’আ পড়ৃন—‘আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খাবায়িছ’ (হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট অপবিত্র জিন নর ও নারীর (অনিষ্ট) হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি)। বাথরুম/টয়লেট হতে বাহির হওয়ার সময় পড়ৃনঃ ‘গুফরানাকা’ ( হে আল্লাহ! আপনার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি)। ৪. মসজিদুল হারাম (এবং যে কোন মসজিদ) এ প্রবেশের সময় দো’আ পড়ুনঃ ডান পা দিয়ে প্রবেশ করুন এবং বলুনঃ ‘বিসমিল্লাহি ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রসূলিল্লাহ! আল্লাহুম্মাফ তা’লী আবওয়াবা রহমাতিক’ (আল্লাহর নামে প্রবেশ করছি! অসংখ্য দরুদ ও সালাম আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম এর প্রতি বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ! আমার জন্য আপনার রহমতের দরজা সমূহ খূলে দিন)। ৫. মসজিদুল হারাম (এবং যে কোন মসজিদ) হতে বের হওয়ার দো’আঃ বাম পা দিয়ে বের হবেন এবং বলুন ‘বিসমিল্লাহি ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রসূলিল্লাহ! আল্লাহুমা ইন্নিআস আলুকা মিন ফাদলিক’ (আল্লাহর নামে বের হচ্ছি! অসংখ্য দরুদ ও সালাম আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম এর প্রতি বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার নিকট আপনার অনুগ্রহ কামনা করছি)। ৬. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়াও অন্যান্য সুন্নাত/নফল নামাজ আদায় করুন—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদুল হারাম সমূহে জামায়াতের সাথে আদায় করবেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ছাড়াও নিম্নের নফল/সুন্নাত নামাজ গুলোও পড়তে চেষ্টা করবেন। ক. তাহিয়্যাতুল ওজু ও তাহিয়্যাতুল মাসজিদ (দাখলুল মসজিদ) নামাজ— যতবার ওযু করে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবেন ততবার ২ রাকাআত তাহিয়্যাতুল ওজু নামাজটি পড়বেন। যতবার মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবেন ততবার ২ রাকাআত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামাজটি পড়বেন (প্রবেশ মাত্রই ফরজ তাওয়াফ ব্যতীত), এবং যদি ফরজ জামাত আরম্ভ না হয়। খ. তাহাজ্জুদ নামাজঃ মসজিদুল হারামে গিয়ে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করবেন। তাহাজ্জুদ নামাজ কমের পক্ষে ৪ রাকাআত। গ. এশরাকের নামাজ—এই নামাজের ওয়াক্ত সূর্য্য উদয়ের কিছুক্ষণ (প্রায় ২৩ মিনিট) পর হতে এক/দেড় ঘন্টা পর্যন্ত! দুই রাকাআত করে ৪ রাকাআত। আপনি যদি ফজর নামাজ শেষে ক্বারাঘর তাওয়াফ করেন কিংবা মদিনায় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম এর রওজা জিয়ারত করেন তাহলে তাওয়াফ অথবা জেয়ারত শেষে এশরাক নামাজের ওয়াক্ত হয়ে যাবে। ক্বাবাঘর তাওয়াফ করলে প্রথমে সালাতুত তাওয়াফ নামাজটি পড়বেন, তারপর এশরাকের নামাজ পড়বেন। ঘ. যাওয়ালের নামাজঃ দিপ্রহরের পরপরই ২ রাকাত নামাজ। ঙ. জানাযার নামাজঃ মসজিদুল হারাম সমূহে প্রায় প্রত্যেক ফরজ জামায়াতের পর জানাযা নামাজ অনুষ্ঠিত হতে পারে! তাই ফরজ জামায়াতের পরপরই অন্য নামাজের নিয়ত করবেন না। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম এর প্রদর্শিত ফরজ নামাজ শেষে তাসবীহ-দো‘আ পড়তে থাকুন এবং জানাযা নামাজের ঘোষণা হলে জানাযার নামাজ আদায় করবেন। জানাযার নামাজের এই সুযোগ আপনি (বিশেষ করে মহিলারা) বাংলাদেশে এসে পাবেন না! জানাযার নামাজের নিয়ম কানুন অবশ্যই হজ্জ/উমরাহ গমনের পূর্বে ভালভাবে জেনে নিন এবং দো’আ গুলো মুখস্থ করুন। (১). ৪ তাকবীরের সাথে জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। (২). ১ম তাকবীর: ঈমামের ‘আল্লাহু আকবর’ বলার সাথে সাথেই আপনিও দুই হাত উঠিয়ে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে হাত বেঁধে নিয়ে ‘সানা অথবা সুরা ফাতিহা’ পড়ুন। (৩). ২য় তাকবীর: ঈমাম যখন ২য় বার ‘আল্লাহু আকবর’ বলবেন, আপনিও তাকবীর বলে দরুদ শরীফ পড়ুন। (৪) ৩য় তাকবীর: ঈমামের ৩য় তাকবীরের সাথে ‘আল্লাহু আকবার’ বলুন এবং নিম্নের দো’আটি পড়ুন। ‘আল্লাহুম্মাগ ফিরলি হাইয়্যিনা ওয়া মায়্যিতিনা, ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা, ওয়া ছাগিরিনা ওয়া কাবিরিনা, ওয়া যাকারিনা ওয়া উনসানা। আল্লাহুম্মা মান আহ্্ইয়াইতাহু মিন্না ফা আহিয়হি আলাল ইসলাম, ওয়ামান তাওয়াফফাইতাহু মিন্না ফাতা ওয়াফ’ফাহু আলাল ্ঈমান’ (হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত ও মৃত, উপস্থিত ও অনুপস্থিত, ছোট ও বড়, নর ও নারীদেরকে ক্ষমা করুন। আমাদের মাঝে যাদের আপনি জীবিত রেখেছেন, তাদের আপনি ইসলামের উপর জীবিত রাখুন, আর যাদেরকে মৃত্যু দান করেন তাদেরকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দান করুন) । (৫) ৪র্থ তাকবীর: ঈমামের ৪র্থ বার তাকবীর বলার পর আপনিও ‘আল্লাহু আকবর’ বলুন ও সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করুন। ৭. মসজিদুল হারামে ব্যয় করুন মূল্যবান সময় এবং বেশী বেশী নফল তাওয়াফ করুন—প্রয়োজনীয় জরুরত (নিদ্রা, গোসল, টয়লেট, খাওয়া-দাওয়া ইত্যাদি) ব্যতীত হোটেলে বসে থাকবেন না, হারামে চলে আসুন। হোটেলে বসে থাকলে আপনি গল্প/আড্ডা/গীবত্ সহ অন্যান্য অপকর্মে লিপ্ত হতে পারেন! আর হারামে এলে অবশ্যই আপনি ক্বাবাঘর তাওয়াফ, কুরআন তেলাওয়াত, নফল নামাজ ও তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদি সত্কর্মে/ইবাদতে নিয়োজিত থাকবেন। বেশী বেশী নফল তাওয়াফ করুন। ৮. জমজমের পানি পানঃ জমজমের পানি তৃপ্তি সহকারে পেট ভরে পান করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সল্লাম বলেন, ‘পৃথিবীর সর্বোত্তম পানি হচ্ছে জমজমের পানি’। তিনি জমজমের পানি পান করতেন এবং বলতেন ‘এটা বরকতময়, পরিতৃপ্তিকারী এবং রুগীর প্রতিষেধক’। জমজমের পানি পানের আদব—১. বিসমিল্লাহ বলুন, ২. ক্বিবলামুখী হোন, ৩. দো’আ করুন, ৪. দাঁড়িয়ে পান করুন, ৫. তৃপ্তি সহকারে পেট পুরে পান করুন, ৬. পানি পান শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলুন। জমজমের পানি পানের দো’আঃ ‘আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা ’ইলমান নাফি’আ, ওয়ারিযক্বাও ওয়াসি’আ, ওয়াশিফাআম মিন কুল্লি দা’ঈ। (হে আল্লাহ আমাকে উপকারী জ্ঞান দান করুন! পর্যাপ্ত রিযিক দান করুন! সকল রোগের শেফা দান করুন)। ৯. কুরআন তেলাওয়াত করুনঃ হজ্জ সফরে পবিত্র কুরআন অন্ততঃ একবার সম্পূর্ণ তেলাওয়াত করুন এবং অবশ্যই এর বাংলা অর্থও পড়ুন, বুঝুন এবং অন্যদের কাছে প্রচার করুন। আজই বাংলা অর্থ সহ কুরআনটি আপনার হ্যান্ডব্যাগে নিয়ে নিন। ১০. মানব সেবা/হাজীদের সেবায় নিয়োজিত হোনঃ বয়োবৃদ্ধ দূর্বল হাজীদের ঠান্ডা-জ্বর-কাশি, পায়ের ব্যাথা, পেটের পীড়ায়, বাংলাদেশ মিশনের ডাক্তারের পরামর্শ নিতে সাহায্য করুন। মক্কা-মদিনা-মীনা-আরাফায় বৃদ্ধ হাজীরা অনেক সময় তাদের হোটেল বা তাবু হারিয়ে ফেলেন, একটু সময় দিন! একজন পথহারাকে পথের সন্ধান দিন! ক্ষুদ্রতম হতে বৃহত্তর কোন কাজের প্রতিদান মানুষ থেকে আশা করবেন না। একটু সচেতন হলেই মহান আল্লাহর মেহমানের সেবার এই সুযোগ হতে আপনি বঞ্চিত হবেন না। আপনি যেমন আল্লাহর মেহমান, উপস্থিত সকল হাজীও আল্লাহর মেহমান। সংকল্প করুন এ সফরে কারো সাথেই ঝগড়ায় লিপ্ত হবেন না এবং অন্যের ঝগড়ার কারনও আপনি হবেন না, সকল হাজীকে সম্মানের চোখে দেখবেন। শরীর ও চোখ হেফাজত করবেন। বিশেষ করে, তাওয়াফ ও সায়ীর সময় নারী-পুরুষের ভীড়ের মাঝে আপন দৃষ্টিকে সংযত করবেন, সতর্কতার সাথে চলাচল করবেন। আপনার শরীর দ্বারা অন্য কোন হাজী যাতে আঘাত প্রাপ্ত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। আপনি আঘাত প্রাপ্ত হলে, ধৈর্য্য ও বিনয়ের সাথে সংবরন করবেন, অন্যের ইচ্ছা এবং অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি আল্লাহর ওয়াস্তে ক্ষমা করবেন। আপনার আমীরকে শতভাগ আনুগত্য ও সহযোগিতা করবেন।