পণ্ডিত রামকানাই দাশ

‘হাওরের ঢেউয়ের সাথে ভেসে আসা সুর থেকেই আমার সুরের শিক্ষা’

পণ্ডিত রামকানাই দাশের শোণিতপ্রবাহে নিরন্তর সুরের ধারা প্রবহমান। ছেলেবেলার শোকার্ত মায়ের কান্নার সুরও তাঁর কাছে প্রতীয়মান হয় শুদ্ধ কল্যাণের সুর হিসেবে। বাবার হাত ধরে তবলায় চাটি মেরে হয়েছেন যাত্রার বাজিয়ে, অতঃপর নিজ প্রতিভাগুণে হয়েছেন গুণী সংগীতসাধক। তালিম নিয়েছেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের রাগরাগিণীতে। তিনি উচ্চাঙ্গ সংগীতে পারদর্শিতা অর্জন করলেও পরিণত বয়সে রবীন্দ্রসংগীতের একজন সুদক্ষ প্রশিক্ষক হয়ে ওঠেন এবং শেষ বয়সে লোকসংগীতের সিডি প্রকাশ করে সংগীতবোদ্ধাদের তাক লাগিয়ে দেন। লোকসংগীতে তাঁর শিক্ষক বাবা-মা দুজনেই। সংগীতসাধনায় তাঁর অন্যান্য গুরু হলেন—ওস্তাদ কালিমোহন চক্রবর্তী (আজমিরিগঞ্জ), ওস্তাদ রাসবিহারী চক্রবর্তী (দিরাই), ওস্তাদ সুরেন্দ্র সূত্রধর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), ওস্তাদ আবু দাউদ খান (মুর্শিদাবাদ), ওস্তাদ সগীরুদ্দিন খান (কলকাতা) এবং পণ্ডিত অরুণ ভাদুড়ী (কলকাতা)। পণ্ডিত রামকানাই দাশ স্বশিক্ষিত মানুষ। পাঠশালার পাঠ শেষ করে আর তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষা এগোয়নি। কিন্তু প্রকৃতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ তাঁর কোনোদিনই থেমে থাকেনি। এ পর্যন্ত তাঁর গাওয়া গানের পাঁচটি সিডি কলকাতা ও ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। পণ্ডিত রামকামাই দাশ ২০১২ সালে বাংলা একাডেমী ফেলোশিপ অর্জন করেছেন। পণ্ডিত রামকানাই দাশের লেখা স্মৃতিকথা সংগীত ‘ও আমার জীবন’ ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত হলে সংগীতবোদ্ধাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। তাঁর প্রকাশিত অপর একটি গ্রন্থ হচ্ছে ‘সরল সঙ্গীত শিক্ষা’ (২০০৫)। তাঁর জীবন ও সাধনা নিয়ে ‘সুরের পথিক’ (২০১১) শীর্ষক একটি তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ খেয়াল গায়ক এবং লোকসংগীতের অনন্য সাধক পণ্ডিত রামকানাই দাশের জন্ম ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ এপ্রিল সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার পুটকা গ্রামে, তাঁর বাবার মাতুলালয়ে। তাঁর পৈত্রিক বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার পেরুয়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম রসিকলাল দাশ ও মা দিব্যময়ী দাশ। বাবা-মা দুজনই লোকসংগীতের সাধনা করে গেছেন। তাঁরা উভয়েই গান গাইতেন এবং গান রচনা করতেন। বর্তমানে তিনি সিলেটের করেরপাড়া এলাকায় বসবাস করছেন। প্রশ্ন : আপনার জন্ম ভাটি অঞ্চলে। হাওর-খাল-বিল-নদী-নালাবেষ্টিত ভাটি এলাকা বাংলাদেশের অপরাপর এলাকা থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। সেই এলাকার ভৌগোলিক পরিবেশ এবং আপনার জন্ম ও শৈশবের বেড়ে ওঠার কথা জানতে চাইছি। রামকানাই দাশ : মানুষ যে জায়গায় জন্মে, জন্মসূত্রেই সে ওই জায়গার যাবতীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ ধারণ করে থাকে—সেটা জেনেই হোক আর না-জেনেই হোক। বিভিন্ন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সমন্বয়েই আবহমান বাংলার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি। আমিও এমনই একটা সংস্কৃতি পেয়েছি, তবে সেটি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। সেটা আমার সৌভাগ্যই বলতে হবে। ভাটি অঞ্চলের গ্রামীণ পরিবেশ, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, সেখানে বাবা গান করতেন, মা গান করতেন। মা গান বাঁধতেন—ধামাইল গান, জামাই বান্ধার গান। ঘরের সবাই গান গাইতেন, একটু একটু রচনাও করতেন। আমার দাদু প্রকাশচন্দ্র তালুকদারও ছিলেন গীতিকার। গ্রামীণ পরিবেশে গান চলত ওর বাড়িতে-তার বাড়িতে। চার বছর বয়সেই গ্রামের সব গান শিখে ফেলি। কবিগান, ঘাটুগান, উরিগান, নৌকা বাইচের গান শুনতে শুনতে শিখি। কেউ আমাকে শিখায়নি। শুধু গান নয়, ঢপকি বাজানো, ঢোলক বাজানো, মৃদঙ্গ বাজানো সব শিখে ফেলি। কীর্তনের সঙ্গে, বাউল গানের সঙ্গে অথবা যেকোনো গান গাওয়ার সময় হাতের কাছে যা পেতাম সেটাই ঢোলক মনে করে বাজাতাম। বাংলার গান, বাংলার বাদ্য এভাবেই শেখা। প্রশ্ন : প্রথম গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলুন। রামকানাই দাশ : সেই সময়ের একদিনের কথা আবছা আবছা মনে পড়ে। আমার বয়স সম্ভবত পাঁচ বছর হবে। শাল্লা থানার রামপুর গ্রামে এক কবিগানের আসরে বাবার নেতৃত্বাধীন একটি গানের দলের শিশু গায়ক হিসেবে যোগ দিই। সেই আসরে একটি গান গাই। গান গাইতে শুরু করি। কিন্তু ছোটো হওয়ায় আসরের শ্রোতারা কেউ দেখতে পাচ্ছিলেন না। তাই আমাকে একটি টেবিলের ওপরে তুলে দেওয়া হলো। সেই টেবিলের ওপর উঠে হাজারো মানুষের সামনে জীবনে প্রথমবারের মতো বড় কোনো আসরে গান গাইলাম। এই আসরে গাওয়ার পরেই গ্রামীণ যত গান হতো, সব আসরে বাবার নিষেধ সত্ত্বেও গ্রামের পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে আসরে বসতাম। এইভাবে আমার লোকগীতির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল একটি গ্রামীণ পরিবেশ থেকে। প্রশ্ন : আপনি বলছিলেন আপনার বাবা গান গাইতেন, মা গান গাইতেন। এমনকি তাঁরা গান রচনাও করতেন। তাঁরা ঠিক কী ধরনের গান গাইতেন বা রচনা করতেন? রামকানাই দাশ :বাবাকে দেখেছি, গেরস্তি কাজে ব্যস্ত থাকতেন এবং গান-বাজনা করতেন। বাবার মাতুলালয় পুটকা গ্রামেই ওনার সমস্ত গান রচিত হয়েছিল। বাবার কোনো মামা বেঁচে না থাকায় পুটকা গাঁয়ে চলে যান সম্পত্তি রক্ষার্থে। পুটকা গ্রামটিতে যেকোনো উত্সব উপলক্ষেই গানের আসরের আয়োজন হতো। ঘাটুগান, বাউলগান, ত্রিনাথের গান—এইসব গান গ্রামের গায়করা নিজেরাই রচনা করে করে গাইতেন। অবশ্য প্রায় গ্রামেই এরকম অসংখ্য গায়ক এবং গীতিকাররা তখনকার সময়ে ছিল। আমার বাবাও ছিলেন এরকম একজন গায়ক-গীতিকার। তবে বাবার নাম-ধাম বেশি ছিল কবিগানে। একসময় বাবা পুটকা গ্রাম ছেড়ে আমাদের নিয়ে পিতৃপুরুষের ভিটা পেরুয়া গ্রামে ফিরে আসেন। তখন বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় গান-বাজনা ছেড়ে দেন। সে-সময় তো এতকিছু বুঝি না, তাই বাবার গানগুলোও আর সংগ্রহ করা হয়নি। পরে আমি যখন বুঝতে পারলাম যে, বাবার রচনাগুলো রক্ষা করার দরকার। সেটা সম্ভবত ১৯৯৫/৯৬ সাল হবে। তখন থেকেই বাবার গান সংগ্রহ করা শুরু করি। আমার বাবার কাছে যাঁরা সে-সময় গান শিখেছিলেন, এমন দুইজন শিল্পী মঙ্গলচন্দ্র দাশ এবং নবলাল দাশ—ওনাদের সিলেটে এনে আমার বাসায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ রাখি। তাঁদের মুখ থেকে বাবার গান উদ্ধার করি এবং তাঁদের কাছ থেকে সুরসহ গানগুলো শিখে নিই। ২০১৩ সালে দেবেন্দ্র সূত্রধর নামে আরও একজনকে এনে বাবার লেখা দুইটা ঘাটুগান শিখে নিই। শুনেছি প্রায় ৫০টির মতো গান বাবা লিখেছিলেন। আমার মায়ের লেখা সব গানই ধামাইল। অনেক গান আর উদ্ধার করতে পারিনি। তবে তাঁর ২০টির মতো ধামাইল গান রয়েছে আমার কাছে। উনি বিয়ের আগে বাবাকে নিয়ে একটি ধামাইল গান লিখেছিলেন—‘ওরে বন্ধু রসিকচান রাখলে না/রাখলে না তুই আমার মান/সাবধানে সাবধানে আইও/নইলে পাইবায় অপমান\’ রসিক চান মানে আমার বাবা রসিকলাল আর কি। পরের অন্তরা এ রকম—‘ফুলতারা আর চিন্তামণি/তারা করে কানাকানি/আমি নাকি দিনরজনী/তোমার প্রেমে আগুয়ান\’ ফুলতারা আর চিন্তামণি হচ্ছেন মায়ের খুড়তুতো বোন। পরের স্তবকে মা লিখেছেন—‘নিষেধ করি বারেবারে/আইও না রে ভরদুপুরে/নিশাকালে আইসা বন্ধু/বাঁশিতে দিও রে টান\’ বাবা কিন্তু খুব সুন্দর বাঁশি বাজাতে পারতেন। মা সেই কথাও গানে লিখেছিলেন। শেষ অন্তরায় গিয়ে মা লিখছেন—‘অবলা রমণীর মন/সদায় করে উচাটন/তুমি আমার জীবন মরণ/দিব্যময়ীর প্রেমের বাণ\’ ওই যে একটু আগে বললাম না, বাবা ভালো বাঁশি বাজাতে পারতেন। সেটা নিয়ে আরেকটা পৃথক গান আছে। পুরো গানটি মনে নেই। যেটুকু মনে আছে, গাইছি—‘তোরা শুন গো নীরব হইয়া/কী সুন্দর বাঁশিটি যায় বাজাইয়া/বাঁশি বাজায় রসিক চান/হেঁচকা হেঁচকা মারে টান\/কলসিতে নাই রে জল/চলো যাই যমুনার জল/চলো যাই সখিগণে মিলিয়া\’ মায়ের একটা বিখ্যাত জামাইবান্ধা গান আছে। এই গানটা এখনও অনেকেই বিয়ে-বাড়িতে জামাই স্নানের সময় গায়। গানটার ভাষা বড়ই মধুর—‘তোমরা শুনছনি গো রাই/কাইল যে আইছে নুয়া জামাই/বলদ নাকি গাই\/এক বলদ নুয়া জামাই/এক বলদ তার ভাই/আরেক বলদ সঙ্গে আইছে/তার বইনের জামাই\/চিরো যদি নুয়া জামাই/আরও চিরাইমু/লোহার জিঞ্জিল গলাত দিয়া/বান্দর নাচাইমু\/ত্যক্ত অইও না গো জামাই/বেজার অইও না/দিব্যময়ীর ঠাট্টার কথা/বাড়িত কইও না\’ হা হা হা। মা বেশ মজার মানুষ ছিলেন। গানটা শুনলেই বোঝা যায়। মা ১৯৮০ অথবা ৭৯ সালের দিকে মারা যান। মায়ের ধামাইল গানের কথা বললে শেষ হবে না। মার লেখা বিখ্যাত একটি ধামাইল প্রভাতী গানও আছে—‘তোরা বাহির হইয়া শুন সজনী/ওই করে কোকিলা ধ্বনি।/কোকিলারও কুহু স্বরে/প্রাণে ধৈর্য নাহি ধরে, ওগো সজনী\/আমার প্রাণবন্ধু আইল না কুঞ্জে/সই গো প্রভাত হইল রজনী।/গাঁথিয়া ফুলেরও মালা/মালা হইল দ্বিগুণ জ্বালা, ওগো সজনী\/আমার মনে ছিল ফুলে ফুলে/সাজাইতাম রসিকমণি।/সাজাইয়া বাসর শয্যা/আজ পইড়াছি বড় লজ্জা, ওগো সজনী\/আমার মনে ছিল প্রাণবন্ধুরে/দিতাম দিব্যময়ীর যৌবনখানি, ওগো সজনী\’ প্রশ্ন : এ তো দেখছি আপনি উত্তরাধিকারসূত্রেই গান পেয়েছেন? রামকানাই দাশ : শুধু আমিই পাইনি। আমার বাবা পেয়েছেন তাঁর বাবার কাছ থেকে। আমার দাদু পেয়েছেন আমার বড়বাপের কাছ থেকে। আমার বড়বাপ রামচন্দ্র তালুকদার অসংখ্য ঘাটুগানের রচয়িতা। আমার দাদু প্রকাশচন্দ্র তালুকদার ঘাটুগান ও উরি গান গাইতেন। দাদুও কিছু গান লিখেছেন। তাঁর লেখা একটা গান এ রকম—‘করো মা অতিথের সেবা/পূর্ণ হবে মনের আশ\’ বড়বাপ, দাদু, বাবা হয়ে সেই গান আমাদের রক্তে ঢুকেছে। আমার বড় বোন সুষমা দাশ লোকগান অসাধারণ গায়। আমার দেখা অসাধারণ ও শ্রেষ্ঠ লোকসংগীত শিল্পী ছিল চাকুয়া গ্রামের সুধীরের মা। দ্বিতীয় সুষমাদি।আমার ছোট ভাই মহাপুরুষ বাঁশি বাজাত দারুণ। এ ধরনের বাদক খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। সুধীরলাল দাশ আমার আরেক ছোট ভাই। সে লোকসংগীতের অসাধারণ গায়ক। প্রশ্ন : শুধু কি উত্তরাধিকারসূত্রেই গান পেয়েছেন? নাকি হাওর-অঞ্চলের গানের পরিবেশটাও আপনার সংগীত-জীবনে কাজে এসেছে? রামকানাই দাশ : অবশ্যই। হাওর মানেই বিশাল। বিস্তৃত তার জলের ঢেউ। ছোটবেলা থেকেই আমি প্রকৃতি থেকে শিক্ষা নিয়েছি। হাওরের ঢেউয়ের সাথে ভেসে আসা সুর থেকেই আমার সুরের শিক্ষা। হাতে-কলমে আমার তেমন কোনো শিক্ষা নেই। প্রশ্ন : এই হাওরাঞ্চলের গানের পরিবেশ কি এখনো আগের মতোই আছে? রামকানাই দাশ : এখন একটু একটু করে গানের ধারাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। ভাটি অঞ্চলের গানের যে ঢেউ আমি দেখেছি, তা অতুলনীয়। আমার ঠাকুরদার গান শুনেছি, ওনার মৃত্যুর পরে তাঁর সমসাময়িকদের গান শুনেছি। বাবার গান শুনেছি। ভাটির পরিবেশে গান শোনা-চর্চার একটা যোগসূত্র ছিল। বলা যায়, উত্তরাধিকারসূত্রে আমরা গান শুনতাম, গাইতাম। আমাদের প্রজন্মও দেখেছি। কিন্তু যুগের পরিবর্তনের কারণে সবকিছু পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন যেটা হচ্ছে, সেটা কী কারণে হচ্ছে তা বলা মুশকিল। একাল-সেকালের মধ্যে আকাশ-পাতাল পরিবর্তন। ঠাকুরদার কাছে যেসব গান শুনেছি, তা তো দূরের কথা, বাবা-জেঠাদের কাছে যে গান শুনেছি, সেসব গানও তো এখন নেই। বাউলা গান হারিয়ে গেছে। বাউলা গান মানে যেটা সম্মিলিত গান ছিল। ভাটি এলাকায় দলবদ্ধভাবে এ গান গাওয়া হতো। এখন যেটা গাওয়া হচ্ছে সেটা বাউল গান, মানে একক গান। এসব গান একতারা দিয়ে একজন শিল্পী গায়। অনেকে আবার এগুলোকে আধুনিক করছে, এগুলোকে নাকি মডার্ন-ফোক বলে! তবে আমার জন্য বোধহয় ভালোই হয়েছে! ক্ল্যাসিকাল থেকে গোড়াতে মানে শিকড়ে ফিরতে পেরেছি যুগের পরিবর্তনের কারণেই বোধহয়। পরিবর্তন যেটা, সেটা হবেই। কোনো সংস্কৃতি টিকে থাকতে হলে পরিবর্তন-পরিবর্ধন হবেই। কিন্তু আফসোস হয়, যখন দেখি ভাটি অঞ্চলের গানের ধারা হারিয়ে যাচ্ছে। গানের আসর উঠে যাচ্ছে। গানের পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে হাওর অঞ্চলের গান শেষ হয়ে যাবে। কিছুদিন পর আর কিছুই অবশিষ্ট পাওয়া যাবে না। ঘাটুগান, কবিগান, বটকিরা গান হারিয়ে গেছে। উরিগানও হারানোর পথে। প্রশ্ন : এসব গান রক্ষা করা কি সম্ভব নয়? রামকানাই দাশ : কেন সম্ভব নয়? এখনো হারানো গানগুলো সংরক্ষণের অনেক সুযোগ আছে। এখনো অনেক প্রাচীন লোক জীবিত রয়েছেন। তাঁদের ডেকে এনে সঠিক সুর-তালে গানগুলো সংরক্ষণ করা উচিত। স্বরলিপি দিয়ে এ গান টেকানো যাবে না। লোকগানগুলো মাটির গান, কাদামাটির মতোই নরম। স্বরলিপি হলো শক্ত মাটির মতো, এটা কঠিন। প্রাচীন লোকদের দিয়ে গাইয়ে এ গান উদ্ধার করা দরকার। ব্যক্তি পর্যায়ে এসব গান সংগ্রহ করা যেতে পারে, তবে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে হলে খুব ভালো হয়। প্রশ্ন : জেনেছি আপনি নাকি এসব হারিয়ে যেতে-যাওয়া প্রাচীন গান সংগ্রহ করছেন? রামকানাই দাশ : প্রাচীন লোকগান সংগ্রহে নিজে উদ্যোগী হয়েছি। নিজের চেষ্টায় অন্তত হারমোনিয়াম-তবলা ব্যবহার করে এই গানের প্রকৃত সুরগুলো রক্ষার জন্য নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করে যেতে চাই। তরুণ প্রজন্ম হয়তো তখন রেকর্ড করা ওই গানগুলো থেকে প্রচীন লোকগানের সুরের বিষয়বৈচিত্র্য সম্পর্কে অবহিত হতে পারবে। আমাকে নতুন নেশায় পেয়েছে, বিগত ১০ বছর ধরে প্রাচীন গান সংগ্রহ করে আসছি, সেসব সংগৃহীত গান গ্রামীণ শিল্পীদের কাছ থেকে সুরসমেত শিখছিও। প্রায় ৩০০ গান সংগ্রহ করেছি। তবে এসব সংগৃহীত গানের সঙ্গে আমি কোনো না কোনোভাবে পরিচিত। হয়তো কোনো গান ছোটোবেলা শুনেছি, কোনো গান বাপ-দাদাদের মুখে শুনেছি। সংগৃহীত গান নিয়ে ‘প্রাচীন লোকগান’ নামে একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করছি। প্রশ্ন : আপনি নিজের ‘আত্মস্মৃতি সঙ্গীত ও আমার জীবন’ বইয়ের কথা একটু আগে বললেন। এ রকম আরও বই প্রকাশ করার কোনো পরিকল্পনা কি আপনার রয়েছে? রামকানাই দাশ : ‘প্রাচীন লোকগান’ বইটির কাজ শেষ করে জীবিত থাকলে জীবনের নানা স্মৃতি ও গান সম্পর্কিত আরেকটি বই লেখার পরিকল্পনা রয়েছে। আমার চিন্তা-ভাবনায় অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সেই পরিবর্তনটুকু আগামী বইটিতে ধরতে চাই। পুরোনো প্রশ্নের উত্তরগুলো নতুনভাবে আমার সামনে হাজির হয়েছে। আমি সেসব পাঠকদের সামনে হাজির করতে চাই। এছাড়া বাংলা গানের সুরের বৈচিত্র্য নিয়েও কিছু লিখতে চেষ্টা করব। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কতদূর যেতে পারি। প্রশ্ন : বাংলা গানের সুরের বৈচিত্র্য নিয়ে বলছিলেন, সেটা কী ধরনের? রামকানাই দাশ : পৃথিবীতে যত সুর আছে সবের গোড়া অর্থাত্ উত্পত্তিস্থল এক। যেমন—হারমোনিয়াম ধরো, মনে করো একটা গান গাইছি। ‘সা’ তে সুরে ধরে রাখো, দেখবে হাজার রাস্তার সুর মিলেছে, এখান থেকে রওয়ানা দিয়ে সব সুরের রাস্তায় যাওয়া যায়। যেমন কান্নার সুরের কথাই ধরি। আ...আ...আ...কিংবা আল্লা...আল্লা... অথবা আ...মি ফুল বন্ধু ফুলের ভ্রমরা—‘সা’ থেকেই সমস্ত সুরের উত্পত্তি। কোনো পথে চললে লোকগীতি পাওয়া যায়, কোনো পথে চললে লালন পাওয়া যায়, কোনো পথে চললে রবীন্দ্রনাথ পাওয়া যায়। যে গান করে, সে যদি সুরের উত্স ধরতে না পারে, বিভ্রান্তি তখনই ঘটে। সাঁতার না জানলে জলের কাছে যাওয়া উচিত নয়। সুরের তাত্পর্যটা যদি ঠিক না থাকত, তাহলে বেলালের আজানের এত প্রশংসা কেন? নিশ্চয়ই সুরের কোনো মাহাত্ম্য আছে। সেজন্যই বলছি, কোনটা আজানের, কোনটা মন্ত্রের, কোনটা মারফতির, কোনটা বাউলের—সেটা জানা না থাকলে আমাদের মধ্যে সুর নিয়ে বিভেদ দেখা দেয়। প্রশ্ন : প্রাচীন লোকগানের সুর, বাউলগানের সুর কিংবা বর্তমান সময়ের আধুনিক গানের সুর—এগুলোর সাদৃশ্য-বৈশাদৃশ্য কেমন? রামকানাই দাশ : সুর ব্যাপরাটা একান্তই সুরকারের নিজস্ব ব্যাপার। এটা মনের গভীর থেকে উত্সারিত হয়, ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়। তবে আমাদের অঞ্চলের সব সুর কিন্তু একেবারেই নিজস্ব, অনেকটা প্রচীন ঘরানার। এই কাদামাটির সঙ্গে সুর লেগে আছে, এই নদীনালা দিয়ে সুর প্রবাহিত হচ্ছে। সুরটা প্রবহমান। সেই প্রচীন যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত সুরটা একটা যোগসূত্র বজায় রেখে চলে এসেছে। নেত্রকোনার বাউলসাধক আবদুস সাত্তারের গানে সুরের বৈচিত্র্য ছিল। তাঁর মাধ্যমে সুরে বেশ একটা বৈচিত্র্য এসেছে। কেবল সুরের মাধ্যমে মানুষকে পাগল করেছেন আবদুস সাত্তার। প্রাচীন বাংলা গানের অনেক সুর হিন্দি গানে চলে গিয়েছে। শচীন কর্তার মাধ্যমে হিন্দি গানে প্রচুর বাংলা সুর চলে গেছে। আবার সেই সুরগুলোও পুনরায় বাংলা গানে বিভিন্ন সুরকার-শিল্পীদের বদৌলতে ফিরে এসেছে। সিলেটের সংগীত-গুণী প্রাণেশ দাসের কথাই যদি বলি। তাঁর সুর করার গুণের খ্যাতি হিসেবে ‘সুরসাগর’ উপাধি জুটেছিল। তিনি অনেকটা সূর্যের মতো। তাঁর ধারে-কাছে কেউ নেই। সুরকারের পাশাপাশি প্রাণেশ দাস ছিলেন বাংলা গানের গায়ক, ধর্মীয় গান ভালো গাইতেন। ঘরোয়া আসরে তাঁর গান বিশেষ করে—দুর্গাপূজা, কালীপূজা, লক্ষীপূজাসহ বিভিন্ন আসরে তিনি গান গেয়ে শ্রোতাদের মাতাতেন। প্রশ্ন : এই যে সুর ও গানের পেছনে আপনি জীবনভর নিরন্তর ছুটে চলছেন। সেই ছুটে চলার পেছনের ইতিহাসটাও আমরা শুনলাম। ভাটি অঞ্চল, অবারিত হাওর, গ্রামে যেকোনো উত্সব-উচ্ছ্বাসে গানের আয়োজন এবং পরিবারে গানের চর্চা—এসব কিছুই তো আপনাকে শিল্পী করেছে, ভাবুক করেছে। সেটা তো নিঃসন্দেহেই আমরা বলতে পারি, নাকি? এবার আপনার সংগীত-জীবনের উত্থানের দিকটা একটু শুনতে চাইছি। রামকানাই দাশ : আগেই বলেছি, গ্রামীণ গানের পরিবেশে আমার জন্ম। গান শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। পড়াশোনার পাঠ চুকে যাওয়ার পর বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে সংসারের হাল ধরতে হয়। তখন বয়স ১০/১১। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে পৈতৃক ছয় কিয়ার (বিঘা) জমির মধ্যে ছোটভাই সুধীরকে নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করি। ঠিক তখনই শাল্লা থানায় রামপুর গ্রামের রাধাকান্ত সরকার একটি শৌখিন যাত্রাদল করেন। তিনি আমার বাবার আপন মাসতুতো ভাই। এখান থেকেই আমার জীবন অন্য দিকে মোড় নেয়। এতদিন গ্রামীণ বাউল আর জারি-সারি করেছিলাম। এখন এই যাত্রায় গিয়ে তবলাসহ বিভিন্ন তাল, রাগ-রাগিণীর সঙ্গে এবং লোকসংগীতের বিভিন্ন ধারা ছাড়াও সংগীত-গুণী ব্যক্তিদের সঙ্গে পরিচিত হই। তখন হেমন্ত থেকে ছয় মাস জমির কাজ, বর্ষা থেকে ছয় মাস যাত্রাদলে কাজ করতাম। এসময় হাতের কাছে যে ডালটি পেতাম সেটিই আঁকড়ে ধরতাম। এভাবেই এ ডাল থেকে সে ডাল, এখান থেকে সেখানে—যেখানে যা শিক্ষণীয় জিনিস পেয়েছি, সাধ্যমতো আপ্রাণ শেখার চেষ্টা করেছি বা শিখেছি। সে-সময়ে কারও কাছে তালিম ছাড়াই তবলা, হারমোনিয়াম ও ছোটখাটো তাল শিখে ফেলেছি। ঠিক সেই সময়টাতে আমার জীবনে আরেকটি সুবর্ণ সুযোগ আসে। তত্কালীন দিরাই থানার শ্যামরচার বাজারে একটি যাত্রাপার্টি হয়েছিল। এই পার্টির সঙ্গে পরিচালক ছিলেন জলসুখা গ্রামের ওস্তাদ কালীমোহন চক্রবর্তী। যাত্রার ম্যানেজার চিত্তরঞ্জন রায় আমাকে খুব ভালোবাসতেন। আমাকে ডেকে বললেন, ‘রামকানাই, চলো তুমি আমাদের দলে বাইন হিসেবে কাজ করবে।’ এই কথা বলে তিনি আমাকে ওস্তাদ কালীমোহনজির কাছে নিয়ে যান। এবং ওস্তাদজিকে বলেন, ‘দেখেন তো পরীক্ষা করে ওস্তাদজি, এই ছেলেটিকে দিয়ে আমাদের বাইনের কাজ চলবে কি না?’ ওস্তাদজি আমার বাজনা শুনে বলেছিলেন, ‘চলবে। তবে শিখতে হবে।’ সঙ্গে সঙ্গেই হাতে ‘ডোর’ বেঁধে শাস্ত্রসম্মতভাবে গুরুজির কাছে তালিম নিতে থাকি। পরবর্তী সময়ে নিজের থানা ছাড়িয়ে আশপাশের গ্রাম-থানায় বাদক হিসেবে নামধাম ছড়াতে থাকে। এসময় আমার করিম ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। করিম ভাইয়ের বাড়ি থেকে আমার বাড়ি দেড় মাইল দূরে। এই গান-বাজনার কারণেই শাল্লা থানার চাকুয়া গ্রামের সাথে আমার আত্মিক বন্ধন হয়ে যায়। চাকুয়া গ্রামের সুরেশ বাবুর যাত্রাদলে আমি তবলাবাদক হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হই। সেই সময়ে ভাটি অঞ্চলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীতগুণী রাসবিহারী চক্রবর্তীর কাছে শিক্ষার সুযোগ হয়। আরও পরে বুঝতে পারলাম—গান-বাজনা পদ্ধতিগতভাবে শিখতে হবে। গ্রামোফোন রেকর্ডে জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামীর ক্ল্যাসিকাল গান শুনে অভিভূত হই। এবং সেই সময়েই সিদ্ধান্ত নিই—এই গান আমাকে শিখতে হবে। পরে আমার জীবনে যে বড় সুযোগ আসে, তা হলো আজমিরিগঞ্জ বন্দরে সংগীত শিক্ষক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। আজমিরিগঞ্জে ১৯৫৬-৬০ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করি। এরপর সুযোগ আসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভোলানাথ অপেরার যাত্রাদলে যোগদান করার। এই দলটির মালিক ছিলেন যতীন চক্রবর্তী। এই দলে বিবেকের গান, ক্ল্যাসিকাল, বাইনসহ গান-বাজনার সকল শাখায়ই খুব ভালো চর্চা হতো। তখনকার সময়ে যাত্রাগুলোর মধ্যে মানবিক শিক্ষার একটি দিক থাকত। নীতিবোধের পাঠ পৌরাণিক পালায় পরিষ্কারভাবে থাকত। একসময় যাত্রাদল ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাদক-সংগীতশিক্ষক হিসেবে অসংখ্য শিল্পীদের গান-বাজনা শিখেয়েছি। এরপর ১৯৬৭ সালের ১৭ আগস্ট সিলেট বেতারে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে যোগ দিয়ে পাকাপাকিভাবে সিলেটে কর্মজীবন শুরু করি। প্রশ্ন : বেতারের সে-সময়ের দিনগুলো কেমন ছিল? রামকানাই দাশ : রেডিওতে শুরুর দিকে যখন তবলা বাজাতাম তখন আমাকে স্টুডিও ঘরের এক কোনায় জায়গা দিত তবলা বাজানোর জন্য। যাত্রাগান থেকে গিয়েছি, হাত বড়। বাজাতাম জোরে, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে আমার ভুল ভাঙল। নিজের বাজানো বাজনার টোন নিজের কানের কাছেই রুক্ষ মনে হতে লাগল। এটা বুঝতে পেরে তবলা বাজানোটা নিয়ন্ত্রণে আনি। এরপর তো প্রায় সবশিল্পীই আমার তবলা বাজানোর সঙ্গে গান গাইবার ইচ্ছা প্রকাশ করতে লাগলেন। পরবর্তী জীবনে বিশ্ববিখ্যাত শিল্পীদের সঙ্গে তবলা বাজিয়েছি। প্রশ্ন : তবলা ছেড়ে গানে প্রবেশ করলেন কবে? রামকানাই দাশ : তবলা ছেড়ে গান—এটি ঠিক নয়। তবলা বাজানোর পাশাপাশি গানের সাধনা আমি সবসময়ই করেছি। তবে শুরুর দিকে তবলা বাজাতাম বেশি, গান গাইতাম কম। এখন যেমন উল্টোটা চলছে। একসময় ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে পরিচয়ের ফলে আমার জীবনের চিন্তা-ভাবনা অন্যদিকে মোড় নেয়। তাঁর সঙ্গে মিশে আমি নিজেকে চিনতে পেরেছি। সেই মহান ব্যক্তিকে আমি প্রশংসা করব না। এককথায় শ্রদ্ধেয় ওয়াহিদুল হক হচ্ছেন আমার জীবনে এক ধ্যানের দেবতা। ওয়াহিদ ভাই আমার কণ্ঠের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং এ নিয়ে লিখেছেনও। দেশ-বিদেশের অনেক প্রখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে এক মঞ্চে গান গাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ভারতের বোম্বের খেয়াল গায়ক উলহাস কুশল কর, সেতারবাদক বোধাদিত্য মুখোপাধ্যায়, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে দিল্লির শান্তি শর্মা, বাংলাদেশের বারীণ মজুমদার, আদনান সাদনানীসহ বাংলাদেশের শুদ্ধসংগীত প্রসারগোষ্ঠীর আয়োজনে দেশের প্রায় অনেকের সঙ্গে গান-বাজনায় অংশ নিয়েছি। লোকসংগীতে শাহ আবদুল করিম, উকিল মুন্সির ছেলে আবদুস সাত্তারসহ অনেকের সঙ্গে গেয়েছি। আনুমানিক ১৯৫০ সালের দিকে শাল্লা থানার মাহমুদনগর গ্রামে আয়োজিত এক উরসে উকিল মুন্সির সঙ্গে ঢপকি বাজিয়েছিলাম। সেটাও আমার জীবনে সুখকর স্মৃতি। প্রশ্ন : তবলা-বাদক, লোকগানের শিল্পী, শাস্ত্রীয় সংগীতের পণ্ডিততুল্য ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত হচ্ছেন। গানের সব শাখাতেই সমান পারদর্শিতা অর্জন করেছেন। এই বয়সে এসে এখন গানের কোন মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? রামকানাই দাশ : আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল লোকসংগীত চর্চা থেকে দূরে সরে যাওয়া। মাটি ভুলে গিয়েছিলাম। তখন লোকসংগীতকে প্রকৃত দাম দিতে শিখিনি। বলা বাহুল্য, ভুল বুঝতে পেরে আবার ফিরে এসেছি। লোকসংগীতের সঙ্গে উচ্চাঙ্গ সংগীতের কোনো বিরোধ নাই। আমি ভাবতাম উচ্চাঙ্গ সংগীতের চর্চা করতে পারলেই বড়ো শিল্পী হওয়া সম্ভব। ভুল, সব ভুল। কোনো গানের ধারার সঙ্গে অপর গানের ধারার কোনো বিরোধ নাই। সব সমান, সব সমান। রবীন্দ্রনাথ পড়ে আমার বড় লাভ হলো। উচ্চাঙ্গ সংগীত থেকে আবার লোকসংগীতে ফিরে আসতে পেরেছি একমাত্র রবীন্দ্রনাথের জন্যই। রবীন্দ্রনাথ আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। এখন আমি নিজে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি প্রাচীন লোকগীতিতে। পরে বটকিরা গান, ঘাটুগান এবং শাস্ত্রীয় গানের চর্চা করি। তবে ‘শাস্ত্রীয় গান’ না বলে একে খেয়াল গান বলাই ভালো। কারণ শাস্ত্রীয় বললে একটা অশাস্ত্রীয় ব্যাপারও চলে আসে। একজন তবলা বাদক হিসেবে আমার কিছুটা খ্যাতি রয়েছে। বাদক হিসেবে অনেক প্রশংসাও পেয়েছি। সত্যি বলতে কী—বাজাতে আমার বেশ ভালোই লাগে। এটা আমি খুব উপভোগ করি। প্রশ্ন : আপনি বলছিলেন যে—প্রাচীন লোকগীতি আপনার গাইতে ভালো লাগে। এই লোকগীতি মূলত কোন গানগুলো? রামকানাই দাশ : লোকগীতি কথাটা বেশিদিন আগের না। আগে তো আমরা বাউলা, ঘাটু, উরি—এইসব গানের নাম শুনতাম। রেডিওর কারণে লোকগীতি, পল্লিগীতি শব্দগুলো জনপ্রিয় হয়ে গেল। পল্লিগীতিটা আধুনিককালের, নতুন লেখকের। আর প্রাচীন লোকগীতিটা হচ্ছে যুগে যুগে বয়ে আসা গান, এ মুখ থেকে সে মুখে। লোকের মুখে মুখে বয়ে আসা গান, যেসব গানের গীতিকারের সন্ধান পাওয়া যায় না, সেসব লোকগীতি হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকল। বাংলার লোকসংগীতটা একটা প্রচলিত সুরের মাধ্যম। লালন ফকিরের গান প্রাচীন নদীয়ার ভেসে আসা গানেরই ধারাবাহিকতার অংশ। প্রায় গান শুনলে একই রকম মনে হয়। যদি হরি আচার্যের গানের কথাই ধরি। ভাষার বিন্যাস কী চমত্কার—‘শ্যাম বিচ্ছেদে কাতর অতি’। এসব গানেও তো লোকগানের সুরই ব্যবহূত হয়েছে। প্রশ্ন : আপনি আগেই বলেছেন, সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে গানগুলো হারাচ্ছে। কিন্তু আপনাদের প্রজন্ম আর আমাদের প্রজন্মের মধ্যে গানের আদান-প্রদানের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটা কেন? কিংবা বর্তমান প্রজন্মের গাওয়া গানগুলো কোন দৃষ্টিতে দেখছেন? রামকানাই দাশ : রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়, ‘অসীম কালের যে হিল্লোলে, জোয়ার-ভাটায় ভুবন দুলে।’ পরের লাইনটা তো আরও ভয়াবহ। ঠাকুরদা-বাবা-আমি তিন প্রজন্মের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর গান উত্তরাধিকারসূত্রে বহন করেছি। একাত্তর সালে এসে একটা গ্যাপ তৈরি হয়। গানের উত্তরাধিকার বহনের ক্ষেত্রে একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। বর্তমান প্রজন্মকে চিনি না, কেন যেন একটু অচেনা মনে হয়। তারাও আমাকে চেনে না, ফলে একটা গ্যাপ তৈরি হয়ে গিয়েছে। এই বর্তমান প্রজন্ম এবং আমাদের প্রজন্মের মধ্যে যে ব্যবধানটা তৈরি হয়েছে, সে-কারণে অনেক গান হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমান প্রজন্মকে মন্দ বলা যাবে না। আমাদেরও দোষ আছে। আমরা হয়তো সেভাবে তাদের কাছে আমাদের প্রজন্মের গান তুলে ধরতে পারিনি। প্রশ্ন : কথাপ্রসঙ্গে আপনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা উল্লেখ করছেন। তাঁর মধ্যে কী খুঁজে পেলেন? রামকানাই দাশ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যে আমি মানুষ হওয়ার মন্ত্র জানতে পেরেছি। হিন্দু কিংবা মুসলমান নয়, স্রেফ মানুষ হওয়ার ধর্মটাই হচ্ছে আসল। মানুষ হিসেবে সবাইকে ভালোবাসতে হবে। প্রশ্ন : এবার আপনার ভবিষ্যত কোনো পরিকল্পনার কথা জেনে সাক্ষাত্কার শেষ করতে চাইছি। রামকানাই দাশ : ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা ‘করমু নে’ বলে কোনো কাজ নেই। ফেলে রেখে পরে কাজ করার মানুষ আমি নই। যেটুকু সামর্থ্য আছে শুরু করে দিই। কাজটা যদি ভালো হতে থাকে, আপনা-আপনি ভালো হবে। এই যেমন এখন নিজের বাসাতে সপ্তাহে একদিন ছিন্নমূল ও দরিদ্র শিশুদের অবৈতনিক গান শিক্ষা দেওয়ার কাজ শুরু করেছি। ভালোই তো যাচ্ছে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের নিয়ে। এখান থেকে যদি একজন-দুজন শিল্পী বেরিয়ে এসে বাংলাগানকে সমৃদ্ধ করতে পারে—সেটার চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে?