‘সৈনিক কবি’ নজরুল
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০১৩, ১৯:১৭
সৈনিক নজরুল
মুহাম্মদ লুত্ফুল হক
প্রচ্ছদ :কাইয়ুম চৌধুরী
প্রকাশক :প্রথমা প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ :জুন ২০১৩
মূল্য : ২২০ টাকা
মুুহাম্মদ লুত্ফল হক-এর ‘সৈনিক নজরুল’ বইটির আলোচনা লিখতে গিয়ে খানিকক্ষণ ভাবলাম, নজরুল ব্যতীত ‘সৈনিক কবি’ কিংবা ‘হাবিলদার কবি’ অথবা এ জাতীয় কোনো উপাধি নিয়ে বিশ্বসাহিত্যে আর কোনো কবি বা সাহিত্যিক আছেন কি না! যতদূর মনে পড়ে, নাই অথবা থাকলেও আমার অজানা। যাহোক, বহুদিক বিবেচনায় আলোচনার দাবিদার এ বইটির দুটি বিশেষ দিক লক্ষণীয়। প্রথমত, এক মলাটে নজরুলের তিরিশ মাস সৈনিক-জীবনের একটি সুখপাঠ্য ইতিহাস, যার নিদর্শন ইতিপূর্বে নেই, আর তাঁর বহুবিধ প্রতিভার স্ফূরণে সৈনিক-জীবনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা। বলতে গেলে এ দুইয়ে মিলে এ গ্রন্থের এগিয়ে চলা। বলে রাখা ভালো, সবচে কম আলোচিত হওয়া কিংবা নানা কারণে এড়িয়ে যাওয়া নজরুলের সৈনিক-জীবনকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ প্রকাশ করে লেখক লুত্ফুল হক গবেষক-পাঠক-সাহিত্য-সমঝদারদের অতৃপ্তি অনেকাংশে ঘুচিয়েছেন।
গ্রন্থটিতে নয়টি ভিন্ন শিরোনামে নজরুলের সৈনিক-জীবনকে দেখার ও ব্যাখা করার চেষ্টা করেছেন লেখক। ভূমিকাতে স্পষ্ট বলেছেন, নজরুলের কাব্য প্রতিভাকে বিচার-বিশ্লেষণের সময় বরাবরই তাঁর কৈশোর বা সৈনিক-জীবনের ইতিহাসকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। অথচ যে তিরিশটি মাস তিনি বাঙালি পল্টনে কাটিয়েছেন তার বর্ণনা নজরুলকে কবি হিসেবে মূল্যায়নে খুবই জরুরি। যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন আসে, নজরুলের মতো প্রাণচঞ্চল একটি ছেলে কেন লেটুর দল ছেড়ে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলিত জীবনযাপন বেছে নিয়েছিলেন! উত্তর সবারই অজানা। এমনকি নজরুল নিজেও এর উত্তরটি অস্পষ্ট রেখেছেন। কেউ বলেন, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন; কারও মত, সেনাবাহিনীর মোটা অঙ্কের বৃত্তি তাঁকে এ জীবন বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল; কিংবা কারও কারও ধারণা—বিপ্লবী দলের সঙ্গে গোপন আঁতাতের দরুন গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে নজরুল যোগ দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে। তবে নজরুল যখন বলেন, তাঁর অনেক খামখেয়ালীর উত্তর তিনি নিজেই জানেন না তখন উপর্যুক্ত কোনো hypothesis-ই ধোপে টেকে না। মোটের ওপর এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে নজরুলের অ্যাডভেঞ্চার-প্রীতি ও বিপ্লববাদী চিন্তা তাঁকে ভিন্ন জীবনের স্বাদ নিতে প্রেরণা জুগিয়েছিল। এ ছিল মোটাদাগে ‘কেন সৈনিক-জীবন’ শিরোনাম সম্বলিত অধ্যায়টির মোদ্দাকথা।
কখন নজরুল বাঙালি পল্টনে যোগ দেন—এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক কিছুকাল আগপর্যন্তও ছিল। তবে লুত্ফুল হক এ বইতে নানা তথ্য-উপাত্ত ও যুক্তির মাধ্যমে সে বিতর্ককে অনেকটাই মৃদু করতে পেরেছেন বলে আমার ধারণা। তাছাড়া এ অধ্যায়ে নজরুলের বাঙালি পল্টনে যোগদানের কিছু বস্তুনিষ্ঠ তথ্যও উপস্থাপিত হয়েছে যা প্রচলিত নানা ভ্রান্তির অবসান ঘটিয়েছে। এরপরই লেখক আলোচনা করেছেন নজরুলের সৈনিক-যোগ্যতা ও পল্টন যাত্রার নানান ছোট ছোট কাহিনি। এসব গল্পে একথা স্পষ্ট হয়েছে, সেনাবাহিনীতে যোগদানের প্রায় সবরকম যোগ্যতাই নজরুলের ছিল। নিজের দক্ষতা প্রমাণপূর্বক নজরুল তাঁর প্রায় তিরিশ মাসের সময়সীমায় সেপাই থেকে ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত পদোন্নতি পান।
‘পল্টনের দিনগুলো’ শিরোনামের অধ্যায়ে নজরুলের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও রাজনীতি চর্চা—এ চারটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ দিক আলোচিত হয়েছে। ১৩২৬ বাংলায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় নজরুলের লেখা প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। নাম ‘মুক্তি’ (১৯১৯)। এ থেকে প্রমাণ হয়, নজরুলের সাহিত্য চর্চা স্কুলজীবনে শুরু হলেও এর উল্লেখযোগ্য বিকাশের একটি সময় সৈনিক-জীবন। তাছাড়া নজরুলের গল্প-প্রতিভার স্ফূরণও ঘটে ওই সময়কালেই। নির্দ্বিধায় বলা সমীচীন, সৈনিক-জীবন নজরুলকে সাহিত্য চর্চার শক্ত ভিত তৈরি করে দিয়েছিল। ফারসি ভাষা শিক্ষা ও চর্চা নজরুলের সেনাজীবনের একটি বড় অর্জন। নজরুলের সহযোদ্ধাদের ভাষ্যমতে, নজরুল ব্যারাকে হারমোনিয়াম বাজিয়ে দরাজ গলায় গান করতেন। উদাহরণস্বরূপ লুত্ফুল হক প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়ের নজরুলকে নিয়ে লেখা বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। লেখক হক অরুণকুমার বসু থেকে কয়েকটি লাইন কর্জ করে আমাদের এও জানিয়েছেন, পল্টনে নজরুল রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় নিজেকে বিশেষভাবে নিয়োজিত রেখেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের মতো নজরুলও তাঁর জীবদ্দশায় অভিজ্ঞতা অর্জনের সাথে সাথে নিজের ধ্যান-ধারণাকে পরিবর্তন, পরিমার্জন ও শাণিত করেছেন। অপরিপক্ক বয়সে ব্রিটিশদের নিয়মানুবর্তিতা দ্বারা মুগ্ধ হলেও কৈশোরে এসে ঠিকই ইংরেজদের নীল নকশা টের পান নজরুল। তাই তো ব্রিটিশ-বিরোধী চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন ঘটে তাঁর অনেক লেখায়।
সহযোদ্ধাদের চোখে নজরুল কেমন ছিলেন কিংবা নজরুলের সৈনিক-জীবন নিয়ে নানান তর্ক-বিতর্কের কথাও লেখক স্বল্প পরিসরে বস্তুনিষ্ঠতার সাথে তুলে ধরার চেষ্টা করেছের দুটি ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়ের মাধ্যমে। সবশেষে যে অধ্যায়টি পাঠকদের বিশেষ নজর কাড়বে বলে আমার বিশ্বাস তার শিরোনাম, ‘রণসংগীত ও নজরুল’। এ অধ্যায়টি আমাদের জানায়, নজরুল সৈনিক-জীবনের সব ধরনের ছন্দ অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছেন বলেই তাঁর কাব্যছন্দ এতটা প্রবল ও ক্ষুরধার। এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে সৈনিক-জীবনে মার্চিং সং কিংবা টিউন চর্চা করতেন বলেই তাঁর পক্ষে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম ও শ্রেষ্ঠ রণসংগীত রচনা করা সম্ভব হয়েছিল। রণসংগীতের উদ্ভাবন নিয়ে যে কথাগুলো লেখক লিখেছেন তা পাঠক-জ্ঞানকে নির্দ্বিধায় সমৃদ্ধ করতে সমর্থ।
ভূমিকাতেই মুহাম্মদ লুত্ফুল হক জানিয়েছেন, তিনি কোনো গবেষক নন। অথচ পাঠক আপনারা গ্রন্থখানি বিচার-বিশ্লেষণ করলে অবশ্যই টের পাবেন, এটি একটি সমৃদ্ধ গবেষণা গ্রন্থের স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে। প্রায় গোটা তিরিশেক গ্রন্থ ঘেঁটে তিনি এ বইটি রচনা করেছেন। তাঁর এই শ্রমলব্ধ প্রয়াস পাঠক সমাদৃত হবে—এইটুকুন প্রত্যাশা রাখতেই পারি।