হোয়াটসঅ্যাপে হ্যাকিং ইরানকে টার্গেট করে?

ঘটনাগুলো আপাতদৃষ্টিতে আলাদা। হোয়াটসঅ্যাপে হ্যাকিং, সৌদি আরবের তেল ট্যাংকারে অন্তর্ঘাতমূলক হামলা, মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রচেষ্টা এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা। এসব ঘটনা একইসূত্রে গাঁথা বলে মনে করেন বিবিসির ওয়াশিংটন ব্যুরো চীফ পল ডানাহার।

পল ডানাহারের বিশ্লেষণ : সবকিছুর মূলে ইসরাইল, সৌদি আরব আর ইরানের দ্বন্দ্ব। অন্য যে কোন দেশের তুলনায় ইসরাইলি সামরিক বাহিনী একটি জায়গায় আলাদা। ইসরাইলে যত রকমের শিল্প উদ্যোগ, তার আসল মেরুদন্ড সামরিক বাহিনী। বয়স ১৮ বছর হলেই সব নাগরিককে (আরবরা ছাড়া) বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে হয়। ফলে সামরিক বাহিনীর প্রভাব থেকে যায় তাদের সারা জীবনে। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ওল্ড বয় নেটওয়ার্ক’। এর অর্থ স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধুরা যখন পরবর্তী জীবনে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে তখন তারা যেভাবে একে অন্যকে সাহায্য করার চেষ্টা করে যার যার ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে।

ন্যাশনাল সার্ভিসের সময় তরুণদের কার প্রতিভা কিসে সেটি যাচাই করে সামরিক বাহিনী। এরপর তাদের সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হয়। যাদের প্রতিভা কম্পিউটারে তাদের কাজে লাগানো হয় সাইবার যুদ্ধে। এরা যখন সামরিক বাহিনী ছাড়ে তারা কেবল অভিজ্ঞতা আর দক্ষতাই সঙ্গে নিয়ে যায় না। যে সম্পর্ক তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে সেগুলো তাদের বাকি জীবনেও বজায় থাকে। ‘এনএসও’ নামের যে কোম্পানিটি হোয়াটসঅ্যাপে হ্যাকিংয়ের পেছনে আছে তারা এর বড় উদাহরণ। তারা সাইবার যুদ্ধ চালাতে বিভিন্ন সফটওয়্যার তৈরি এবং হ্যাকিংয়ের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে। মূলত অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদ দমনের লক্ষ্যেই তৈরি হয় এই প্রযুক্তি। এরপর এগুলো বিক্রি হয় বিভিন্ন দেশের কাছে। তবে ইসরাইলের স্বার্থে আঘাত হানতে পারে এমন দেশের কাছে বিক্রি করে না। অতীতে ইরান বা উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর কাছে কোনো ইসরাইলি প্রযুক্তি বিক্রি করা যেতো না। কারণ এরা সবাই ইসরাইলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামে সমর্থন দেয়। আরব বসন্তের পর একমাত্র কাতার ছাড়া সব উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন বন্ধ করে দিয়েছে। পরিবর্তে তারা ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের পক্ষ নিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এই পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর। জল্পনা আছে, ইসরাইল এখন উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর কাছে এনএসওকে তাদের সফ্টওয়্যার বিক্রির অনুমতি দিয়েছে। এই জল্পনার ভিত্তি হচ্ছে- হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাকিং সফ্টওয়্যার যাদেরকে টার্গেট করেছে তাদের মধ্যে আছেন এমন কিছু মানবাধিকার আইনজীবী যারা সৌদি আরব এবং কাতারে সরকারবিরোধী ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিকদের হয়ে মামলা লড়ছিলেন।

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইরানকে তার দেশের অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখাতে চান। আর সৌাদির কাছে অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি ইরান এবং মুসলিম ব্রাদারহুড। ব্রাদারহুড এমন রাজনৈতিক ইসলামের কথা বলে যেটি সৌদি রাজপরিবারের বংশানুক্রমিক শাসনের অবসান ঘটাতে পারে। অপরদিকে ট্রাম্প প্রশাসনে এমন লোকজনের প্রভাব যারা সবাই ইরানকে ঘৃণা করেন। তাইতো ইসরাইল, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র এই তিন শক্তি মিলে তৈরি হয়েছে নতুন অক্ষ। ইরানের বিরুদ্ধে তারা একে অপরকে সাহায্য করতে মরিয়া। যেমন ট্রাম্প প্রশাসন সৌদিকে খুশি করতে ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করছে।

এখন যে কোনো গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করা হবে একটা যুক্তি খাড়া করে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টিতে। যারা ইরাক যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব দেখেছিলেন তাদের কাছে এই পরিবেশটা পরিচিত। পার্থক্য কেবল তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন জর্জ ডাব্লিউ বুশ যিনি আদর্শগত বিশ্বাস নিয়ে পরিচালিত হতেন যেন মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়েছে তার কাঁধে। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করা সেই দায়িত্বেরই অংশ। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অতো আদর্শগত ঝোঁক নেই। এমন সম্ভাবনা কম যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধে জড়াবেন বিশেষ করে ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে, যদি না কেউ তাকে ভীষণভাবে উস্কানি দেয়। তাকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে উস্কানি দিতে মারাত্মক কিছু বাজে কাজের দায় ইরানের ওপর চাপাতে হবে। এজন্য দরকার প্রচুর গোয়েন্দা তথ্য। এই তথ্য সরবরাহের সবচেয়ে ভাল উপায় সব মিত্রদেশ মিলের ঐ অঞ্চলে যতো বেশি লোকের ওপর গোয়েন্দাগিরি চালানো। এই কাজে সফল হতে সবচেয়ে ভাল টার্গেট স্মার্টফোন। ট্রোজান হর্সের মতো এর মধ্যে ঢুকতে পারলেই জানা যাবে সবকিছু।