হাওর ও কর্মসংস্থান

চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর আগে নৌকার দাঁড় টানতে গিয়ে আমার দু’হাতের তালু ও আঙ্গুলে কড় (কড়া) হয়ে গিয়েছিল। মাঝারি ও দূরপাল্লার নানা স্থানে দু’বর্ষা নিয়মিত যাতায়াত করতে হয়েছে। তখন যান্ত্রিক নৌযানের কথা চিন্তাও করা যেতো না। দাঁড় টানা এক জবর পরিশ্রমের কাজ; বাস্তব জ্ঞান না থাকলে অন্যের পক্ষে তা বোঝা দায়। হাতের কড় সিমেন্টের প্রলেপের মতো শক্ত, এ নিয়ে বিব্রতকর সময় কেটেছে অনেকদিন। হাত লুকিয়ে রাখতাম, বিশেষত মামাবাড়ি গেলে। যেন পাছে কেউ দেখে না ফেলে। কৈশোরের লুকোচুরি আর কী! পরবর্তী জীবনে খোঁজাখুঁজি করে আমার হাতের মতো শক্ত কড় পড়তে আর কাউকে দেখিনি। সম্প্রতি আমার নিজ গ্রামে একাধারে অনেক দিন থাকা হচ্ছে। সে সুবাধে হীরা নামে একটি ছেলের দেখা পেয়েছি। লক্ষ করলাম তার হাত লুকিয়ে রাখার প্রবণতা। তাকে রাজি করে দেখলাম, দু’হাতে ঐ আমার মতো কড় পড়েছে। আমারও তার মতো বয়সেই এমনটি হয়েছিল। ওর কড় পড়ার কারণ নানা রকম কঠোর পরিশ্রম করতে হয় তাকে। জানতে গিয়ে বুঝেছি সে গড়ে কমপক্ষে দু’জনের কাজ করে। সরকারি হিসেবে তার শিশুত্ব মাত্র ঘুচেছে বা ঘুচবে। দারিদ্র্যের কারণে প্রাথমিক শিক্ষার পর আর এগুতে পারেনি। পেটের দাবি সর্বাগ্রে, নিতান্ত অল্প বয়সেই কৃষিশ্রমিক (শিশুশ্রমিক) হিসেবে কাজ শুরু করতে হয়েছে। বোর মৌসুমে কৃষিশ্রমিক হিসেবে এবং বর্ষায় হাওরে মত্স্য আহরণে দিনগুলো কেটে যাচ্ছে। পরিশ্রম করে অনেক, সে তুলনায় আয় হয় না। পরিশ্রমের কারণে শরীরটা ঠিকমতো বাড়ছে না। যথাযথ পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করা কষ্টকর। রাতবিরাতে কাজ করতে হয়। ঘুমের বিঘ্ন ঘটে। ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন হয়ে কাজের ঘোরেই দিন-মাস চলে যাচ্ছে। সে তার ভবিষ্যতের কথাও চিন্তা করে কিন্তু সমাধান পায় না। এতটুকুন বোঝে, হাওর এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকলে সেখানে সে উদয়াস্ত খাটতে পারতো। শারীরিক শ্রম দেওয়া কোনো ব্যাপারই না। হাওরাঞ্চল নানাভাবে অবহেলিত। সিংহভাগ হাওরবাসী মাত্রাতিরিক্ত শান্তিকামী। প্রবল বঞ্চনা, অবহেলার পরও তাদের প্রতিবাদী ভাষা অস্ফুট। সরকার ও তার নীতিনির্ধারকেরা সব আমলেই হাওর সমস্যাকে তেমন গুরুত্ব না দিয়েই কাজ করে যাচ্ছে। এখানে হীরা কাচ কাটতে পারে কিন্তু সে ক্ষেত্র নেই। আলোচ্য হীরা তবু নিজ যোগ্যতায় কাজের আপাত ক্ষেত্র খুঁজে পেয়েছে; অনেকে মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে দেশের অন্যত্র চলে যায়। কাজের সন্ধানে দেশের নানা স্থানে হন্যে হয়ে ঘোরে হাওর পারের মানুষ। অথচ নানামুখি কর্মসংস্থানের নিশ্চিত ক্ষেত্র এই হাওরাঞ্চল। ধান হয় হাওরাঞ্চলে, চাল কলগুলোর অবস্থান দূরবর্তী স্থানে। হাওরের মাছের আছে দেশ জুড়ে চাহিদা। অথচ এখানে মত্স্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কোনো শিল্প নেই। মাছ সংরক্ষণের জন্য নেই ন্যূনতম ব্যবস্থা। মাছ আহরণকারীরা খুব কমই পেয়ে থাকে, কয়েক স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী মাছের লাভের শেষ নির্যাসটুকু চেটেপুটে খায়। প্রকৃত জেলেরা বিল-জলাশয়ের ইজারা পায় না। প্রকৃত ভূমিহীন কৃষক খাসজমির বন্দোবস্ত পায় না। হাওরের এ বিরূপ অবস্থার অবসান কাম্য। হাওর সম্পদ দ্বারা হাওর পারেই কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সৃষ্টি করা আজ সময়ের দাবি। হাওর উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহ এ ব্যাপারে এগিয়ে আসবে আশা করি। নেত্রকোনা