উপলক্ষ উদযাপনে রেস্টুরেন্টে ছোট পার্টি করছে তরুণরা

যে কোনো উত্সব, আনন্দের সংবাদ কিংবা উপলক্ষ উদযাপনে তরুণদের প্রথম পছন্দ দল বেঁধে বাইরে খাওয়া। নগরীর মাঝারি কিংবা বড় রেস্টুরেন্টে ছোট আকারের পার্টি আয়োজন করে আনন্দে মেতে উঠা আধুনিক তরুণদের ফ্যাশনেও পরিণত হয়েছে। একদিকে আড্ডা অন্যদিকে পেটপুরে খাওয়া দুটোই হয় এ ছোট পার্টিতে। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল, বন্ধুর বিদেশ গমন-ভ্রমণ, জন্মদিন, খেলাধুলায় কৃতিত্ব, প্রতিযোগিতায় সাফল্য, কোনো দল বা সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ, পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, নতুন চাকরিতে নিয়োগসহ নানা উপলক্ষ উদযাপনে দল বেঁধে নগরীর রেস্টুরেন্টগুলোতে জড়ো হন গ্রুপের বন্ধুরা। নতুন বন্ধুত্ব এমনকি প্রেম প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার আনন্দ উদযাপনেও রেস্টুরেন্টগুলোতে তরুণ-তরুণীরা ভিড় করেন। গত সোমবার রাতে ধানমন্ডির ‘স্টার হোটেল এন্ড কাবাব’ রেস্টুরেন্টে এমনই একটি ছোট পার্টিতে ১৬ জন বন্ধুকে নিয়ে জড়ো হয়েছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা আনোয়ারুল ইসলাম সুজা। আড্ডায় খেতে খেতে মাঝে মাঝেই বিভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে একসাথে হাসিতে ফেটে পড়ছিলেন সবাই। আড্ডার আয়োজকের সাথে কথা বলে জানা যায়, বৃত্তি নিয়ে বিদেশে পড়তে যাচ্ছেন তিনি। দেশ ত্যাগ করার আগে তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে প্রাণভরে আড্ডা দিতেই এ আয়োজন। তার মতে, আড্ডার সাথে সাথে সবাই মিলে একসাথে মজা করে খাওয়া-দাওয়াও সেরে নেয়া যাচ্ছে। রাজধানীর কয়েকটি রেস্টুরেন্টের মালিক, ব্যবস্থাপক এবং রেস্টুরেন্টে ভিড় করা তরুণদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ছোট ছোট পার্টি আয়োজনের মধ্য দিয়ে ভোজনরসনা এবং আড্ডা-বাসনা মেটান নগরীর তরুণরা। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা অনুযায়ী তরুণরা রেস্টুরেন্ট বাছাই করেন। রেস্টুরেন্ট বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ধানমন্ডি, পুরান ঢাকা, বেইলি রোড, হাতিরপুল, গুলশান এবং বনানীতে অবস্থিত রেস্টুরেন্টগুলো তরুণদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। আর খাবার মেন্যু বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দেশি ও ঢাকাইয়া খাবারের পাশাপাশি তরুণরা চাইনিজ, ইন্ডিয়ান, থাই এবং আমেরিকান খাবারকে প্রাধান্য দেন। খাবারের ধরনের ওপর ভিত্তি করে রেস্টুরেন্ট বাছাই করেন তরুণরা। রাজধানীর বনানীতে যেসব রেস্টুরেন্টে তরুণরা ভিড় করেন তার মধ্যে সাজনা, শালিমার, ওহ কলকাতার মতো রেস্টুরেন্টগুলো অন্যতম। গুলশানে নন্দো’স, ফকরুদ্দিন, ভিলেজ রেস্টুরেন্ট, সিপি ফ্রাইড চিকেন, আমেরিকান বার্গার, চিকেন কিং, ফুড নেটওয়ার্ক, এ এন্ড ডব্লিউ, ক্যাটালিনা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, কস্তুরি, পূর্ণিমা রেস্টুরেন্ট, দি এরিস্টোক্রেট, খুশবো, এবাকাস রেস্টুরেন্ট, হেরিটেজ, সামদাদো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ধানমন্ডিতে নন্দো’স, স্টার হোটেল এন্ড কাবাব, উল্টা ভূত, সান্তুর, সাত মসজিদ রোডে কড়াই গোসত, বার বি কিউ টুনাইট, লালমাটিয়ায় স্বাদ তেহারি ঘর, বেইলি রোডে ঢাকা ফ্রাইড চিকেন, হাতিরপুলে শর্মা হাউজ, মালঞ্চ, পল্টন এলাকায় মিড নাইট চাইনিজ, কস্তুরি, কড়াই গোসত রেস্টুরেন্টে জমে উঠে তরুণদের এসব ছোট পার্টিগুলো। কেএফসি অথবা পিত্জা হাটের মতো ব্রান্ডের রেস্টুরেন্টগুলোতে বসতেই তরুণরা বেশি পছন্দ করেন। পুরান ঢাকায় হোটেল আল রাজ্জাক, হাজী বিরিয়ানী, মামুন বিরিয়ানী, নীরব হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট, মামা বিরিয়ানী, আফতাব হোটেল এন্ড মিনি চাইনিজ দিন-রাত সারাক্ষণই জমজমাট থাকে তরুণদের আনাগোনায়। কারওয়ানবাজার এলাকায় স্টার হোটেল, কুকারস সেভেনেও ছোটো-ছোটো পার্টি জমে উঠে নিয়মিত। ধানমন্ডি স্টার হোটেল এন্ড কাবাবের ব্যবস্থাপক মিজানুর জানান, তাদের হোটেলে দিনের বিভিন্ন সময় তরুণদের আগমন ঘটলেও যে কোন উপলক্ষ উদযাপনের পার্টিগুলো সাধারণত শুরু হয় সন্ধ্যার পরই। জন্মদিন, নতুন বিয়ের মতো আনন্দ উদযাপনেই বেশি ভিড় করেন তরুণরা। স্কুল ও কলেজগামী কিশোররাও এখন ছোট পার্টি দেন। তিনি জানান, এরকম ভিড় আগেও ছিল, তবে গত সাত-আট বছর ধরে হোটেল-রেস্টুরেন্টে তরুণদের এ ধরনের পার্টি-ভোজন অনেকগুণ বেড়েছে। রাজধানীর চানখারপুলের আফতাব হোটেল এন্ড মিনি চাইনিজের মালিক আফতাব আহমেদ জানান, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ও চাকরিজীবী তরুণরাই তার হোটেলে বেশি ভিড় করেন। বিরিয়ানী ও খিচুড়ির বিভিন্ন আইটেম তরুণদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র শিশির। ৩১তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে চাকরিতে যোগদান করেছেন ঢাকার বাইরে। ছুটি পেলেই ছুটে আসেন ঢাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছের কয়েকজন বন্ধু ও ছোটো ভাইকে নিয়ে প্রায় রাতেই পুরান ঢাকার হোটেলগুলোতে খেতে যান শিশির। সমপ্রতি বংশাল রোডের একটি হোটেলে খেতে খেতেই তিনি এ প্রতিবেদককে বললেন, পুরান ঢাকার খাবার খুবই ভালো লাগে। কয়েকজন একসাথে খেতে বসলে গল্প করতে করতে কখন সময় চলে যায় বুঝতেই পারি না। এখানে খেতে এসে ভার্সিটি জীবনের কথা মনে পড়ে যায়। নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জান্নাতুল ফেরদাউস জানান, বন্ধুরা মিলে আগে থেকেই ঠিক করে নেন কী খাবেন। সে অনুযায়ীই রেস্টুরেন্ট বেছে নেন তারা। আবার ছোট পরিসরে কোনো উপলক্ষ উদযাপন করতে আইসক্রিম খেতেই অনেকে পছন্দ করেন। এক্ষেত্রে বাসকিন-রবিন, ইগলোর মতো ব্রান্ডের আইসক্রিম খেতেই বেশি ভালো লাগে তাদের।