আত্মরক্ষা

চমত্কার ফর্মুলা কারাতে

সবুজে মোড়ানো ঘাসের নিচে লুকিয়ে থাকা কাদায় সাবধানে পা ফেলে কিছুটা সামনে যেতেই সমস্বরে আওয়াজ উঠল: ‘স্কিপ’ বলে। এর পরপরই ‘সোমেনি রে’ আরেকবার ‘সেনসি রে’ বলে সামনের দিকে মাথাটা কিছুটা নত করলেন তারা। পরক্ষণেই ‘ওতাগিনি রে’ উচ্চারণে পরস্পরের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ তাদের। ব্যাখ্যা শুনে জানা গেল ‘স্কিপ’ বলে তারা নিজেদের সাবধান করলেন। ‘সোমেনি রে’ অর্থ আমরা যারা তাদের ভাষায় ‘অতিথি’ হয়ে ওখানে উপস্থিত হয়েছি তাদের প্রতি এবং ‘সেনসি রে’ বলে তারা তাদের গুরুর প্রতি অভিবাদন জানালেন। শেষ শব্দটি ছিল পরস্পরের প্রতি শুভেচ্ছা বিনিময়মূলক। এসবই জাপানি শব্দ। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর শারীরিক কসরত, ব্যায়ামের পর ঘুষি-লাথি মারার মতো শক্ত সব কৌশল রপ্ত করতে লেগে গেলেন কোমল মনের একদল মেয়ে। এসব হলো কারাতের মৌলিক বিষয়। যশোর সরকারি মহিলা কলেজ মাঠে ১৮ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী কারাতে প্রশিক্ষণের এ কার্যক্রম। প্রশিক্ষণে কলেজটির উচ্চ মাধ্যমিক থেকে স্নাতক পর্যায়ের ৬০ জন আবাসিক ছাত্রী অংশ নিচ্ছেন। ‘সেলফ ডিফেন্স ট্রেনিং’ নামে কারাতে প্রশিক্ষণটির আয়োজক রিলিফ ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। মোহন কারাতে একাডেমীর প্রশিক্ষক মাহবুবুর রহমান মোহন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। যশোরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারাতে শেখানোর এটাই প্রথম উদ্যোগ। প্রশিক্ষণের ফাঁকে ফাঁকে কথা হলো কয়েকজনের সাথে। গোপালগঞ্জের মেয়ে ইতিহাস ফাইনাল বর্ষের ছাত্রী নাসরিন আক্তার শেফা জানালেন, বছর কয়েক আগে একদিন তাদের কলেজের আপুরা জজকোর্টের সামনে দিয়ে আসার সময় ‘ভীষণ বাজে’ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। একপর্যায়ে তারা দৌড়ে ওখান থেকে পালিয়ে আসেন। এরকম ভীতিকর পরিস্থিতির কথা জেনে তাদের মনেও একধরনের আতঙ্ক ভর করেছিল। কিছুদিন আগে বিভাগের প্রধান ড. আহসান হাবীব তাদের একটি সেমিনারে কারাতে প্রশিক্ষণের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেন। এ সময় তাদের সেই পুরোনো ভীতিকর পরিস্থিতির কথা মনে পড়ায় আত্মরক্ষার কৌশল রপ্ত করার জন্য কারাতে শিখতে এগিয়ে আসেন। কারাতে শিখে ‘মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব’— এমন প্রত্যয়ী উচ্চারণ শেফার। যশোরের মনিরামপুরের মেয়ে বাংলায় অনার্স পড়েন। বললেন, তিনি নিজে কখনও কোনো সমস্যায় পড়েননি। কিন্তু সমাজে মেয়েরা যেভাবে হেনস্থা হচ্ছে তাতে সমস্যায় পড়তেই বা কতক্ষণ? তাই সুযোগ পেয়েই নিজেকে রক্ষার জন্য কারাতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ইসলামী শিক্ষা বিষয়ে অনার্সের ছাত্রী রুপালি খাতুন রুপা বলেন, স্বাভাবিকভাবেই কোনো মেয়ের পক্ষে বডিগার্ড নিয়ে চলাফেরা সম্ভব নয়। কিন্তু চারপাশে যা ঘটছে তাতে আত্মরক্ষার কৌশল ছাড়া উপায়ই বা কী? কারাতে শিখতে এসে বুঝতে পেরেছি প্রত্যেক মেয়েরই এটা শেখা প্রয়োজন। আর যাই হোক বখাটেদের হাতে আক্রান্ত হলে বেঁচে ফিরতে পারব বলে আত্মবিশ্বাস জন্মেছে। অন্যদের রক্ষা করতে পারব বলেও আমার বিশ্বাস। শিক্ষার্থীদের আত্মরক্ষামূলক অভিনব প্রশিক্ষণ আয়োজনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানালেন রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের প্রোগ্রাম অফিসার শেখ নাজমুল ইসলাম। বললেন, আমাদের সমাজে ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের সবকিছু মানিয়ে নেয়ার প্রবণতা শেখানো হয়। এর কারণে মেয়েরা সারাটা জীবন একধরনের আস্থাহীনতায় ভোগে। কারাতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একটা মেয়ে আস্থা পাবে নিজেকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি মানসিক শক্তি তৈরির। তার মানসিক দৃঢ়তা তার ক্যারিয়ার গঠনে সহায়ক হবে। কারাতের ব্ল্যাক বেল্টধারী প্রশিক্ষক মাহবুবুর রহমান মোহন বলেন, মেয়েদের নিজেদের আত্মরক্ষা প্রয়োজন। এখানকার মেয়েরা আত্মরক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশের জুডো-কারাতে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে যশোরের সুনাম বয়ে আনবে বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস। যশোরের সকল স্কুল-কলেজে এমন প্রশিক্ষণ আয়োজনের ইচ্ছে তার। কারাতে প্রশিক্ষণের শেষ মুহূর্তে আকাশজুড়ে সোনালি আভার উদ্ভাস দেখা গেল। তার দ্যুতিতে চকচক করে উঠল ৬০ জোড়া প্রত্যয়ী চোখ।