স্ম র ণ ....................................

যোদ্ধা নূরজাহান মুরশিদ

সংগ্রাম করেছেন আজীবন। তার সংগ্রাম ছিল গণতন্ত্রের জন্য, অসামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য, নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল এমনকী দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও থামেনি তার সংগ্রাম। আমরা এতোক্ষণ যার কথা বলছিলাম তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নূরজাহান মুরশিদ। অকুতোভয় সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে সঙ্গ দিয়েছেন স্বামী অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদকে, সঙ্গ দিয়েছেন ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধসহ সকল আন্দোলনে। নূরজাহান বেগ মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা থানার অন্তর্গত তারানগর গ্রামে এক আলোকিত সংস্কৃতি মনস্ক পরিবারে ১৯২৪ সালের ২৪ মে জন্মগ্রহণ করেন। সাত বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। তার বাবা আইউব বেগ ছিলেন বিদ্যোত্সাহী। চাকরি শুরু করেন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে। রাজনীতি সচেতন নূরজাহান মুরশিদ ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। গণপ্রতিনিধি হিসেবে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন। তার উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী মহিলা শাখা। নূরজাহান মুরশিদ ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন ও ১৯৬৯ সালের গণজাগরণ এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারসহ রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে গণবিক্ষোভ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার সাহস তাকে আরও বেশি নন্দিত করে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের কাজে সক্রিয় হওয়ায়। ১৯৭১-এ মুজিবনগর সরকারের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য ভ্রাম্যমাণ রাষ্ট্রদূতের পদমর্যাদা প্রদান করে। তিনি বাংলাদেশের মহিলা পরিষদের সদস্য হিসেবে নারী-পুরুষের বৈষম্য কমিয়ে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা এবং নারীকে মানুষের অধিকার প্রদানকে সমাজ উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেন, পত্রিকা সম্পাদনা ও সমাজ বিশ্লেষক লেখক হিসেবে তিনি মুক্তচিন্তার মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। লেখার ক্ষেত্রে তিনি ইংরেজি-বাংলা উভয় ভাষায়ই দক্ষ ছিলেন। ‘আমার কিছু কথা’ নামক গ্রন্থ এবং তার সম্পাদনায় দেশের প্রথম জেন্ডারবিষয়ক পত্রিকা ‘এদেশ ও একাল’ তার সেই অনন্য প্রতিভার সন্ধান দেয়। এই পত্রিকায় সেই সময়ে নারীর প্রতি বৈষম্য, নারী নির্যাতন এবং নারীর ক্ষমতায়নের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সেই সমাজে নারীর জন্য অত্যন্ত নিন্দনীয় মঞ্চনাটকে অভিনয় করে তিনি সবাইকে অবাক করে দিয়েছিলেন। নূরজাহান মুরশিদ ‘বিজয়া’ নাটকের বিজয়া চরিত্রে অভিনয় করে তখন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বাম আদর্শ এবং বাম সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা থেকেই বোঝা যায় তার সামাজিক দায়বদ্ধতা সমাজকল্যাণ ও সমাজ অগ্রগতির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ছিল। ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।