বরিশালে প্রতারণার ফাঁদে হাজারো নর-নারী

নগরীর সাগরদী পুল সংলগ্ন সাগরদী কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় তলায় ‘ম্যাক্সিম আদর্শ বহুমুখী সমবায় সমিতি’ নামে নতুন একটি হায়! হায়! কোম্পানি গ্রাহকদের কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। সমিতির পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান ও ম্যানেজার হাবিবুর রহমানকে গত কয়েকদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতারিত গ্রাহকরা জানান, সমিতির কার্যালয়টি গত কয়েকদিন তালাবদ্ধ থাকায় তাদের মনে সন্দেহ জাগে। পরে খোঁজ নিয়ে পরিচালক ও ম্যানেজারসহ কাউকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রতারিতরা জানান, দুই বছর আগে ওই এলাকায় ক্ষুদ্র সঞ্চয়ী কার্যক্রম শুরু করে ম্যাক্সিম আদর্শ বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটি। ওই সময় থেকে বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে ১০ টাকা থেকে শুরু করে এক’শ টাকা পর্যন্ত প্রাত্যহিক, সাপ্তাহিক সঞ্চয়ের অর্থ সংগ্রহ করে। মোটা অংকের মুনাফার প্রলোভন দেখানোর কারণে ক্ষুদ্র আয়ের মানুষ কেউ দৈনিক ১০ টাকা আবার কেউ সপ্তাহে একশ টাকা বা বেশি জমা দিতে থাকে। বেশি লাভের আশায় সঞ্চয়ী টাকা কেউ উত্তোলন করেনি। এক বছরের মধ্যে সঞ্চয়ী টাকা বা লাভের টাকা উত্তোলন করা যাবে না বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে শর্ত দেয়া ছিল। ফলে দুই বছরের মাথায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লা-পাত্তা হতে কোন সমস্যা হয়নি প্রতারকদের। প্রতারিতদের মধ্যে সাগরদী এলাকার রূপবান বেগমের ৫০ হাজার টাকা, অনু বেগমের ৩০ হাজার টাকা, কলি বেগমের ২০ হাজার ৯৩০ টাকা, বিউটি বেগমের ১৭ হাজার ৭শ’ টাকা, শম্পা রেজার ৭৭ হাজার ৬শ’ টাকা, যুগল চন্দ্র শীলের ২১ হাজার ৩৩১ টাকা, গুমত বাবুর ২৭ হাজার টাকাসহ মায়া রাণী দাস, অনন্দিতা দাস, সতী রাণী কবিরাজ, সীমা রাণী, দীপিকা রাণী শীল, অনু রাণী, মাকছুদ আলম, দীপক চন্দ্র দাস, মোঃ রাজা খান, আবুল সিকদার, এনামুল কবির, মোস্তফা কামাল আসমা বেগম, মিতুল মামুন, কামরুজ্জামান হাওলাদার, কানিজ ফাতেমা, সুমন শীল, সালাম মুন্সী, আলম সিকদার, জহির খান, আবুল বাসার, সোবহান সিকদার, তাছলিমা বেগম, আয়শা বেগম, রেখছোনা বেগম, হাজেরা বেগম, সাজ্জাত বেপারী ও রেহানা বেগমের কাছ থেকে বিভিন্ন অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার কথা জানিয়েছেন তারা। সমিতির পুরনো সদস্যরা বেশি প্রতারিত হয়েছেন। তারা জানান, ৫ সহস্রাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে কোটি টাকা সংগ্রহ করে পালিয়েছে ম্যাক্সিম। নিম্নমধ্যবিত্তরা প্রতারণার ফাঁদে পরে লাখ লাখ টাকা খুইয়েছেন। গ্রাহকরা জানান, এক লাখ টাকা জমা রেখে প্রতিমাসে সমিতি থেকে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ দেয়া হয়। দুই হাজার টাকার আশায় যারা লাখ লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন তারা ৬/৭ মাস লাভের টাকা পেলেও জমা টাকা উধাও হয়ে গেছে। স্থানীয় মামুন মাহমুদ নামের এক যুবক জানান, তিনি ৩ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন। তাকে প্রতিমাসে ৬ হাজার টাকা লাভ দেয়ার চুক্তিপত্র করে ম্যাক্সিম আদর্শ বহুমুখী সমবায় সমিতির স্বত্বাধিকারী মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি ঐ সমিতির টাকা বিনিয়োগ ও খাত সম্পর্কে জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান তাকে জানান, পার্শ্ববর্তী সানমুন চাইনিজ রেস্টুরেন্ট সমিতির টাকায় চলছে। যারা সমিতির গ্রাহক তারাই রেস্টুরেন্টের মালিক। আমরা শুধু পরিচালনা করে গ্রাহকদের লাভ দিচ্ছি। ঐ রেস্টুরেন্ট ছাড়াও নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখানো হয় গ্রাহকদের। তারাই হবে এসব স্থাপনার মূল মালিক এমন আশায় ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জমা দিয়েছেন নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ। গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে সমিতির কার্যালয় বন্ধ থাকায় গ্রাহকরা গতকাল রবিবার সেখানে ভিড় করেন। কিন্তু মোস্তাফিজুর রহমানকে কোথাও পাওয়া যায়নি। তার ফোন বন্ধ। ম্যানেজার হাবিবুর রহমান গ্রাহকদের চাপে কয়েকদিন আগে মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করলেও বর্তমানে পলাতক। প্রথম দফায় স্বল্পসংখ্যক গ্রাহক প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে হাবিবুর রহমানকে চাপ দেন। তখন তিনি মামলা করেন। এখন সকল গ্রাহক প্রতিদিন তার কাছে গিয়ে টাকা দাবি করলে তিনিও লা-পাত্তা হয়ে যান। সাগরদী কমপ্লেক্সের মালিক ইয়াদ আলী ওরফে ভালুক মামা জানান, গত দুই বছর পূর্বে মোস্তাফিজুর রহমানকে দ্বিতীয় তলার ফ্লাট ভাড়া দেয়। ম্যাক্সিম আদর্শ বহুমুখী সমবায় সমিতির সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন। পাশেই তিনি একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট চালু করেন। বাড়ি ভাড়া নেয়ার সময় স্থানীয় হাবিবুর রহমানের সহযোগিতায় ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে বলে বাড়ির মালিক জানান। তিনি বলেন, কার্যালয় বন্ধ পেয়ে গত শুক্রবার গ্রাহকরা তালা ভেঙ্গে সমিতি ও চাইনিজ রেস্টুরেন্টের আসবাবপত্র লুটপাট করে নিয়ে গেছে। শনিবার ও গতকাল রবিবার যেসব গ্রাহক সেখানে গিয়েছিলেন তারা শূন্য ঘরটি তালাবদ্ধ পেয়েছে। বাড়ির মালিক জানান, পুলিশ তালা ঝুলিয়েছে। কোতোয়ালী মডেল থানার ওসি জানান, রেস্টুরেন্ট ও সমিতির অফিস লুটের খবর পেয়ে তিনি শুক্রবার পুলিশ পাঠিয়ে তালাবদ্ধ করেছেন। পরে জানতে পারেন যে, লুটকারীরা প্রতারিত হয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমানের মাধ্যমে।