সংবিধান মেনেই আগামী মার্চে নির্বাচনের চিন্তা
সালেহউদ্দিন ও সাইদুর রহমান
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:৩০
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আরো কয়েকমাস পেছাতে সরকার সংবিধানের একটি ফাঁক খুঁজছে। তবে এক্ষেত্রে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন করতে হবে সরকারকে। যদিও বর্তমান সংবিধানে সংসদ বহাল রেখেই মেয়াদ শেষের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের উপর নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক নির্দেশনা রয়েছে। এক্ষেত্রে কমিশনকে আগামী ২৬ অক্টোবরের পর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে যে কোনদিন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হবে। তবে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি ২৫ অক্টোবরের পর রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙ্গে দিতে বলবেন। কিন্তু এখন সেই পরিকল্পনা ও ঘোষণা থেকে সরে আসতে চাচ্ছে সরকার। সরকারের নীতি নির্ধারকরা এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার। সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার পরিস্থিতি উদ্ভব হলে সেক্ষেত্রে কমিশনকে ‘ভেঙ্গে’ যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। এই ধরনের পরিস্থিতি হলে আগামী বছরের ২৪ জানুয়ারির পরিবর্তে মার্চের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন করতে হবে কমিশনকে। এভাবে সরকারের মেয়াদ আরো কয়েকমাস বাড়ানোর সক্রিয় চিন্তা কাজ করছে। এ নিয়ে সরকারের নীতি নির্ধারকরা কয়েকদফা বৈঠক করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
এদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অভিযোগ করছে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সরকার চক্রান্ত শুরু করেছে। তারা বলেছেন, এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংবিধান নিয়ে ছেলেখেলা শুরু করেছেন। এর আগে দলীয় হীনস্বার্থে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী তারা এনেছিল। এখন একই স্বার্থে তাদের আনা সংশোধনীকে অকার্যকর করে রাখার মধ্যে দিয়ে তারা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চায়। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, এভাবে সরকার তাদের মেয়াদ বাড়ালে দেশে অশান্তি ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। সরকারের গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা একেবারে কমে আসবে। মওদুদ আহমেদ আরো বলেন, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ ও অপব্যবহার করে সংবিধানকে অসম্মান করেছে সরকার। এটা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করার শামিল। এভাবে সরকারের শেষ রক্ষা হবে না। যারা সংবিধানকে সম্মান করে না তাদের প্রতি জনগণের অসম্মান, অনাস্থা, অবজ্ঞা বাড়বে। ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার সরকারের এই অপকৌশলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে পুরো জাতি।
বাতিলকৃত পঞ্চম সংশোধনীতে (জিয়াউর রহমান আমলে) সংসদ ভেঙ্গে যাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশনা ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদের পরে ‘ক’ উপ-অনুচ্ছেদ যুক্ত করে। এতে বলা আছে, ‘সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে ঃ-মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে। তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।’
সংবিধানে যুক্ত হওয়া এই বিধানের কারণে নির্বাচন কমিশন ২৪ জানুয়ারি সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের পূর্বে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সাধারণত ৪৫ দিনের সময় দিয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এরপর নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশের জন্য কমপক্ষে ১ সপ্তাহ সময় হাতে রাখা হয়ে থাকে। সেই হিসাব অনুযায়ী অবশ্য ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হতো নির্বাচন কমিশনের। অতীতের সব সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য বৃহস্পতিবারকে ভোটগ্রহণের দিন বেছে নিতে দেখা গেছে। যদিও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের পছন্দের দিন হচ্ছে শনিবার। এই কমিশনের অধীনে সব নির্বাচন শনিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার হলে ১৬ আর শনিবার হলে ১৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি ছিল নির্বাচন কমিশনের। ১৬ জানুয়ারি নির্বাচন করতে হলে ২ ডিসেম্বর এবং ১৯ জানুয়ারি হলে ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করতে হতো। কিন্তু সরকার এখন জানুয়ারিতে নির্বাচন করার চিন্তা-ভাবনা থেকে সরে আসতে চাচ্ছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জানুয়ারির পরিবর্তে মার্চে নির্বাচন করতে আগ্রহ সরকারের। বর্তমান সংবিধানে আর কোন সংশোধনী না এনে কৌশলে ক্ষমতার মেয়াদ বাড়ানোর ফাঁক খোঁজা হচ্ছে। এ নিয়ে সরকারি নীতি নির্ধারকরা কয়েকদফা বৈঠক করেছেন। সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমদের ইন্দিরা রোডের বাসায় এমন একটি পরিকল্পনার বিষয়ে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা একমত হয়েছেন। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অক্টোবরে সংসদ না ভেঙ্গে বর্তমান বিধান অনুযায়ী ডিসেম্বরে যখন নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নিবে তার দিনকয়েক আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের উপর ৯০ দিনের মধ্যের সময়ে নির্বাচন আয়োজনের যে নির্দেশনা ছিল তা অকার্যকর হয়ে পড়বে। ফলে নির্বাচন কমিশনকে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের ‘খ’ উপ-অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে‘ মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’ এ ধরনের পরিস্থিতি হলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী মার্চের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে। এভাবে সরকার তাদের ক্ষমতার মেয়াদ আরো কয়েকমাস বাড়িয়ে দেয়ার ফাঁক খুঁজছে।
প্রসঙ্গত, সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচন আয়োজনের জন্য পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদের ‘ক’ উপ-অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন আয়োজনের এই ব্যবস্থা দেশে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়। মহাজোটের শরীকদের মধ্যে এ নিয়ে আপত্তি উঠে। নির্বাচনী আইন এবং আচরণ বিধিমালাতেও এ নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। সংসদ বহাল রেখে প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-এমপিদের নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ রেখে একটি আচরণ বিধির খসড়াও প্রস্তুত করে রেখেছিল নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে প্রস্তাবিত বিধিমালার কাজ স্থগিত রাখে কমিশন। সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৫ অক্টোবরের পর সংসদ ভেঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এখন আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা মনে করেন, সংসদ ভেঙ্গে দিয়েই যদি নির্বাচন আয়োজন করতে হয় তাহলে তা সংসদের মেয়াদ শেষের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে করাই হবে দলের জন্য শ্রেয়। এসময়ে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যতদূর সম্ভব শেষ করা যাবে। সরকারের বিরুদ্ধে যে নেতিবাচক প্রচারণা আছে তার বিরুদ্ধে সরকারের সাফল্যগাঁথা প্রচারের সুযোগ পাবে। আইনমন্ত্রীর বাসায় বৈঠক প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, ‘ক্ষমতায় টিকে থাকতে সরকার চক্রান্ত শুরু করেছে। তারা সংবিধানে অনেক অস্পষ্টতা রেখেছে। সে অস্পষ্টতার মধ্য দিয়ে তারা ক্ষমতাকে আরও দীর্ঘ করতে চায়। কিন্তু জনগণ এই অপচেষ্টা প্রতিহত করবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
তবে সংবিধান সংশোধনী আনা হচ্ছে না জানিয়ে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, সংবিধানেই বলা আছে যে, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাদের কাজ হলো নির্বাচন পরিচালনা করা। আর নির্বাচনকালীন সরকারের কাজ হচ্ছে দৈনন্দিন কাজ করা, তারা কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সংবিধানে কোনো সংশোধনীর প্রয়োজন নেই। আর এরকম কোনো পদক্ষেপও গ্রহণ করা হচ্ছে না।