বারবাডোজ থেকে কলাবাগান
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:২৮
সে এক এলাহী ব্যাপার!
মিরপুরের এতোটুকু ইনডোর স্টেডিয়ামে তখন তিনটে দল অনুশীলন করে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর তিনটে দল ঢুকে পড়েছে অনুশীলন করবে বলে। কেউ ব্যাগ গোছাচ্ছেন, কেউ ব্যাগ খুলছেন; কেউ অনেকদিন পরে দেখা সতীর্থকে বুকে জড়িয়ে ধরছেন, আবার কেউ চিত্কার করে বন্ধুকে ডাকছেন। সবমিলিয়ে শ’ দেড়েক ক্রিকেটারের এক মহাযজ্ঞ চলছিল কাল দুপুরে।
এরই মধ্যে ইনডোরের নেটগুলোর সামনে এক ক্লাব কর্মকর্তার সঙ্গে খুব গম্ভীর মুখে কথাবার্তা বলছিলেন তিনি। হাত নাড়া, বারবার ফোন করা আর কথা বলার ভঙ্গি দেখে অনুমান করা যায়—কোনো পরিকল্পনায় ব্যস্ত তিনি। মাঝে মাঝে দু’ ফোনের এ পাশে তার দু’-একটা ইংরেজি শব্দ ভেসে আসতে শুনে বোঝা যায়, দলের জন্য বিদেশি কারো সঙ্গে কথা বলছেন। সবমিলিয়ে মীমাংসা টানা যেতে পারে একটাই—কলাবাগান ক্লাবের আসছে প্রিমিয়ার লিগ মৌসুম নিয়েই এখন মগ্ন সাকিব আল হাসান। কাছে আসার পর প্রশ্নটা করতেই একগাল হাসলেন, ‘হ্যাঁ, এখন তো দল নিয়েই ভাবতে হচ্ছে। আর ক’ দিন পরই লিগ শুরু, এখন দল নিয়ে না ভাবলে চলবে কেন?’ শুরুতে নতুন দলবদল পদ্ধতির কারণে হয়তো একটু নাখোশ ছিলেন। কিন্তু গতকাল এটুকু নিশ্চিত হওয়া গেল, সব কিছু ঝেড়ে ফেলে এখন সাকিব কলাবাগানের হয়েই লড়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে ফেলেছেন। শুধু নিজেকে প্রস্তুত করে ফেলেছেন তাই নয়। দল নিয়ে খুব আশাবাদীও সাকিব, ‘আমাদের স্থানীয় খেলোয়াড় খুবই ভালো হয়েছে। এখন আমরা ভালো কিছু বিদেশি খেলোয়াড়ের জন্য চেষ্টা করছি। সেটা হলে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছাড়া আর কোনো লক্ষ্যের কথা আমাদের ভাবার কোনো কারণই নেই।’ সাকিব এইসব কথা যখন বলছিলেন, তখন বাম হাতের বুড়ো আঙুলটা তার উঁচু হয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় সাক্ষ্য দিচ্ছিল, ইনজুরি এখনও পিছু ছাড়েনি তার। এই আঙুলের ইনজুরির কারণেই উপস্থিত থেকেই ক্লাব সতীর্থদের সঙ্গে ব্যাট-বলে অংশ নিতে পারলেন না। হয়তো শুরুতে বেশ কিছু ম্যাচেও মাঠে থাকতে পারবেন না। সাকিবই জানালেন, আজ ব্যান্ডেজ খোলা হবে আঙুলের, তারপর বোঝা যাবে, কবে থেকে খেলতে পারবেন। তারপরও বাইরে থেকে যতোটা লড়াই করা যায় দলের জন্য!
কলাবাগানের হয়ে ব্যাড-প্যাড পরে এখনই লড়াইয়ে নামতে না দেয়া আঙুলের এই ইনজুরিটা সাকিবের পিছু নিয়েছে সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে। বারবাডোজ ট্রাইডেন্টেসের হয়ে অনুশীলন করতে গিয়ে পেয়েছেন এই চোট। এই চোটের কারণে ক্যারিবিয় দ্বীপপুঞ্জের ওপর একটু রাগ থাকতে পারে। কিন্তু যে অভিজ্ঞতা তিনি নিয়ে ফিরেছেন, তাতে চোটের সামান্য এই ‘রাগ’ উবে জল হয়ে যায়। ক্যারিবিয় লিগের প্রশ্ন উঠতেই তার শুধু মুগ্ধতা আর মুগ্ধতা। ওয়েস্ট ইন্ডিজে আগে কয়েকবার সফর করেছেন সাকিব। ফলে সেখানকার প্রকৃতি; সমুদ্র, নারকেলগাছ, সৈকত নতুন করে তাকে ভক্ত বানিয়ে ফেলার কথা নয়। এবার হয়তো সেগুলো একটু বাড়তি সুন্দর হয়ে উঠেছিল সঙ্গে নবপরীনিতা স্ত্রী থাকায়। তবে মুগ্ধতা এসব কোনো কারণেই নয়; মুগ্ধতা ক্যারিবিয় লিগের আয়োজন আর স্থানীয় দর্শকদের আচরণ নিয়ে। বিমানবন্দরে নেমেই যেটা বলেছিলেন, আবার বললেন কাল, ‘ক্যারিবিয় দর্শকদের ব্যাপারটাই আলাদা। ওদের কাছে মাঠে হারা-জেতাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ না। ওরা মাঠে যায় প্রাণভরে ক্রিকেট উপভোগ করতে। নিজের দলের, পরের দলের; যে ভালো খেলুক, যেভাবে ওরা সমর্থন দেয়, উত্সব করে, সেটা আসলেই অসাধারণ।’ এই দর্শকের সঙ্গে ক্যারিবিয় প্রিমিয়ার লিগের আয়োজনটাও সাকিবকে মুগ্ধ করেছে। বারবার নিজের কাছেই বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের সঙ্গে তুলনাটা চলে আসছে তার।
কালও প্রসঙ্গটা উঠতেই হাসতে হাসতে বললেন, ‘আসলে এখন খেলোয়াড়দের কোনো অভিযোগ নেই, এটাকেই আমার কাছে অনেক ভালো আয়োজন মনে হয়। বিপিএলের উদাহরণ দিতে হয়। দেখে এখানে কতো অনিয়মের অভিযোগ। এসব অভিযোগ তো কেউ সিপিএল নিয়ে করতে পারছে না। এটাই তো অনেক।’ সাকিবের কাছে যেটা ‘অনেক’ সেটা তো আসলে বেশি কিছু নয়। এটুকু অভিযোগমুক্ত একটা টুর্নামেন্ট কী বাংলাদেশে হতে পারেই না!