নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে বাম মোর্চার ১৬ দফা

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ১৬ দফা সুপারিশ করেছে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা। গতকাল সোমবার মোর্চার নেতৃবৃন্দ কমরেড নির্মল সেন মিলনায়তনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সন্মেলনে এই সুপারিশ তুলে ধরেন। নেতৃবৃন্দ অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে কালো টাকা, পেশীশক্তি, সামপ্রদায়িকতা, ধর্মের ব্যবহার এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ম্যানিপুলেশান নির্ভর বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ১৬ দফা ভিত্তিক গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রস্তাবনা পেশ করেছেন । সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য ও প্রস্তাবনা পাঠ করেন বাম মোর্চার সমন্বয়ক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। উপস্থিত ছিলেন মোর্চার কেন্দ্রীয় নেতা শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, এডভোকেট আব্দুস সালাম প্রমুখ। সুপারিশে বলা হয়, নির্বাচন কমিশন হবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণমুক্ত প্রকৃত অর্থেই স্বাধীন, স্বতন্ত্র ও ক্ষমতাবান সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। জাতীয় সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে নির্বাচন কমিশনারেরা সাংবিধানিক কমিশন কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। জাতীয় সংসদ তাদেরকে অপসারণ করতে পারবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত জাতীয় নিরাপত্তা ব্যতীত বেসামরিক প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনীসহ যাবতীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, অর্থ, তথ্য ও স্থানীয় সরকার বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো নির্বাচন কমিশনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাই জেলা রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচন সংক্রান্ত যাবতীয় বিরোধ উচ্চ আদালতের কার্যক্রমসহ ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। এ জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক আদালত গঠন করতে হবে। নির্বাচনে টাকার খেলা বন্ধ করতে এবং ধনী-দরিদ্র সকল প্রার্থীর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন গ্রহণ করবে। প্রার্থী ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় প্রচার উপকরণ সরবরাহ, প্রচারণামূলক সভা ও গণমাধ্যমে সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যয়সীমা হবে সর্বোচ্চ পাঁচ লক্ষ টাকা। আর প্রার্থীদের জামানত কোনোভাবেই দুই হাজার টাকার বেশি হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। নির্বাচনে অসত্ প্রতিযোগিতা বন্ধ করে রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে সুস্থ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে এলাকাভিত্তিক একক প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা চালু করতে হবে, অর্থাত্ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দল বা জোটসমূহের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে তাদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। সংসদে সংরক্ষিত আসন ৬৪ তে উন্নীত করে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। সংসদ সদস্যরা কেবল আইন প্রণয়ন, বাজেট পাস ও বৈদেশিক চুক্তি অনুমোদনেই সর্বোতভাবে ব্রতী থাকবেন। স্থানীয় সরকারে তাদের কোন হস্তক্ষেপ থাকবে না। উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তারা কেবল তদারকি করতে পারবেন। কমপক্ষে পাঁচ বছর রাজনৈতিক দলে সক্রিয় না থাকলে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ীসহ কেউই নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, কালো টাকার মালিক, ঋণখেলাপি, সরকারি সম্পদ আত্মসাত্কারী, অর্থসহ জাতীয় সম্পদ পাচারকারী, অসত্ ব্যবসায়ী, ফৌজদারী অপরাধে দণ্ডিত, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী প্রভৃতি গণবিরোধী ব্যক্তি নির্বাচনে প্রার্থী হবার সুযোগ পাবেন না। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি তার আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। গুরুতর অসুস্থতা ব্যতিরেকে একটানা ৩০ দিনের অধিক কার্যদিবস সংসদে অনুপস্থিত থাকলে বা ভোটারদের আস্থা হারালে ৩০% ভোটারের লিখিত দরখাস্তের প্রেক্ষিতে তাকে ‘রিকল’ অর্থাত্ তার সংসদ সদস্যপদ প্রত্যাহার করার বিধান চালু রাখতে হবে। সংসদ সদস্যদের বৈধ আয়ের সাথে সঙ্গতিহীন অনুপার্জিত অর্থ সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও তার সংসদ সদস্যপদ খারিজ করতে হবে। সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও ভোট প্রদানের ক্ষমতা নিশ্চিত করে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নিরংকুশ ক্ষমতা রহিত করে মন্ত্রী পরিষদ, সংসদীয় কমিটি ও সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে গণতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সকল পর্যায়ে নির্বাচিত স্থানীয় সরকারকে মন্ত্রী, এম.পি ও আমলাতন্ত্রের হস্তক্ষেপমুক্ত রেখে কার্যকরী ও স্বাবলম্বী প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। গণপ্রতিনিধিত্বশীল অধ্যাদেশ সংশোধন করে পুনরায় ‘না’ ভোটের বিধান যুক্ত করা প্রয়োজন। ‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’ এই নীতির ভিত্তিতে নির্বাচনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ধর্ম ও সামপ্রদায়িকতার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। সতর্ক করার পরও কোন প্রার্থী বা তার সমর্থকেরা যদি নির্বাচনী আচরণ বিধির গুরুতর লংঘন অব্যাহত রাখেন তাহলে নির্বাচন কমিশন তার প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করবেন। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের বর্তমান শর্তাবলী দেশের সংবিধানের সাথে অসংগতিপূর্ণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক ও আরপিও’র অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক ধারাসমূহ বাতিল করে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের বিধান বাতিল করতে হবে। দল ও ব্যক্তির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।