ছোট উদ্যোগ বড় সাফল্য
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:০৯
ঊনত্রিশ বছরের টগবগে তরুণ মাহমুদুল হাসান। ২০০৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এমএসএস পাস করেছেন। চাকরির জন্য ঘুরেছেন এক বছর। পছন্দমত চাকরি না পেয়ে সেই পথ ছেড়ে ২০১০ সালে রাজধানীর শাহবাগের আজিজ মার্কেটে খুললেন কাপড়ের দোকান। পার্টনার হিসাবে সঙ্গে নিলেন দুই বন্ধুকে। মাত্র তিন বছর পেরোতেই মাহমুদুলের এখন তিনটি দোকান। গড়ে তুলেছেন ছোটো-খাটো একটি গার্মেন্টস কারখানাও। তিনি এখন স্বপ্ন দেখেন বড় আকারের একটি গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তুলবেন, দেশে ও দেশের বাইরে নিজের তৈরি পোশাক ছড়িয়ে দিবেন।
মাহমুদুলের মতোই দেশে ছোটো পরিসরে ব্যবসা শুরু করে এখন বড় আকারে তা ছড়িয়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখছেন লাখো তরুণ। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তরুণদের এই প্রয়াস ছড়িয়ে পড়েছে। সমাজও এর সুফল পেতে শুরু করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, এসএমই ফাউন্ডেশন এবং রাজধানীতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কয়েকটি তরুণ উদ্যোক্তা সম্মেলনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শুধু রাজধানীতেই তরুণ উদ্যোক্তার সংখ্যা এক লাখের বেশী। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি বলেই মনে করেন উদ্যোক্তারা। এছাড়া দেশের সব জেলাতেই এখন তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। রাজধানীতে আইটি, পোশাক, অনলাইনভিত্তিক উদ্যোগই বেশী গ্রহণ করছেন নবীন উদ্যোক্তারা। অনেকের উদ্যোগ প্রশংসা কুড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৃজনশীল তরুণদের অনেকেই প্রচলিত ধারায় ব্যবসা শুরু না করে নিজেদের উদ্ভাবনকৃত পণ্য বাজারজাত করে সাফল্য পেতে শুরু করেছেন। তেমনই একজন আবুল কালাম আজাদ (২৯)। ফেসবুকে একটি পেজ তৈরি করে সেখানে নিজের উদ্ভাবিত ‘ল্যাম্প শেডে’র ছবি-বর্ণনা সংযুক্ত করেছেন। অনলাইনেই চলে এর বেচা-কেনা। আবুল কালামের মত একই পথে হাঁটছেন হাজারো তরুণ। যারা নিজেদের প্রোডাক্ট অনলাইনেই বেচা-কেনা করেন।
দুই বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাস করেছেন চট্টগ্রামের মেয়ে নাদিয়া ফিরোজ (২৭)। বান্দরবান-রাঙামাটি ঘুরতে যেতেন প্রায়ই। সেইসূত্রে আদিবাসী কয়েকজনের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিলেন। এখন সেই বন্ধুদের কয়েকজনকে নিয়েই নিউমার্কেটে গড়ে তুলেছেন কারুশিল্প দোকান, সাফল্যও ধরা দিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে এরকম আরো শোরুম খোলার স্বপ্ন দেখছেন এখন নাদিয়া।
তরুণদের এ রকম ছোট উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। যেমনটি বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরিদউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘তরুণদের এন্টারপ্রাইজ গড়ে তোলাটা আমাদের অর্থনীতির জন্য অনেক বড় সম্ভাবনা। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে এ ধারা বেশ ভালোভাবেই তৈরি হয়েছে। ছোটো পরিসরে তারা ব্যবসা শুরু করেছে। এর মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণ হচ্ছে, অভিজ্ঞতা লাভ করছে। ব্যবসায় নানা ধরনের সমস্যা-বাধা সম্পর্কে জানবে-বুঝবে, পুঁজি বাড়বে। এর মাধ্যমেই বড় উদ্যোক্তা হিসেবে এখনকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার আবির্ভাব ঘটবে।’
এই অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ‘তরুণদের সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হওয়া উদ্যোগগুলো ছোটো হলেও, সেগুলোও কমবেশী কর্মসংস্থান তৈরি করছে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ বেসরকারি অনেক বড় প্রতিষ্ঠানও সহযোগিতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই তরুণদের এ উদ্যোগগুলো অনেক বড় সম্ভাবনা তৈরি করছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
যোগাযোগ ও প্রযুক্তিখাতে সম্ভাবনা বেশী
তরুণ কয়েকজন উদ্যোক্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, নতুন উদ্যোগগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও প্রযুক্তিখাতের প্রচেষ্টাগুলোই দ্রুত সাফল্য পাচ্ছে। এ খাতে কাজ করার সুযোগও অপেক্ষাকৃত বেশী। কম্পিউটার, মোবাইলসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রের নিত্য নতুন এপ্লিকেশন ডিজাইন-ডেভেলপ করে খুব দ্রুতগতিতে তা ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। এছাড়া মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয়ে সুযোগ তৈরি করতে এবং বিনোদনের জন্য এপ্লিকেশন তৈরি ও বাজারজাত করার দিকে ঝুঁকছেন প্রাযুক্তিক ধারণা রাখেন এমন তরুণরা।
যেমন সাম্প্রতিক কয়েক বছরে ক্ষুদে রোবট তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন তরুণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের প্রচেষ্টা প্রশংসা কুড়িয়েছে। আর্থিক সুবিধা মিললে এ অগ্রযাত্রা অনেক দূর নিয়ে যাওয়া যাবে বলে তাদের বিশ্বাস।
জানা গেছে, ‘ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন’ প্রাথমিকভাবে তৈরি করেছিলেন বুয়েটেরই প্রাক্তন শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান সোহাগ (৩১)। আর আহসানউল্লা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আরিফুল ইসলাম (২৪) ‘সোলার চার্জ কন্ট্রোলার’ তৈরি করে সাফল্য পেতে শুরু করেছেন।
যাত্রা শুরুর আগে
সফল কয়েকজন তরুণ উদ্যোক্তা নতুনদের উদ্দেশে বলছেন, দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় তরুণ উদ্যোক্তার সংখ্যা খুব একটা বেশী নয়। তরুণদের আরো এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য নিজেদের জ্ঞানকে পুঁজি করে সাহস করে এগিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। ব্যবসা শুরুর আগে নিজের ব্যবসার ধারণা ও লক্ষ্য ঠিক করে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সফল ব্যবসায়ীদের সাথে সাক্ষাত্ করলে বড় উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। শুরুতেই দ্রুত অর্থ উপার্জনের চেয়ে ব্যবসা টেকসই করার দিকে মূল মনোযোগ দিতে হবে বলে তারা মনে করেন।