শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৮০ শতাংশ

দীর্ঘ দিনের গ্যাস-বিদ্যুত্ সঙ্কটের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতায় শিল্প-বাণিজ্যের স্থবিরতা দিন দিন বাড়ছে। ফলে উত্পাদন ঠিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। আবার অনেক উদ্যোক্তা শিল্প স্থাপন করেও উত্পাদনে যেতে পারছেন না। এসব উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের একটি বড় অংশই ব্যাংক ঋণ থেকে আসে। এ কারণে ব্যাংক ঋণও পরিশোধ করতে পারছেন না তারা। ফলে বেড়ে যাচ্ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। গত ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮০ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে দেখা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে শিল্পখাতে এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৩০ শতাংশ বেশি। এসময়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল আট হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। অর্থাত্ আগের বছরের তুলনায় গত অর্থবছরে এ পরিমাণ ছয় হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা বা প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে। শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গ্যাস-বিদ্যুত্ সঙ্কটের কারণে বিনিয়োগের পরিবেশ অনেকাংশেই নষ্ট হয়েছে। ফলে শিল্প খাতে বড় ঋণের চাহিদা কম রয়েছে। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার কারণে সার্বিকভাবে খেলাপি ঋণ বিতরণ বেড়েছে।’ ব্যাংকাররা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালার আলোকে মার্চ প্রান্তিক থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ শ্রেণিকরণ করছে। নতুন নীতিমালার কারণে শ্রেণিকৃত (খেলাপি) ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসা বাণিজ্যের মন্দা যাচ্ছে। এজন্য ঋণ গ্রহীতারা ঋণের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। ফলে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, নতুন নীতিমালার ফলে প্রথম দিকে ব্যাংকগুলো কিছুটা সমস্যায় পড়লেও পর্যায়ক্রমে তা কাটিয়ে উঠবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত অর্থবছর সব ব্যাংকেরই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এ খাতের খেলাপি ঋণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাণিজ্যিক ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে। শিল্প খাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানার চারটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ রয়েছে ছয় হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা, আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৯৬ শতাংশ বেশি। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে ঋণ না বাড়লেও খেলাপি ঋণ বেড়ে এক হাজার ৫৮৩ কোটিতে দাঁড়িয়েছে, আগের তুলনায় যা ৫৩ শতাংশ বেশি। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে রয়েছে ৫ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা, আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৮৮ শতাংশ বেশি। আর বিদেশি মালিকানার ব্যাংকগুলোতে রয়েছে ৩৩৫ কোটি টাকা যা ৮১ শতাংশ বেশি। এছাড়া ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৮১৯ কোটি টাকা, আগের অর্থবছরের তুলনায় যা দুই শতাংশ বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছর শিল্প খাতে বিতরণ হওয়া মোট ঋণের বড় অংশই গেছে চলতি মূলধনে। এ উপ-খাতে দেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ তিন হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৩৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। আর মেয়াদি ঋণ দেয়া হয়েছে ৪২ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ২০ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। এসময়ে আগে দেয়া ঋণ আদায় হয়েছে এক লাখ ২২ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। আগের অর্থবছর আদায় হয়েছিলো ৯৪ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা। এতে করে একই সময়ের তুলনায় আদায় বেশি হয়েছে ২৯ শতাংশ। তবে ঋণ বাড়ার সঙ্গে আদায় সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সরকারি মালিকানার বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো ছাড়া অন্য সবার ঋণ বিতরণ আগের অর্থবছরের তুলনায় বেড়েছে। গত অর্থবছর বিতরণ করা মোট ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানার চারটি ব্যাংক দিয়েছে ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, আগের অর্থবছরের তুলনায় যা আট দশমিক ২৮ শতাংশ বেশি। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে চার হাজার ১২৮ কোটি টাকা যা দুই দশমিক ৯০ শতাংশ কম। বেসরকারি ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে এক লাখ ১৩ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা যা ৩৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। আর বিদেশি ব্যাংকগুলো দিয়েছে ১০ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা যা ১২ দশমিক ১১ শতাংশ বেশি। এছাড়া ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ছয় হাজার ২৪৫ কোটি টাকা বিতরণ করেছে যা ৩২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি।