বিশুদ্ধ পানির নামে কি পান করছেন!
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:১২
মিনারেল ওয়াটারের নামে কি পান করছেন, তা কি কখনও ভেবে দেখেছেন? বোতল কিংবা জার ভর্তি পানি দেখলে আমরা মনে করি ঐ পানি বিশুদ্ধ মিনারেল ওয়াটার। আসলেই কি তাই? অত্যন্ত দু:খজনক হলেও সত্য যে, অনেক কোম্পানিরই কথিত মিনারেল ওয়াটার মোটেই বিশুদ্ধ নয়, বরং নানাপ্রকার ক্ষতিকর জীবাণুতে পরিপূর্ণ। একশ্রেণীর অসাধু মুনাফালোভী ব্যবসায়ী নদী, খাল, বিল কিংবা ওয়াসার পানি সরাসরি বোতল অথবা জারে ভর্তি করে নিত্যদিন বাজারজাত করছে। সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, মিল, কারখানা, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, দোকান, মার্কেটসহ সর্বত্র এ পানি সরবরাহ করছে ভ্যান গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহনযোগে। খোদ রাজধানীতে সরকারি-বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মার্কেটসহ এমন কোন জায়গা নেই যেখানে এ কথিত মিনারেল ওয়াটার নেই। ওয়াসা, নদী, খাল ও বিলের পানি বোতল কিংবা জার ভর্তি করার সময় অনেককেই হাতেনাতে ধরে মোবাইল কোর্ট জরিমানা করছে। এরপরও দূষিত পানি মিনারেল ওয়াটার নামে প্রকাশ্যে বাজারজাত করে দুষ্টচক্র কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছে। মানুষ টাকা দিয়ে কিনে এ দূষিত পানি পান করে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। রাজধানী ছাড়াও জেলা শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের হাটবাজার পর্যন্ত মিনারেল ওয়াটারের নামে এই দূষিত পানি সয়লাব। গ্রামের বাড়ির পাশে ছোট টং দোকানেও মিনারেল ওয়াটার নামক এই দূষিত পানি দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। লোকজন গভীর নলকূপ কিংবা ফুটানো পানি পান করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। গ্রামাঞ্চলের অশিক্ষিত বিশাল জনগোষ্ঠী মিনারেল ওয়াটারের নামে প্রতিদিন কি বিষ পান করছেন সে সম্পর্কে তারা বলতে গেলে একেবারেই অজ্ঞ।
মহাখালী আইসিডিডিআরবি (আন্তর্জাতিক উদরাময় কেন্দ্র) প্রধান ডা. প্রদীপ বর্ধন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, লোকজন মিনারেল ওয়াটারের নামে দূষিত পানি পান করার ফলে রাজধানীসহ গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত পানিবাহিত রোগব্যাধি ব্যাপক হারে বাড়ছে। রাজধানীসহ আশপাশের বিশাল জনগোষ্ঠী সারা বছরই ডায়রিয়া, টাইফয়েড, আমাশয়সহ পানিবাহিত নানা রোগে ভুগে থাকে। নিয়মিত দূষিত পানি পানই এর অন্যতম কারণ। মিনারেল ওয়াটারের নামে বিষপান সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার হওয়া প্রয়োজন। জড়িত মুনাফালোভী মানুষরূপী দানবদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হলে দূষিত পানির নামে বিষ পান করা বন্ধ হবে বলে মনে করেন তিনি।
গতকাল সোমবার বিএসটিআইয়ের পরিচালনা ম্যাজিস্ট্রেট মাকসুদা খন্দকারের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট জুরাইন এলাকায় এক প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ওয়াসার পানি কিংবা নদীর পানিভর্তি জার জব্দ করেন। প্রতিষ্ঠানের নাম “জু” পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার, ঠিকানা-পূর্ব ধোলাইপাড়। এ প্রতিষ্ঠানটির বাইরে সাইনবোর্ড ঝুলানো। বাইরে থেকে কারখানা বন্ধ মনে হলেও ভেতরে ঠিকই ময়লা-আবর্জনা ও নোংরা পরিবেশে ওয়াসার পানি সরাসরি জার ভর্তি করার প্রমাণ পায় মোবাইল কোর্ট। এ কারখানার ম্যানেজার সুমনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেয় মোবাইল কোর্ট। কারখানাটি সীলগালা করে দেয়া হয়। জব্দ করা দূষিত পানি জনসম্মুখে ফেলে দেয়া হয়। এছাড়া জুরাইন আলমবাগ এলাকায় আবিরা এন্টারপ্রাইজ (ডায়মন্ড ফ্রেশ) নামক প্রতিষ্ঠানেও একইভাবে ভেতরে নোংরা পরিবেশে ওয়াসার পানি জার ও বোতল ভর্তি করার সময় বেশ কিছুসংখ্যক পানিভর্তি জার আটক করে মোবাইল কোর্ট। এ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার আবু সাঈদকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে তিন মাস কারাদণ্ড প্রদান করে মোবাইল কোর্ট। দুই ম্যানেজারই মোবাইল কোর্টকে জানায়, তারা এই দূষিত পানি জার ও বোতলজাত করে রাজধানীসহ আশেপাশের অফিস, মার্কেট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানায় দীর্ঘদিন যাবত্ সরবরাহ করে আসছে। প্রায় প্রতিটি এলাকায় তাদের পানির ডিলার রয়েছে। ট্রাক কিংবা বিভিন্ন যানবাহনযোগে ঐ সকল ডিলারের কাছে জার ভর্তি পানি নিত্যদিন সরবরাহ করা হয়ে থাকে। পানি বিক্রি করে তারা লাভ করে টাকায় ৯০ পয়সা। অর্থাত্ খরচ মাত্র দশ পয়সা। এ পানি একশ ভাগ দূষিত বলে মোবাইল কোর্টের কাছে স্বীকার করেছে তারা।