আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৩৮
২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বাংলা সন। এদিনে বাংলা সাহিত্যের একমাত্র নোবেল বিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু-দিন। বাংলা সাহিত্যের খুব বড় কবি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক ও গান সব শাখাতেই বিচরণ ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তিনি যে কত বড় কবি ও সাহিত্যিক ছিলেন তা বলে শেষ করা যাবে না। রবীন্দ্রনাথকে বলা হয় চিরসুন্দরের কবি ও চিরনতুনের কবি। তিনি বড়দের জন্য লিখেছেন অনেক অনেক গল্প ও কবিতা। তাই বলে রবীন্দ্রনাথ ছোটদের ভুলে থাকেননি। ছোটদের জন্য লিখেছেন অনেক কবিতা, নাটক, ছড়া ও গল্প। খুব ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথের মাথায় সাহিত্য ভাবনা ছিল। তিনি যখন খুব ছোট, তখন এক বৃষ্টির দিনে বলে উঠলেন ‘জল পড়ে/পাতা নড়ে’। সবেমাত্র শিশু রবীর যাত্রা শুরু। ছোটবেলায় তিনি বাড়িতে একাই খেলতেন। তার সঙ্গী ছিল একটি কাঠের ঘোড়া। একদিন সে ঘোড়াটিকে কোপাতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন ‘সঙ্গী মামা কাটুম/হাড্ডি বসে বাটুম’ রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ১১ বছর। গৃহশিক্ষক সেজে বাড়ির বিড়াল ছানাটিকে পড়াতে বসেন—‘আমি আজ কানাই মাস্টার/পড় মোর বিড়াল ছানাটি’। রবীন্দ্রনাথের প্রথম কবিতা ছাপা হয় অমৃত বাজার পত্রিকায়। কবিতার নাম ‘হিন্দু মেলার উপহার’। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৩ বছর ৮ মাস। ষোল বছর বয়সে লিখলেন ‘ভানু সিংহের পদাবলী’। এ সবই রবীন্দ্রনাথের ছোটবেলার কীর্তি। এই কীর্তিমানের জন্ম ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ বাংলা। বড় হয়েও সাহিত্য চর্চায় রবীন্দ্রনাথ ছোটদের ভুলে থাকেননি। লিখলেন বিখ্যাত কবিতা ‘আমাদের ছোটনদী, ছুটি, বীরপুরুষসহ আরো কত শত কবিতা।’ ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে। বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে। পার হয়ে যায় গরু। পার হয় গাড়ী। দুই ধার উঁচু তার ঢালু তার পারি।’ আমাদের ছোট নদীর কয়েকটি চরণ মাত্র। এ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ গ্রামীণ সৌন্দর্য এত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মনে হবে শিল্পীর আঁকা ছবি। রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ কবিতার কয়েকটি লাইন এখানে তুলে ধরা হলো—‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি/ আজ আমাদর ছুটি ও ভাই/ আজ আমাদের ছুটি/ কী করি আজ ভেবে না পাই/পথ হারিয়ে কোন বনে যাই/ কোন মাঠে যে ছুটে বেড়াই/সকল ছেলের জুটি’ বীর পুরুষ কবিতায় কবি লিখলেন—‘মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে/মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে/ তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে/ দরজা দুটো একটু ফাঁক করে।’ রবীন্দ্রনাথের ছোটদের কবিতাগুলো কতনা সুন্দর আর চমত্কার। শুধু পড়তেই ইচ্ছে করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছোটদের জন্য অনেক গল্পও লিখেছেন। ‘ছুটি’ রবীন্দ্রনাথের একটি শ্রেষ্ঠ ছোট গল্প। এ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে ফটিক চক্রবর্তী। সে বালকগণের সর্দার। দারুণ দুষ্টু। এ গল্পে দুষ্টু ফটিকের করুণ পরিণতিই মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ। আবার আমরা কাবুলীওয়ালা নাটকে মিনিকে দেখি ভীনদেশী এক লোককে আপন করে নিতে। এখানে মিনির শিশু চরিত্রকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ। ডাকঘর নাটকে অমল কত করুণ সুরে দইওয়ালাকে ডাকে। ‘দইওয়ালা.... দইওয়ালা.... ও দইওয়ালা’। পোস্টমাস্টার বড়দের গল্প হলেও ছোট গ্রাম্য বালিকা রতনকে কতনা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। ‘রতন কোন কথা কহিল না সে নিরবে কাঁদিতে লাগিল।’ রবীন্দ্রনাথ ছোট বড় সবার জন্য সমান প্রিয়। আমাদের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’। তার ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, নাটক ৩৮টি, উপন্যাস ১৩টি, প্রবন্ধ ৩৬টি, ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান রচনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর অনেক অনেক গ্রন্থের মধ্যে এখানে কয়েকটির নাম তুলে ধরা হলো। গীতাঞ্জলি, বলাকা, চিত্রা, মানসী, সোনার তরী, গোড়া, শেষের কবিতা, রক্ত করবী অন্যতম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পদক পান। যা বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের বুকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁকে আমরা স্মরণ করি শ্রদ্ধার সাথে।