ফেসবুক বন্ধু
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৪০
কিছুদিন ধরে অম্লান বোনকে ল্যাপটপে কাজ করতে দেখে। পড়তে দেখে। কি পড়ে জানে না। জিজ্ঞেস করলে আপু বলে পড়ছে, কাজ করছে।
সে যে একটু আড়চোখে দেখে না তা না। কিন্তু কিছু বুঝতে পারে না। ছবি আর লেখা দেখতে দেখতে আপু অন্যটায় চলে যায়। কম্পিউটার না জানলে কেউ এসব বুঝতে পারবে না। অম্লান শিখবে শিখবে করে ক্লাস সিক্সে উঠে গেল। টুকটাক কাজ করতে পারে। পড়ার চাপে বেশি কিছু শিখার সময় হয়নি। শুধু খেলতেই সময় চলে যায়। কম্পিউটারে না খেলে উপায় কি? বাসার কাছাকাছি কোথাও মাঠ নেই যে খেলবে। তার কাছেই দুইটি পোশাক কারখানা। শব্দ আর ধোঁয়ায় অস্থির লাগে। দুই-একজন বন্ধু আছে। হরতালের দিনে ওরা বাড়ির সামনের রাস্তায় ক্রিকেট খেলে। ওতে কি আর মন ভরে? না কোনো উপকার হয়? আর কোনো কাজ না পেয়ে কম্পিউটারে গেম করেই সময় কাটায়। ছবি আঁকার স্কুলে গিয়ে ছবি আঁকাও শিখেছে কিছুদিন। মাঝে মাঝে জানালার কাছে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পাশের ফ্ল্যাটের এসির গরম বাতাস লাগলে সে সরে আসে। আপু যে শুধু ল্যাপটপে পড়ার কাজই করে এটা অম্লান বিশ্বাস করতে চায় না। নিশ্চয় আপু ফেসবুকে চ্যাট করে অনেকটা সময় কাটায়। আপুই বলেছিল যে, তার অনেক ফেসবুক ফ্রেন্ড আছে। অম্লানের মত তাই তার একা একা লাগে না। খেলার জন্যে অস্থিরতা নেই। আপু ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। অনেক স্বাধীনতা। স্কুলে পড়ে বলে অম্লানের ফেসবুকে ঢুকা নিষেধ আছে মায়ের। তাই সে এর কিছু বুঝে না। অম্লানের বন্ধুদের নাকি কারো কারো ফেসবুক একাউন্ট আছে। তারও খুব ইচ্ছে। কিন্তু মাকে তো রাজি করাতে হবে। নিদেনপক্ষে আপুকে। মাকে রাজি করানো কঠিন কাজ।
ছোট মানুষ বলে তাকে অনেক কিছুই করতে দেয়া হয়না। কিন্তু এতে তার আগ্রহ কমেনি। বন্ধুরা তাকে বেকডেটেড বললে তার খারাপ লাগে। তাই আপুকে অনেক বলে কয়ে একটা ফেসবুক একাউন্ট খুলে নিল। আপু অনেক শর্ত দিল। সে সেটা মেনে নিল। আপু নিজেকি নিরাপদ রাখার জন্যে অম্লানের আবদার মিটালো।
অনেক কিছু শিখে গেল ক’দিনেই। নতুন জগতের- নতুন রাস্তার সন্ধান পাওয়ার আনন্দ তাকে বাধঁ ভাঙা জোয়ারে ভাসিয়ে দিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায় যন্ত্রের সাথে। বিশ্বটা তারর চোখের সামনে।
নতুন জিনেসের অধিকার পেয়ে অম্লানের আর হুঁশ নেই। দুনিয়ার লোককে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে। ফলে দেশে এবং বিদেশে প্রচুর বন্ধু পেয়ে গেছে সে। তাই স্কুলের বন্ধুদের সাথে আগের মত মেশার টান নেই। আগে কখন স্কুলে যাবে খেলবে—আকুল হয়ে যেত। এখন আর তা না। মার কাছে, আপুর কাছে ঘুরঘুর করতো। এখন সেটার সময় নেই। নিজের ভেতরেই জগত্। বাবার কাছে অনেক গল্প করতো। আত্মীয়-স্বজনের কথা মনে হতো। সব উবে গেছে। কাছের মানুষরা কাছে থেকেও অনেক দূরে। আর দূরের মানুষগুলো সারাক্ষণ চোখের সামনে। মা মাঝে মাঝে জানতে চান কম্পিউটারে এত সময় কি গেম করছে সে। এটা-ওটা বলে বুঝায়। রাখ-ঢাক করাও শিখে গেছে। নিজেকে নিজে কতটা পরিণত করে তুলেছে সে টেরও পায়নি। ঐ বাক্সের ভিতর জীবন বন্দি হয়ে গেছে।
বুলুর সাথে তার বেশি কথা হয়। বুলু দেখতে সুন্দর।
অম্লান নিজে নিজেই অনেক কিছু শিখে গেছে। লাইক দেয়া, ছবি আপলোড করা, ডিলিট করা, কোনো কমেন্ট লেখা। আপুকে এখন আর ডাকতেই হয় না। দুই রুমে দুইজন। কোনো কথা নেই। বাবা রাতে বাড়ি ফিরে দেখেন ছেলে-মেয়ে পড়ার টেবিলে। খুশি হন। ছেলেটার মনোযোগ হলো তবে! মা-ও কাজ সেরে টিভিতে সিরিয়াল দেখতে বসেন। আগে অম্লানটা বিরক্ত করতো। খুনসুটি করতো। এখন আর টেবিল ছেড়ে উঠেই না। মাঝে মাঝে দূর থেকে উঁকি দিয়ে দেখেন ছেলেটা কম্পিউটারে মগ্ন। থাক। ঘরেইতো আছে।
বন্ধুদের কথা কখনও কখনও সবার কথার চেয়ে দামি হয়। অম্লানের কাছেও তাই হলো। বুলুকে সে এবার দেখতে চায়। আত্মীয়দের কারো কাছে সে যেতে চায় না। ওরা তো আছেই। অচেনার প্রতি একটা গভীর আকর্ষণবোধ করে। যন্ত্রের বন্ধুই তাকে বেশি টানে। তিন মাস পার হলো। দুইজনকে অনেকটাই বলা হয়েছে দুইজনের। অম্লান বুলুর সাথে দেখা করতে যাবে বলে ঠিক করে। কোথায় কখন যাবে সব কথা বলে ঠিক করে নেয়। স্কুল থেকেই সে চলে যাবে। আজকাল সে একাই স্কুলে আসে-যায়। আগে মা-বাবা নিয়ে আসতো। সিক্সে উঠার পর সে নিয়ম বদলেছে।
বুলু একা আসবে। বারবার বলে দিয়েছে অম্লান যেন কাউকে সাথে না নেয়। ভয় পায় কিনা তা নিয়ে হাসাহাসি করেছে। বুলু যদি একা আসে তাহলে সে কেন পারবে না? কাউকে সাথে নিলে বুলু দেখাই করবে না হয়তো। কিন্তু তাকে তো অম্লান দেখতে চায়।
রিকশা এসে থামলো রায়েরবাজার বধ্যভূমির কাছাকাছি। এখানেই কোথাও দাঁড়াবে বুলু বলেছিল। কিন্তু ফোন এলো। এবার বুলু বললো আহসান মঞ্জিলের কাছে নদীর ধারে চলে যেতে। অম্লান তাই করলো।
বিকেল হয়ে গেল। বারবার আসবে বলেও বুলু আসেনি। সন্ধ্যা হয়ে এলো। তাহলে কী বুলু আসবে না? মিথ্যে কথা বলেছে? কেনইবা এমন হবে? বাসায় না জানি কি তুলকালাম কাণ্ড হচ্ছে! ভয়ে সে ফোন করেনি। তার সাথের সেল ফোনটা এক বন্ধুর কাছ থেকে একদিনের জন্য চেয়ে নিয়ে এসেছে। মা এটার কথা জানে না। কী করবে? মাকে একবার বলবে কিছু? মা কত কিছু জানতে চাইবে। কী বলবে সে? খুব রাগ হচ্ছে বুলুর ওপর। নাহ্! ফিরে যাবে সে। কিন্তু বুলু ফোন করে করে বলছে যে, এই আসছে। এই আসছে। সন্ধ্যায় একটু ভয় ভয় লাগছে। লোকজন দোকানপাট সব কিছু তার অচেনা। রিকশার শব্দে সন্ধ্যা মুখর। হঠাত্ পেছন থেকে কে যেন এসে কাঁধে টোকা দেয়। খিলখিল করে হেসে উঠে। চমকে ওঠে অম্লান, পেছন ফিরে। ভয়ে কলজেটা শুকনো পাথর হয়ে যায়। ফেসবুকের সেই ছবির সাথে মিল আছে দেখে স্বাভাবিক হয় সে।
: কেমন আছ অম্লান? সরি। একটু বেশিই দেরি হয়ে গেল। নেট স্লো হলে যেমন হয় আর কী? বলেই মিষ্টি করে জোরে শব্দ করে হাসে।
: তাই বলে এত দেরি? আমার অবস্থাটা বুঝতে পারছ? না জানি আমাকে নিয়ে মা-বাবা কি কাণ্ড ঘটাচ্ছে।
: কী করবো বল? আজ অনেকের সাথে এপয়েন্টমেন্ট ছিল। দেখা করে আসতে আসতে দেরি হয়ে গেল। বল কেমন আছ? আরও দুইজনকে অন লাইনে রেখেছি।
:আমি ছাড়া তোমার আরও অনেক বন্ধু? মানে—
: হ্যাঁ—কেন থাকবে না? যন্ত্রের মানে ইলেকট্রিক বন্ধুর কোন হিসেব আছে নাকি?
অম্লানকে মুখ কালো দেখে বলে—এতে আবেগের কোনো বিষয় আসতে পারে না। তুমি তোমার অবসর সময়ে আমাকে খুঁজছো। আবার আমাকে বন্ধ করে রাখছো। তাই না?
: কিন্তু ওপারেও তো একজন মানুষ আছে নাকি? যাকে আমি খুব আপন করে ভাবি।
: তুমি যা ভাবছো তা না-ও হতে পারে। যাকে ভাবছো সে-ও না হতে পারে। দেখ—এমন করেই প্রোফাইলটা বদলে যাচ্ছে না? বলেই মুখোশটা সরিয়ে নিল। ভিতর থেকে বীভত্স একটা চেহারা দেখে অম্লান ভয় পেয়ে গেল। বড় বড় ধারালো নখওয়ালা দুটো হাত দিয়ে অম্লানকে ধরতে এলো। অম্লান পিছিয়ে যেতে যেতে বললো, তুমি? তুমি কে?
বিশ্রি হেসে বললো বুলু—বাহ্! আমি তোমার যন্ত্রবন্ধু। ভূত-টুত ভেবো না। আজকাল ভূত-মানুষ-যন্ত্র একাকার হয়ে গেছে। আড়াল থেকে এত সুন্দর কথা হয়েছে। এখন সরে যাচ্ছ কেন? সামনে যারা সারাক্ষণ থাকে তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছ। আমার থেকেও সরে যাচ্ছ— কেন? কেন অম্লান? সত্যি করে বলতো কি হয়েছে? বড় বড় নখগুলো দিয়ে অম্লানের গলা চেপে ধরলো বুলু। বলতে লাগলো—ভয়, মায়া, আবেগ এসব তুমি ছাড়তে পারনি? একটা বুকফাটা চিত্কার দিয়ে অম্লান পড়ে গেল। সে আর কিছুই বলতে পারে না।
এখন রাত কি দিন সে জানে না। কি থেকে কি হচ্ছে তার মাথায় আসছে না। মাথাটা মহাশূন্যের শূন্য প্রান্তর যেন।
ভয়ে চোখ মেলে না। কানের কাছে মা-বাবার কথা শোনা যাচ্ছে। আপুর কথাও। মা ডাকেন—অম্লান, বাবা। সোনা। সোনা আমার। চোখ খোল। দেখ আমাকে। কি হয়েছে আমাকে সব বল।
: আমি এখানে কেন? কোথায় আমি?
:এই যে আমাদের সবার কাছে। চোখ খুলে সবাইকে দেখ।
: মা আমি সবার সাথে থাকতে চাই। সবার মাঝে থাকবো এখন থেকে। একা একা রাস্তা না চিনে অনেক দূর চলে গিয়েছািম । মায়ের চোখে পানি। বাবা-মা-বোন সবাই তার চোখ মুছে। ওরা তার হাত ধরলো। অম্লান শক্ত করে ধরে রাখলো সবার হাত।