আমার কথা
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৪০
বৃহত্তর ঢাকা জেলার অন্তর্গত ছিল বিক্রমপুর পরগনা। প্রাচীন আমলে কোনো এক সময় বিক্রমপুর বাংলার রাজধানী ছিল। এই বিক্রমপুরের টঙ্গিবাড়ি উপজেলায় সোনারং নামে একটি গ্রাম রয়েছে। ইতিহাসবিদ নলিনীকান্ত ভট্টশালী বলেছেন, এ গ্রামে এক সময় সোনার খনি ছিল। ব্রিটিশ আমলে এ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন অনেক সোনার ছেলে। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের আচার্য ক্ষিতিমোহন সেন, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা ও সাহিত্যিক সত্যেন সেন, নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনের মা অমিতা সেন, বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট (১৯৭২) সমর সেন, এমন আরো অনেক প্রতিভাধর জন্মেছিলেন এ গ্রামে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এ গ্রাম। এ গ্রাম নিয়ে এ রকম অনেক কথা এসে যায়। আর এ গ্রামটিতেই আমার জন্ম। আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে এ গ্রামে। এ গ্রামের প্রকৃতিই আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এ গ্রামে একটি সুন্দর স্কুল আছে। ১৮৯৭ সালে ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবীরা গড়ে তুলেছিলেন ‘সোনারং জাতীয় বিদ্যালয়’। এখন এটির নাম সোনারং পাইলট হাইস্কুল। এই স্কুলেই আমি লেখাপড়া করেছি। আমরা প্রধান শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম আবদুর রশিদ সরকারকে। তাঁর ব্যক্তিত্ব এত প্রবল ছিল যে, তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে আমরা কথা বলতে পারতাম না। সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন অমরেশ চন্দ্র দে। সকল শ্রেণির মানুষের কাছেই তিনি ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র। ১৯৭১ সালে সকলেই যখন পালাতে শুরু করলো, আমরা তখন বললাম, ‘স্যার, গ্রাম ছেড়ে আপনি অন্য কোথাও গিয়ে থাকেন’। স্যার বললেন, ‘রাজাকারেও আমার ছাত্র আছে, মুক্তিবাহিনীতেও আমার ছাত্র আছে, আমাকে কে মারবে?’ সত্যি স্যারকে কেউ কিছু বলে নি। তিনি ছিলেন নিরাপদ, বরং আপদকালে অন্যদের আশ্রয় দিয়েছেন।
গ্রামের এ রকম একটি ঐতিহ্য ও পরিবেশের মধ্যে থেকে আমি বড়ো হয়েছি। খুব স্বাভাবিকভাবেই আমার মনে ‘অনেক বড়ো’ হওয়ার একটা সাধ জেগে উঠেছিল। আমার মা ছিলেন এক ‘পড়ুয়া’ মেয়ে। তাঁর সংগ্রহে ছিল অনেক বই। আরব্য রজনী, বিষাদ সিন্ধু, আনোয়ারা, গরীবের মেয়ে, লায়লী মজনু, সাঁঝের কথা, প্রতিমা ইত্যাদি নানারকম বইয়ে মা’র ট্রাংক ছিল ঠাসা। আমি এগুলো লুকিয়ে পড়তাম। মা সব বুঝতেন (মনে মনে হয়তো বলতেন, পড়্! পড়িব না! আমার বইগুলো তাহলে আর কে পড়বে!), কিন্তু প্রকাশ্যে শাসাতেন, ‘হ্যাঁ, স্কুলের লেখাপড়া রেখে এসব কী হচ্ছে’! সঙ্গে সঙ্গে ‘আউট বই’ (গল্পের বই) লুকিয়ে ফেলতাম স্কুলের বইয়ের নিচে।
লুকিয়ে ফেললে কী হবে, আমার মন তো পড়ে থাকতো ঐ বইয়ের রাজ্যে। একবার একটা বিদেশি গোয়েন্দা কাহিনির মতো গল্প পড়েছিলাম, সেখানে একজন বিজ্ঞানী পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে রাগ করে সমুদ্রের ভেতর চলে গেছেন, তার মানে এই নয় যে, ডুব দিয়ে সমুদ্রের ভেতর চলে গেছেন। বইটির কাহিনি ছিল খুবই মজার।
এই বইটি পড়ার পর ত্রিশ-চল্লিশ বছর কেটে গেছে, কিন্তু এই বিজ্ঞানীর ঘোর আমার মন থেকে যায় না। আমি খুঁজে ফিরি বইটিকে, অথচ আমি ভুলে গেছি বইটির লেখকের নাম এবং বইটির নামও। এর মধ্যে আমার ছেলেমেয়ে প্রান্ত আর প্রাপ্তি বড়ো হয়ে গেছে। একদিন খুব সংকোচ নিয়ে ওদের কাছে বলে ফেলি কথাটা। বললাম, ‘জানো আমি একটি বই খুঁজে বেড়াচ্ছি, কিন্তু বইটির নাম, তার লেখকের নাম মনে নেই। তবে গল্পটা আবছা-আবছা মনে আছে’। ওরা খুব কৌতূহল নিয়ে বলল, ‘বলো না! গল্পটা বলো না’! আমি ওদের সেই দুঃসাহসী বিজ্ঞানীর কথা বলতে থাকি, কিন্তু শেষ করতে পারি নি, অর্ধেকটা শুনেই প্রান্ত আর প্রাপ্তি বলে ওঠে, ‘হোঃ হোঃ, আমরা জানি, এটা তো জুলভার্নের গল্প, আর গল্পটার নাম হলো টুয়েন্টি থাউজেন্ড লীগস আন্ডার দ্য সী। আমি অবাক! হায়! চল্লিশটা বছর আমার কেটে গেছে এই বইটা খুঁজতে খুঁজতে!
আমাদের দেশে ছাত্ররা খুব আন্দোলন-সংগ্রাম করে, ছাত্রজীবনে এরকম আন্দোলন সংগ্রামের সঙ্গে আমিও জড়িত ছিলাম। তাই একবার খুব আগ্রহ হলো, ছাত্রদের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসটা কী, কেমন করে প্রথম শুরু হয়েছিল ছাত্রদের আন্দোলন। দেখলাম, এটার শুরু ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। ইতিহাস খুঁজতে খুঁজতে সংগৃহীত তথ্য নিয়ে আমি লিখে ফেললাম বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস প্রথম খণ্ড। এখন পর্যন্ত এর দশটি খ্ল প্রকাশিত হয়েছে। বাঙালি জাতির ইতিহাসটা কেমন, কোথা থেকে শুরু হয়েছিল এই জাতির প্রাথমিক ইতিহাস, খুঁজতে খুঁজতে আমি আবিষ্কার করি, বাঙালিরা এ উপমহাদেশের একটি প্রাচীন জাতি, যার সূত্র লুকিয়ে আছে নূহ (আ.)-এর বংশধারার সাথে। এখান থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাঙালি জাতির অভ্যুদয় পর্যন্ত একটা ছক আমি তৈরি করে ফেললাম। এভাবে বাঙালির ইতিহাস গ্রন্থটি প্রথম লিখেছিলাম আমার নিজের জানার জন্যই। এই বইটিরই একটি কিশোর ইতিহাস তৈরি করে নাম দিয়েছিলাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ : কিশোর ইতিহাস। এতে ছোটোদের কাছে বাঙালির আদি উত্স তুলে ধরেছিলাম।
শিশু-কিশোরদের জন্য আমার লেখা এরকম আরো বেশকিছু বই আছে, যার সবগুলোই আমার নিজের জন্যই আমি লিখেছি। শিশুরা যুদ্ধ চায় না শিরোনামে আমার লেখা একটা বই আছে। এই বইটি ইরাক যুদ্ধে কিশোরী বালিকা আবিরকে আমি উত্সর্গ করেছি। আবির নামে এই কিশোরী কন্যাকে আমেরিকান সৈন্যরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল, তারপর তাকে লাঞ্ছিত অপমানিত করে হত্যা করে সৈন্যরা।
ভূত নিয়েও বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছিলাম আমি। কারণ ভূত বিষয়টা আমাদের ছোটোবেলায় খুব আগ্রহের বিষয় ছিল। জীবনে কে কয়টা ভূত দেখেছি আর সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করেছি, সে গল্প বলার প্রতিযোগিতা হতো আমাদের মধ্যে। কিন্তু ছোটোবেলা থেকেই ‘ভূত’ বিষয়টাকে আমি চ্যালেঞ্জই করেছিলাম, আর তার পেছনের রহস্য উদ্ঘাটনের অভিযানের ফলাফল নিয়েই আমার ভূতের গল্পগুলো, সেখানে বিজ্ঞান দিয়ে ভূতের আসল রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে।
আমাদের দেশে যখন ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল তখন আমার জন্মই হয় নি। ১৯৫৯ সালের (বাংলা শ্রাবণ মাসের শেষ দিনে) আমার জন্ম হয়েছিল।
১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল তখন আমি পরিপক্ক এক সচেতন বালক। যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লাম। মুন্সিগঞ্জ সাব সেক্টরে মুক্তিবাহিনী নিয়ে ঢুকে পড়লেন ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরী। তাঁর বাহিনীর ‘ইনফরমার’ হিসেবে নিয়োগ পেলাম। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ‘ইনফরমেশন’ আমি সরবরাহ করতে পেরেছিলাম। একবার এই কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়ে টঙ্গিবাড়ি থানায় গ্রেফতার হলাম। আমার দাদা এবং বড়ো চাচা এলাকায় খুব গণ্যমান্য ব্যক্তি ছিলেন, আমার আব্বা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, ফলে শেষ পর্যন্ত ছাড়া পেয়ে যাই। কিন্তু জীবনের কী ট্র্যাজেডি, লেখাপড়া শেষ করে যখন চাকরির জন্য বিসিএস পরীক্ষা দিলাম, তখন নিয়তি লিখে দিল ইনফরমেশন সার্ভিস। আজও এই সার্ভিসেই আছি।