চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাসে আড্ডার হালচাল
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:৪৮
গরম চায়ের কাপে ঝড়। ঝুপড়ি উন্মাদনার সাগরে উত্তাল। এই উত্তাল ঢেউ তারুণ্যের। ছোট্ট এক দল বন্ধু যেন এই উত্সবের এক একটি জীবন্ত ঢেউ। বন্ধুরা মিলে কখনো গান, কখনো আড্ডা, কখনোবা শুধুই চিল্লাচিল্লি- এই হল ক্যাম্পাসে আড্ডার হালচাল।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস জীবন সম্পর্কে শুনতেই যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র প্রসেনজিত্ ত্রিপুরা বললেন, ‘ক্যাম্পাস মানেই তো আড্ডা। ক্লাস টাইমে মনটা পড়ে থাকে সমাজ বিজ্ঞানের ঝুপড়িতে। কখন এক কাপ গরম চা হাতে নিয়ে আড্ডা শুরু হবে বন্ধুদের সাথে।’ প্রসেনজিতের মতো বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে উপলব্ধি করলাম, ক্লাস বা পড়ার চাপ যার যার, কিন্তু আড্ডা সবার।
‘আড্ডা দিয়ে সময় কাটাতে এখানকার শিক্ষার্থীদের জুড়ি মেলা ভার। আড্ডা সাধারণত নির্মল ও নির্ভেজাল আনন্দের বিষয়। তবে আড্ডা শুধু যে সময় কাটানোর বিষয় তা নয়। আড্ডা থেকে অনেক সময় একদমই অজানাকে জানতে পারি, নতুন সব বিষয়ে পরিচিত হই।’ কথাগুলো বলছিলেন আরেকজন শিক্ষার্থী নূর আলম পলাশ।
ক্যাম্পাসের প্রতিটি প্রান্তে আড্ডা চলছে দিনভর। হাঁড়ির কথা থেকে শুরু করে বিজ্ঞান প্রযুক্তি, ভ্রমণ, রোমাঞ্চ, প্রেম, ধর্ম, রাজনীতি, সমসাময়িক প্রসঙ্গ, শিল্প-সাহিত্য কিংবা সমাজ কোন কিছুই বাদ যায় না এসব আড্ডায়। আড্ডায় কখনোবা কোন সিরিয়াস বিষয়কে এমন হালকাভাবে রস মিশিয়ে পরিবেশন করা হয় যে বিষয়টি আর সিরিয়াস থাকে না। সিরিয়াস বিষয় নিয়ে যখন দেশের সুশীল সমাজ মাথা কুটছে, তখন সেই বিষয়েই আড্ডায় চলছে দুষ্টুমি, হাসাহাসি— যেন বাঁধ ভাঙ্গার উচ্ছ্বাস!
সায়িদা রোকসাত তাজিনকে প্রশ্ন করি, আপনারা কোথায় আড্ডা দেন? আমি যেন মহাভুল কোন প্রশ্ন করে ফেলেছি এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি জবাব দিলেন, কোথায় আড্ডা দিই না সেটা বলেন? আড্ডার কি কোন সীমারেখা থাকে নাকি? আড্ডা তো অবাধ, সীমাহীন। এর জন্য কোন স্থান-কাল দরকার হয় না।
শহর থেকে ২২ কি.মি. দূরে এই ক্যাম্পাসে আসতে কম ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয় না শিক্ষার্থীদের। কিন্তু ক্যাম্পাসের এই নির্ভেজাল আড্ডার খাতিরে এমন দশ-বিশ মাইল দূরত্ব যেন কিছুই না তাদের কাছে। কোমল পানীয় কিংবা গীটার, রাজা-উজির মারা গল্প, প্রাণ খোলা হাসি এসবের কাছে ক্লান্তি হার মানে প্রতিনিয়ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা তো শুধুমাত্র পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। মুক্তবুদ্ধি চর্চা, মননশীলতা, নৈতিকতা সর্বোপরি সুশিক্ষা অর্জনে আড্ডা বিশেষ ভূমিকা রাখে— জানান নৃবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী জয়া। শিক্ষার্থীদের হাজারো দুশ্চিন্তা আছে, ব্যস্ততা আছে, আছে পিছুটানও। কিন্তু আড্ডার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা এই যে, সকল না পাওয়াকে ভুলিয়ে আড্ডা শুরু করাতে পারে পাওয়ার আনন্দ। ক্যাম্পাস জীবনের এসকল আড্ডায় একজন শিক্ষার্থী খুঁজে পায় নতুন প্রাণের সন্ধান।
সাকিরুল হক তরু নামের এক ছাত্র জানান, শহরের এত যানজট আর বিশ্রী দূষণের ভিড়ে ক্যাম্পাস যেন একটুকরো সবুজ গ্রাম। তিনি প্রতিদিন হাঁটতে হাঁটতে খালেদা জিয়া হলের সামনে বসেন। সেখান থেকে দুই পাহাড়ের মিতালী দেখা যায় চমত্কারভাবে।
শেষের সব আড্ডার রঙ একত্রিত হয়ে রং ধনুর মতো হয়ে যায়। যেখানে চারুকলা, বিজ্ঞান বা কলার কোনো ভাগ থাকে না। সবাই মেতে ওঠে মুখর আড্ডায়। এই মিলনস্থল হলো স্টেশন চত্বর। অবিরত বাঁধভাঙ্গা এই আড্ডা চলতো, চলছে এবং চলবে। গল্পচ্ছলে, মিষ্টি মিষ্টি দুষ্টুমির কথার ফুলঝুরিতে বইতে থাকবে আড্ডার স্রোতধারা।
ছবি:অনির্বাণ রায়