আইনের সমান অধিকার না পেয়ে আদিবাসীরা আজ অসহায়
প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২১:৩০
স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পূর্ববর্তী সময়কাল থেকে আজ অবধি আদিবাসীরা নানাভাবে নিষ্পেষিত, অত্যাচারিত ও বঞ্চিত । এদেশের আদিবাসীরাও একসময় স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল যে, তারা স্বাধীন রাষ্ট্রে বসবাস করবে। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে। কিন্তু তাদের সেই আশা-আকাঙ্ক্ষা কখনো পূরণ হয়নি বরং প্রতিটি মুহূর্তে তাদেরকে বাঁকা দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। যার ফলে তারা আজ অস্তিত্ব রক্ষায় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ চাচ্ছে অর্থাত্ সাংবিধানিক স্বীকৃতি চাচ্ছে।
বাংলাদেশ একটা বহু ভাষা-ভাষি, ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগোষ্ঠীর দেশ। এখানে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের স্বাধীনভাবে চলার, কথা বলার এবং মানুষ হিসেবে মানসিক ও মেধা বিকাশে যা যা প্রাপ্য অধিকার আছে, সেগুলো স্বীকৃত। একজন মানুষের পরিপূর্ণভাবে জীবন যাপনের জন্য অর্থাত্ জীবন প্রণালীকে সুসংহত করে বাঁচার অধিকারও রয়েছে এবং রাষ্ট্র সেই অধিকার দিতে বাধ্য। কিন্তু আদিবাসীদের ক্ষেত্রে তা সত্য নয়। বরং সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশ সংবিধানের ৬ (২) নম্বর অনুচ্ছেদে লেখা আছে, “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙ্গালী এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন।” কিন্তু বাংলাদেশের সব জনগণ তো জাতি হিসেবে বাঙালি না। এখানে অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষও বসবাস করে। এভাবে সংবিধানে আদিবাসীদের স্বীকৃতি না দিয়ে নানাভাবে উপহাস-অবজ্ঞা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক এবং সশস্ত্র দলের উত্থানও শাসকগোষ্ঠীর মাত্রাতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের এক অবশ্যম্ভাবী ফসল। মানুষ তখনই সংগ্রাম করে যখন সে বোঝে তার অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে এবং জীবনযাপনের মূল স্রোতধারা থেকে তারা উপেক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশের পার্বত্য জনগণও তাই করেছিল। এইখানে কোনো নেতিবাচক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলে হবে না। আমি মনে করি, এদেশের শাসকগোষ্ঠী এখনও আদিবাসীদের বাঁকা চোখে দেখেন।
সম্প্রতি ‘আদিবাসী’ শব্দটি নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক চলছে। কিন্তু এখানে ছোট্ট একটা শব্দ নিয়ে টানাটানি করার কী দরকার? এটি তো একটা সংস্কৃতির শব্দ। শাব্দিক অর্থের দিক থেকে এটি বিশ্লেষণ করলে তো বিরাট জটিলতা লেগে যাবে । অর্থাত্ এটিকে বিশ্লেষণ করতে হবে সংস্কৃতিগতভাবে। সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বেড়েই চলেছে। প্রতিনিয়ত অত্যাচারিত হচ্ছে আদিবাসী জনগণ। কিছুদিন আগে ঘটে গেলো আরেকটি লোমহর্ষক ঘটনা। যেখানে মানুষ ওপারকে নিরাপদ মনে করে বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করেছে। কী করুণ দৃশ্য! অথচ যারা এসব নিয়ে খেলে যাচ্ছে, তারা আইনের শক্ত চৌকাঠ পেরিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনা নিয়ে সরকারের উচিত ছিল পাহাড়ি আদিবাসীদের পক্ষে দাঁড়ানো। কিন্তু দাঁড়ানো তো দূরের কথা, তাদের সুস্থ জীবনযাপনের জন্য কোনো আশ্বাসই দিতে পারেনি। তারা জানে সরকার তাদের প্রতি মোটেও আন্তরিক নয়। অথচ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে লিপিবদ্ধ আছে,“সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” পাহাড়ি আদিবাসীদের ঘর-বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, লুটপাট করে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। প্রাণনাশের আশঙ্কায় তাদের পালাতে হয়েছে সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে। অথচ মাঝখানে মাত্র একটি নদী এপার-ওপার। এপারকে তারা অনিরাপদ মনে করছে আর ওপারকে সম্পূর্ণ নিরাপদ মনে করছে এবং আসলে নিরাপদেই ছিল। কারণ বাংলাদেশ সরকার তাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ তাদের আইনের অনুশাসন। আর সেই দায়িত্ব পালন করেছিল ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ।
পাহাড়ি আদিবাসীদের ওপর দিন দিন নির্যাতন বাড়ছে। সঙ্গে মানবাধিকারও লঙ্ঘন করা হচ্ছে। আমি সম্প্রতি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইদং ইউনিয়নে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক হামলার কথাই বলছি। সেখানে সামান্য একটা সাজানো গুজবকে ইস্যু করে সেটেলাররা একটি মহলের উস্কানিতে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। সঙ্গে প্রশাসন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তারা সেটেলারদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব সমর্থন দিয়েছে। পাহাড়ি আদিবাসীরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এখনও পায়নি, আদৌ পাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। এর আগেও রাঙ্গামাটি, রামু, বাঘাইহাট, মহালছড়ি ও বান্দরবানের রাজবিলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক হামলা হয়েছিল। আইনের সমান অধিকার না পেয়ে আদিবাসীরা আজ অসহায়। বিশ্বাস ভাঙতে ভাঙতে তারা এখন কারোর ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছে না। পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের সমস্যা ঢাকায় বসে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। তাই এ অঞ্চলের সমস্যাসমূহ সম্পর্কে সম্যক ধারণা না রেখে মন্তব্যও করা উচিত নয়। পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা বুঝতে হলে একটি অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক বোধসম্পন্ন নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করা চাই। তাই সরকার, সংশ্লিষ্ট আমলাগণ, রাজনীতিবিদগণ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীদের প্রতি আহ্বান—আদিবাসীদের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে থেকে সংবেদনশীল আচরণ করুন। তারাও এদেশের নাগরিক। তাদের প্রতিপক্ষ নয়, সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করুন। দেখবেন, আদিবাসীরাও বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়