শেরপুরে মাঠে নেমেছেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা

আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে শেরপুরের রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম হয়ে উঠেছে। জেলার রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সেইসাথে শুরু হয়েছে আগ্রহী প্রার্থীদের জনসংযোগ। একইসাথে তারা দলীয় মনোনয়ন পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে চলছে প্রচার-প্রচারণা। রঙিন পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহ। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেরপুরের ৩টি আসনেই পরাজিত এবং বর্তমানে দ্বিধাবিভক্ত বিএনপি তাদের দলীয় কোন্দল চাপা দেয়া এবং হারানো আসন পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতিতে অধিকতর সক্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই দু’গ্রুপ বিভিন্ন স্থানে পাল্টাপাল্টি সভা-সমাবেশের আয়োজন করে তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে টানতে চাইছে। অপরদিকে জেলা আওয়ামী লীগ দীর্ঘ দশ বছরে সম্মেলন করতে না পারলেও নির্বাচনকে সামনে রেখে হঠাত্ করে বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন দলের মাঠ পর্যায়ের যেসব নেতাকর্মী এতদিন অপাংক্তেয় ছিল হঠাত্ যেন তারা কোন এক যাদুরকাঠির পরশে দলীয় ‘মনোনয়ন প্রার্থীদের’ খুবই আপনজন হয়ে উঠেছেন। জেলার সদরসহ ৫টি উপজেলার মধ্যে ৪টি উপজেলা চেয়ারম্যানই এবার এমপি পদের জন্য দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা সংগঠন ছাড়াও ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি, সুধীজন, ধর্মীয়, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত্ করে তাদের প্রার্থিতার কথা সবিনয়ে ব্যক্ত করে দোয়া চাইছেন। গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়তার সূত্র নতুন করে ঝালাই করে নিচ্ছেন। শেরপুর জেলায় জাতীয় সংসদের ৩টি আসন। শেরপুর সদর উপজেলা নিয়ে শেরপুর-১ আসন, নকলা-নালিতাবাড়ী উপজেলা নিয়ে শেরপুর-২ আসন এবং শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী নিয়ে শেরপুর-৩ আসন গঠিত। ১৯৯৬ এবং ২০০৮ সনের নির্বাচনে জেলার ৩টি আসনেই আওয়ামী লীগের করায়ত্ত হয়। বর্তমান এমপিরা হচ্ছেনঃ শেরপুর-১ আসনে আতিউর রহমান আতিক, শেরপুর-২ আসনে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এবং শেরপুর-৩ আসনে প্রকৌশলী ফজলুল হক। শেরপুর-১ আসনে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেনঃ বর্তমান এমপি আতিউর রহমান আতিক, শেরপুর চেম্বার অব কমার্স সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ কিবরিয়া লিটন এবং বাস-কোচ মালিক সমিতির সভাপতি ছানোয়ার হোসেন ছানু। বিএনপি দলীয় জিয়া পরিষদের সভাপতি ও জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি এডভোকেট তৌহিদুর রহমান, শিল্পপতি হজরত আলী ও জেলা বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক আশীষ, ব্যারিস্টার আব্দুল্লাহ। জাতীয় পার্টির জেলা সভাপতি ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ইলিয়াসউদ্দিন। জেপি’র প্রার্থী হিসেবে জেপি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এমপি শাহ রফিকুল বারী চৌধুরীর নাম শোনা যাচ্ছে। আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের অভিমত, মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-১ (সদর) আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী মনোনয়নের চালচিত্র পালটে গেছে। তাদের মতে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের ফলে বিএনপি-জামায়াত জোটের হেভিওয়েট প্রার্থী কামারুজ্জামানের পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেয়া সম্ভব হবে না। এ কারণে বর্তমানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ অনেকটাই ভারমুক্ত। অধিকাংশ সদস্যের ধারণা, প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের প্রার্থী নির্বাচনী বৈতরণী পার হবেন। কিন্তু দলের মধ্যেই এ ব্যাপারে ভিন্নমত রয়েছে। তাদের মতে গত ৩টি নির্বাচনে ৪ দলীয় জোট এ আসনে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানকে প্রার্থী করেছিল। এ কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দল নিরপেক্ষ ভোটাররা বিকল্প যোগ্য প্রার্থী না পেয়ে তারা আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে নেগেটিভ ভোট দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে আতিক সাহেব বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। এছাড়া এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের বিক্ষুব্ধ গ্রুপের কয়েকজনের বক্তব্য, বর্তমান সংসদ সদস্য একইসাথে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হওয়ার ফলে সকল ক্ষমতার অধিকারী। দলে কোন গণতন্ত্রের চর্চা নেই। তার কথাই শেষ কথা। বর্তমান এমপি’র বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। তার জনপ্রিয়তাও যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে। বিদ্রোহী গ্রুপটি শেরপুর সদর আসনে নতুন মুখ আনয়নের সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। শোনা যাচ্ছে তারা জেপি’র প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক এমপি শাহ রফিকুল বারী চৌধুরীকে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে শেরপুর-১ আসনে মনোনয়ন দেয়ার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। শেরপুর সদর আসনে এবার আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জাতীয় পার্টির (এ) জেলা সভাপতি ও শেরপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান মো. ইলিয়াসউদ্দিনের নাম প্রচারিত হচ্ছে। জাতীয় পার্টি প্রধান হোসাইন মো. এরশাদ এ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ইলিয়াসউদ্দিনের নাম ঘোষণা করেছেন। ইতিমধ্যে তিনি জনসংযোগ শুরু করেছেন। এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির এ নেতা জানান, তার দল এককভাবে নির্বাচন করলে তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ অংশগ্রহণকারী সকল দলের প্রার্থীকে পরাজিত করতে পারবেন। তার দলে কোন কোন্দল নেই। শেরপুর জেলায় এক সময় বিএনপি’র শক্ত অবস্থান থাকলেও বর্তমানে দলীয় কোন্দলে দলটি দ্বিধাবিভক্ত। কয়েকমাস আগে জেলা বিএনপি’র সভাপতি এডভোকেট একেএম সাইফুল ইসলাম কালাম মারা যাওয়ার পর দলটির অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দলটির ভারপ্রাপ্ত জেলা সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক আশীষ গ্রুপ ও সহ-সভাপতি সাইফুল ইসলাম স্বপন গ্রুপ নামে দু’ ভাগে বিভক্ত। এক গ্রুপ অন্য গ্রুপকে সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বহিষ্কার করেছে। শহরের প্রাণকেন্দে দলীয় কার্যালয় থাকা সত্ত্বেও সংঘর্ষের আশংকায় কোন গ্রুপই অফিসে বসতে পারে না। স্বপন গ্রুপ ইতিমধ্যেই এডভোকেট তৌহিদুর রহমানকে শেরপুর সদর আসনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। অপরদিকে বিএনপি দলীয় সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও ‘মোটা অংকের দক্ষিণার বিনিময়ে’ আশীষ গ্রুপ ‘রোজবার্গ রাইস মিলের’ স্বত্বাধিকারী শিল্পপতি হজরত আলীকে এ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে বলে স্বপন গ্রুপ সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছে। এ ব্যাপারে আব্দুর রাজ্জাক আশীষ জানান, শিল্পপতি হজরত আলীকে দলের সদস্য পদ দেয়া হয়েছে। তিনি আর্থিক লেনদেনের কথা অস্বীকার করে বলেন, তিনি নিজেসহ দলের অনেকেই আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই তারা কাজ করবেন। তবে বর্তমানে অধিকাংশ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে তাদের দলীয় কর্মসূচিসহ নির্বাচনী কর্মকাণ্ড থেকে নিবৃত্ত রাখার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন। শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী ও নালিতাবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বাদশা, নালিতাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হালিম উকিল, বিএনপি থেকে সাবেক হুইপ মরহুম জাহিদ আলী চৌধুরীর ছেলে ফাহিম চৌধুরী ও সাবেক সচিব ব্যারিস্টার হায়দর আলী এবং জাতীয় পার্টির রুবি সিদ্দিকী ও এডভোকেট আক্কাস আলীর নাম শোনা যাচ্ছে। শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে বর্তমান এমপি প্রকৌশলী ফজলুল হক, জেলা পরিষদ প্রশাসক সাবেক এমপি এডভোকেট আব্দুল হালিম, সাবেক এমপি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খন্দকার মো. খুররম, ঝিনাইগাতী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এএসএম নাঈম ওয়ারেছ ও মো. মহসীনুল হক রুমি, বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক রুবেল, অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাসান মাহমুদ, ঝিনাইগাতী উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বাদশা এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে শ্রীবরদী উপজেলা চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম ফর্সা, খালেদ হাসান তালুকদার কাজল ও আবু নাসের বাদলের নাম শোনা যাচ্ছে। বর্তমান এমপি’র নিষ্ক্রিয়তার কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। ঝিনাইগাতী উপজেলা থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার জোর দাবি উঠেছে। বড় দু’টি দল আওয়ামী লীগ বা বিএনপি’র পক্ষ থেকে এ উপজেলার কোন প্রার্থী বাছাই করা হলে তারা দলমত নির্বিশেষে একযোগে ভোট দেবেন। গত এক বছর ধরে এ লক্ষ্যে একটি সংগঠন জনমত তৈরির কাজ করে আসছে।