জঙ্গিদের টেক্কা প্রযুক্তির সঙ্গে!

প্রযুক্তির সাথে চলতে গিয়েই তাদের অনেক তথ্য ফাঁস হয়ে গেছে। তাদের অবস্থানও গোয়েন্দারা শনাক্ত করেন। যে কোন তথ্য মোবাইল ফোনে আদান-প্রদান করতে গেলেই তা ধরা পড়ে যায় গোয়েন্দাদের হাতে। কম্পিউটারে তথ্য সংরক্ষণ করলে, তা জব্দ হওয়ার পর পুরো তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। এ কারণে এখন জঙ্গি সংগঠনগুলো এ প্রযুক্তি ছাড়া পুরানো আমলের পদ্ধতিতেই তাদের প্রচারণা ও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তারা এখন মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও কম্পিউটার ব্যবহার ছাড়াই নিয়মিত বৈঠক করছে। নিজেদের মধ্যে হাতে লেখা চিঠি আদান-প্রদান করছে। এ চিঠিও সাংকেতিক ভাষায় লেখা। সম্প্রতি বগুড়া থেকে নতুন একটি জঙ্গি সংগঠন বিইএম ও ঢাকার মোহাম্মদপুরের বছিলায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ঘাঁটি থেকে উদ্ধার করা কাগজপত্র পুলিশ ও র্যাবের পদস্থ কর্মকর্তারা পরীক্ষা করে এমনই তথ্য পেয়েছেন। র্যাবের মিডিয়া অ্যান্ড লিগ্যাল শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার হাবিবুর রহমান বলেন, বিইএম নামে যে নতুন জঙ্গি সংগঠনের আবির্ভাব হয়েছে, তাদের প্রচারণা সবই পুরানো আমলের। হাতে লেখা কাগজপত্র সংগঠনের কর্মীদের মধ্যে বিলি করা হয়। ঐসব চিঠি সাংকেতিকভাবে লেখা হয়েছে। এ চিঠি বিলি করা হয় তাদের কর্মীর মাধ্যমে। কোন পোস্ট অফিস বা কুরিয়ার সার্ভিসে এসব চিঠি পাঠানো হয় না। তাদের দলীয় বৈঠকগুলোতে যেসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় তাও হাতে লেখা হয়। এমনকি একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য কোন মোবাইল ফোন ব্যবহার হয় না। তারা নির্দিষ্টস্থানে দেখা করে দলীয় কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে আলোচনা করে। গত ২২ জুলাই বগুড়ার ঠনঠনিয়া এলাকায় বিইএম নামে একটি জঙ্গি সংগঠনের আস্তানা থেকে র্যাব বিপুল পরিমাণ কাগজপত্র উদ্ধার করে। হাতে লেখা সাংগঠনিক দলিলে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ‘ভাই’ বলে সম্মোধন করা হয়। দলিলে কিভাবে সাংগঠনিক মিটিং বাস্তবায়ন করা হবে এমন একটি নির্দেশে বলা হয়েছে, প্রত্যেক ভাইকে আগেই মিটিংয়ের স্থান এবং সময় জানিয়ে দিতে হবে। সেটি পত্র মারফত বা সাক্ষাতের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে কখনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না। এমন বাড়ি বা স্থান নির্ধারণ করতে হবে যার একাধিক প্রবেশপথ রয়েছে এবং ভাইয়েরা ভিন্ন ভিন্ন পথে সেখানে প্রবেশ করতে পারেন। প্রবেশের আগে অবশ্যই নজর রাখতে হবে কেউ তাকে ফলো করছে কি না। এমন পোশাক পরে আসতে হবে, যা ওই স্থান এবং পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সাইকেল-মোটর সাইকেল বা সিএনজি লুকিয়ে রাখতে হবে। অথবা এমন জায়গায় পার্কিং করতে হবে যেখানে সচরাচর মানুষ পার্কিং করে। যদি বেশিসংখ্যক লোক বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা পুলিশ ফাঁড়ির কাছাকাছি হয় তবে বাইরে গার্ড রাখতে হবে। মিটিংয়ে আসার সময় অবশ্যই মোবাইল ফোন রেখে আসতে হবে। অথবা এতোটা দূরত্বে বন্ধ করতে হবে যাতে বোঝা না যায় মিটিংয়ে অংশ নেয়া ব্যক্তি বা মোবাইল সেট কোথায় অবস্থান করছে। কেউ যদি মোবাইল সেট দেয়, তাহলে সেটি নেয়া যাবে না। নিজের মোবাইল সেট পরিচিত কাউকে দেয়া যাবে না। প্রয়োজনে তা পানিতে না ফেলে দিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কারণ মোবাইল সেট দিয়ে শত্রুরা তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। গত ১৩ আগস্ট মোহাম্মদপুরের বছিলায় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান মুফতি জসীমুদ্দিন রাহামানীর আস্তানায় অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ঐ সংগঠনের বিপুল পরিমাণ জঙ্গি বই, লিফলেট ও হাতে লেখা কাগজপত্র উদ্ধার করে। হাতে লেখা কাগজপত্রগুলো পরীক্ষা করে ডিবির একজন কর্মকর্তা জানান, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। সংগঠনের একটি কাগজে লেখা রয়েছে, ‘কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবে না। কারো কাছে মোবাইল ফোন থাকলে অথবা পরিচিত জনদের কেউ তাকে উপহার দিলে তা গোপনে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। শত্রুপক্ষরা তাদের মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং করে নজরদারি করতে পারে।’