উপকূলবাসী চার বছরেও কাটিয়ে উঠতে পারেনি আইলা’র ক্ষতি

এক কন্যা সন্তানের জননী আরিনা খাতুন। আইলা’র এক বছর আগে পাশের গ্রামের মহসীন গাজীর সাথে তার বিয়ে হয়। পরের বছরই ঘটে যায় প্রলয়ঙ্করি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আইলা। যার তান্ডবে গোটা উপকূলীয় এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে যায়। বিরান ভূমিতে পরিণত হয় তার আবাসস্থল শ্যামনগর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরা। কয়েক মাস পানিতে ভেসে থাকে চতুর্দিকে নদী বেষ্টিত গাবুরা। প্রকৃতির নির্মমতায় বসতঘর হারানো আরিনা খাতুন আইলা’র পরের দিনই বাবার বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয়। টানা দু’বছর পিতার পরিবারের সাথে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের উপর দিনাতিপাত করে সে। দু’বছর আগে কোল আলো করে আসা একমাত্র মেয়ে আর স্বামীকে নিয়ে এখন পর্যন্ত আরিনা ফিরতে পারেনি বসত ভিটায়। পিতার চিংড়ি ঘেরের ছোট্ট ঝুপড়ির মধ্যে কাটে তাদের দিনরাত। গৃহ নির্মাণ মঞ্জুরির একুশ হাজার টাকা কয়েক মাস আগে পেলেও বসতভিটায় না ফেরা প্রসংগে আরিনা জানায়, আয় রোজগার নি, তাই আজও ঘর বাঁঁধতি পারিনি। বিশ হাজার টাকা দিয়ে ঘর বাঁধা যায় না-উল্লেখ করে সে জানায়, প্রতিদিনির খাবার জোগাড় করতি গে ঘরের জন্যি পাওয়া টাকা দে জাল ও নৌকা কিনিছি। আরিনার মত এমন অবস্থা উপকূলীয় এলাকার প্রায় প্রতিটি পরিবারের। প্রলয়ংকরি আইলা’র আঘাতের চার বছরেও তারা সে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। স্বাভাবিক হয়নি উপকূলীয় এ জনপদের কয়েক লাখ মানুষের জীবন। বরং কর্মসংস্থানের অভাব আর খাবার পানি ও জ্বালানি সংকটে নিপতিত উপকূলবাসীর জীবনে ভর করেছে আইলা’র সুুদূর প্রসারী প্রভাব। কর্ম সংস্থানের সংকট ঃ আইলা’র অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে গোটা উপকূলীয় এলাকায় তীব্র কর্মসংস্থানের সংকট শুরু হয়েছে। ক্ষেত খামার ও চিংড়ি ঘেরসমূহে কাজের সুযোগ হারিয়ে কৃষি শ্রমিকরা সম্পূর্ণভাবে পাশের নদী আর সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু সেখানেও চরম প্রতিকূলতার সম্মুুখীন হয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দিশাহীনভাবে। পার্শ্বেমারী গ্রামের রফি মোড়লের স্ত্রী মঞ্জুয়ারা বেগম জানায়, চারটে সমর্থ ছেলে রয়েছে। কিন্তু এলাকায় কাজ না থাকায় বাড়িতে ঠিকমত চুলা জ্বলে না। কাজের অভাবে পাশের নদী আর ওপারের সুন্দরবন ভরসা উল্লেখ করে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী ঐ গৃহবধূ বলেন, বনে ডাকাত আর নদীতে কোস্টগার্ড পাহারা দেয়ায় না খেয়ে মরার জোগাড় হয়েছে। জ্বালানির সংকট ঃ আইলা’র কারণে গোটা উপকূলীয় এলাকা জুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট চলছে। আইলা’র তান্ডব আর পরবর্তীতে লবণ পানির আধিপত্যের কাছে পরাস্ত হয়ে গোটা এলাকা বৃক্ষরাজিশূন্য হয়ে পড়েছে। সরেজমিনে গাবুরা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে গোটা কয়েক তালগাছ ছাড়া দৃষ্টিসীমার মধ্যে কোন বৃক্ষের অস্তিত্ব নেই। স্থানীয়রা জানিয়েছে আগে লোকালয়ে বেড়ে ওঠা গাছগাছালি দিয়ে প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষের রান্নার কাজ চললেও এখন অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যার প্রেক্ষিতে স্থানীয়রা অতিমাত্রায় সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় একদিকে যেমন বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে তেমনি দিনে দিনে জ্বালানি সংকট তীব্রতর হচ্ছে। খাবার পানির সংকট ঃ আইলা’র চার বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত খাবার পানির সংকট কাটেনি। বরং বেড়েছে কয়েকগুণ। আইলা পরবর্তী দু’বছর জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বেসরকারি উদ্যোগে আইলা দুর্গতদের জন্য পানি সরবরাহ করলেও আপাতত ঐসব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আইলা’র ধ্বংযজ্ঞে ৩৯৯টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ ৩ শতাধিক মসজিদ, মন্দির সমপূর্ণ ও আংশিকভাবে ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি ১৭৯ কিঃ মিঃ রাস্তা সম্পূর্ণ ও ৯৯ কিঃ মিঃ আংশিক নষ্ট হয়ে যায়। ৪১ টি ব্রীজ ও কালভার্টসহ ১১৭ কিঃ মিঃ বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ নদীতে বিলীন হয়ে যায়। শুধু শ্যামনগরেই ১২৭ কিঃ মিঃ বাঁধের ৯৭ কিঃ মিঃ সমপূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। হাজার হাজার গবাদিপশু আর হাঁসমুরগির করুণ মৃত্যুর পাশাপাশি শুধুমাত্র উপজেলাতেই ১৯৪ হেক্টর ফসলী ক্ষেত ও ৩২ হাজার ৬৬১ একর চিংড়ি চাষের জমি তলিয়ে যায়। সহস্রাধিক নলকূপ ও দুই হাজারেরও বেশি পুকুর-জলাশয় জলমগ্ন হয়ে পড়ায় দুর্দশাগ্রস্ত লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।