সাতক্ষীরার গর্ব যাঁরা

ডা: বিধান চন্দ্র রায়: বিশিষ্ট চিকিত্সক ও রাজনীতিবিদ ডা: বিধান চন্দ্র রায় দেবহাটা উপজেলার টাউনশ্রীপুরে উনিশ শতকের শেষ দিকে জন্মগ্রহণ করেন। বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে তার অবদান অনস্বীকার্য। ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ১৯৬২খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত আমৃত্যু তিনি পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। দীর্ঘকায় এই পুরুষ ছিলেন অকৃতদার। ১৯৬২ সালে তিনি মৃত্যুবরন করেন। সৈয়দ জালাল উদ্দিন হাশমী: ১৮৯৫ সালে তালা উপজেলার তেতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। শিক্ষা গ্রহনের পর তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সে সময় খিলাফাত আন্দোলনে যোগদান করেন এবং কংগ্রেসের জেলা নেতৃত্ব গ্রহন করেন। পওে অবিভক্ত বাংলার আইন পরিষদেও সদস্য এবং ডেপুটি স্পীকার নির্বাচিত হন। তিনি কিছুদিনের জন্য কলকাতা কর্পোরেশনের ডেপুটি মেয়র ছিলেন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে তার ভুমিকা ছিল সর্বাগ্রে। ১৯৪৭ সালে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। সিকান্দার আবু জাফর: বিশিষ্ট সাংবাদিক কথা সাহিত্যিক গীতিকার নাট্যকার ও অনুবাদক সিকান্দার আবু জাফর ১৯১৮ সালে তালা উপজেলার তেতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয় বি ডি ইংরেজী স্কুল হতে প্রবেশিকা পাস করে কলকাতার রিপন কলেজে অধ্যয়ন করেন। কর্মজীবনের শুরুতে ১৯৪৩-১৯৪৫ কাজী নজরুল ইসলামের নবযুগ পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন। কিছুদিন সরকারী চাকুরী করার পর দেশ বিভাগ হলে ১৯৪৮-১৯৫৩ পর্যন্ত তদানিন্তন রেডিও পাকিস্তানে স্টাফ আর্টিস্ট ছিলেন। এসময় তিনি দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদে সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেন। ১৯৫২ সালে দৈনিক মিল্লাতের সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৫৭ সাল থেকে আজীবন দেশের প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র ‘সমকাল’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি ‘অভিযান’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তার রচিত অন্যুন ২৭টি গ্রন্থের মধ্যে প্রসন্ন প্রহর, বাংলা ছাড়, কবিতা গ্রন্থ মাটি আর অশ্রম্ন নতুন সকাল, মাকড়সা মহকবি অলাওল প্রসিদ্ধ। ১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার পি জি হাসপাতালে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী: গল্পকার ঔপন্যাসিক প্রবন্ধকার সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ১৮৯৬ সালে সদর উপজেলার বাঁশদহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের মধ্য ইংরাজি স্কুল হতে বাল্য শিক্ষা শেষ করে নিকটবর্তী বাবুলিয়া উচ্চ ইংরাজি স্কুল হতে বৃত্তি পেয়ে এন্ট্রান্স পাশ করেন। কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে এ ফ এ ক্লাসে ভর্তি হয়েও সাংবাদিকতা ও রাজনীতিতে অংশ নিয়ে পড়াশুনা ত্যাগ করেন। তিনি মাওলানা আকরাম খাঁ পরিচালিত সাপ্তাহিক মোহাম্মাদী পত্রিকায় সম্পাদনা বিভাগে দির্ঘদিন কর্মরত ছিলেন এবং লেখক হিসাবে আত্নপ্রকাশ করেন। তার রচনাবলীর মধ্যে উলেস্নখযোগ্য হচ্ছে স্বর্না নন্দীনি ,মরু্নভাস্কর, শাহনামা, মহামানব মহাসীন ও সিন্দাবাদ হিন্দবাদ। ১৯৬৪ সালে তিনি মারা যান। ডা:এম আর খান: জাতীয় অধ্যাপক ও প্রখ্যাত শিশু বিশেষগ্য বিশিষ্ট সমাজসেবক ডা:এম আর খান ১৯২৮ সালে সদর উপজেলার রসুলপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সাতক্ষীরা পি এন হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা এবং কলিকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এম বি বি এস পাশ করেন। পরে এডিনবার্গ থেকে এম আর সি পি এবং এফ আর সি পিসহ অনেক ডিগ্রী লাভ ও ডিপেস্নামা অর্জন করেন। ইংল্যান্ড আমেরিকার বেশ কয়েকটি হাসপাতালে সিনিয়র হাউস অফিসার হিসাবে কর্মরত ছিলেন। শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সমাজ সেবা মুলক প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি জড়িত। জয়ন্ত চট্রোপধ্যায়: দেশের প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব অভিনেতা সঙ্গীতগ্য অংকনশিল্পী সাংবাদিক ও আবৃত্তিকার জয়ন্ত চট্রোপধ্যায় ১৯৪৬ সালে শ্যামনগর উপজেলার ইশ্বরীপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। নকিপুর হরিচরন হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শেষ বর্েষ পরীক্ষা না দিয়েই রানৈতিক কারনে পাঠ চুকিয়ে দেশে ফিরে আসেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার সময়ে কাজী সব্যসাচী কল্যান হালদার ও শম্ভু মিত্রের সান্যিধ্য লাভ করে অগ্নিবীনার সদস্য হন। তিনি বাংলাদেশে অবৃত্তিকে পৃথক শিল্প মাধ্যম হিসাবে জনপ্রিয় করে তুলতে বলিষ্ঠ ভুমিকা রাখছেন। বর্তমানে দুই বাংলার খ্যাতিমান আবৃত্তিকার ও অভিনেতা হিসাবে পরিচিত। অবৃত্তি ও অভিনয়ের জন্য তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সন্ম্নাননা অর্জন করেন। আফজাল হোসেন : বিশিষ্ট টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অভিনেতা নাট্যকার চিত্রশিল্পী উপস্থাপক টেলি বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্র নির্মাতা ও ঔপন্যাসিক আফজাল হোসেন ১৯৫৪ সালে দেবহাটা উপজেলার পারু্নলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তিনি ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত। তার লেখা বিরহকাল, পারলে না রু্নমকি, কানামাছি উল্লেখযোগ্য। তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় টিভি নাটকে নাম ভুকািয় অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। তারিক আনাম : দেশের বিশিষ্ট অভিনেতা নির্দেশক টেলি বিজ্ঞাপন ও চলচ্চিত্র পরিচালক ও নির্মাতা তারিক আনাম ১৯৫৩ সালে সদর উপজেলার মুনজিতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভারতের ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা থেকে নাটকের ওপর ডিপ্লোমা করেছেন। বর্তমানে দেশের অন্যতম নাট্য সংগঠন নাট্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে বিভিন্ন ভমিকায় অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। খায়রুল বাশার: বিশিষ্ট অভিনেতা নাট্যকার নির্দেশক আবৃত্তিকার চলচ্চিত্র পরিচালক ও নির্মাতা মুক্তিযোদ্ধা খায়রু্নল বাশার ১৯৪৮ সালের ১৩ অক্টোবর সদর উপজেলার আগরদাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তিনি প্রাননাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন উচ্চ শ্রেনীর ছাত্র আজমলুল হক ও শিক্ষক আবুল হোসেন খানের সংস্পর্শে নাট্য ও লেখালেখি বিষয়ে উদ্বুদ্ধ হন। ১৯৬৫ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে লাল প্রান্তর নামে প্রথম নাটক রচনা করেন এবং সাতক্ষীরা প্রগতি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি ভোমরা টাউনশ্রীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। তিনি বৃহত্তর খুলনার প্রথম চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি নাট্যকার অভিনয় ও পচািলক হিসাবে জাতীয় পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও খ্যাতি অর্জন করেন। রায়হান গফুর : দেশের স্বনামধণ্য অভিনেতা নাট্যকার অবৃত্তিকার ও উপস্থাপক রায়হান গফুর শ্যামনগর উপজেলার পাতাখালি গ্রামে জন্মগ্রহন করেন।ঘাটের দশকে সাতক্ষীরা মহাকুমার প্রগতিশীল কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে কলেস্নাল নাট্য সংঘ গড়ে তোলেন। তিনি মঞ্চ নাটক ও চলচ্চিত্রে ও টেলিভিশনে অভিনয় ও উপস্থাপনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। সাবিনা ইয়াসমিন : জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন ১৯৫৪ সালে সদর উপজেলার মুকুন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। চলচ্চিত্র পেস্নব্যাক দেশাত্ববোধক আধুনিক লোকসঙ্গীতসহ বিভিন্ন ধরনের গানের অডিও এ্যালবামের প্রায় দশ হাজার গানের বাণীবদ্ধ করেছেন। তিনি জাতীয় পুরস্কার বাচসাস জহির রায়হান পুরস্কার ২১ পদক ও স্বাধীনতা পদকে ভুষিত হয়েছেন। সাতক্ষীরার এই কৃতি সঙ্গীত শিল্পী জীবনের শুরু্ন থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ১০ বার বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ শিল্পী হয়েছেন। আতাউর রহমান খান: বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার খ্যাতিমান অভিনেতা ও সঙ্গীত পরিরচালক আতাউর রহমান খান সাতক্ষীরা শহরে জন্মগ্রহন করেন। তিনি বিশ্বভারতী ফিল্ম কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা ও দু:খে যাদেও জীবন গড়া চলচ্চিতের সহকারী পরিচালক ছিলেন। নিলুফার ইয়াসমিন: দেশের প্রখ্যাত উচ্চাঙ্গ ও সাধারন সঙ্গীত শিল্পী নিলুফার ইয়াসমিন ১৯৪৮ সালে সদর উপজেলার মুকুন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। ১৯৬৫ সালে বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার খ্যাতিমান অভিনেতা ও সঙ্গীত পরিরচালক আতাউর রহমান খানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শুভদা সুজন সখী ছবিতে পেস্নব্যাক কওে তিনি বাচসাস পুরস্কার পান। ২০০৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীত বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়া সাংবাদিক তোহা খান, আবেদ খান ফৌজিয়া খান, রানি সরকার ফাল্গুনি হামিদ, রিজিয়া রিজভি সাতক্ষীরার কৃতি সন্তান।