সাপের গ্রাম!

সাপের গ্রাম! নাম শুনলেই গা ছমছম করে ওঠে। ওই গ্রামে পা রেখেই শুনতে পাই সাপের ফোঁস-ফোঁসানী শব্দ। সারা শরীর শিউরে ওঠে ভয়ে। আজব এ গ্রাম, সাপের সাথে বসবাস মানুষের। গ্রামটির অবস্থান রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমে রামনাথপুর ইউনিয়নের খোর্দবাগবাড় মিশনপাড়ায়। কিন্তু গোটা তল্লাটে সাপের গ্রাম নামেই পরিচিত এ গ্রামটি। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত এ গ্রামের সব মানুষ ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান। প্রায় আড়াইশ’ বছর ধরে বাপ দাদার এ পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছে তারা। বর্তমানে এ গ্রামে ৭০টি পরিবারের প্রায় ৩০০ জন বসবাস করে। উত্তরে-দক্ষিণে লম্বালম্বি গ্রামটিতে সবাই বসবাস করে মাটির তৈরি কুঁড়ে ঘরে। বাইরের কেউ ভয়ে এ গ্রামে ঢোকার সাহস পায় না। ঘরে ঘরে সাপের সাথে নারী-পুরুষের সহাবস্থান। সেখানে আছে কাঠের বাক্স বন্দি গোখরা, মাছুয়াআলাদ, দুধরাজ, লাউডগা, দারাজসহ নানা জাতের বিষধর সব সাপ। গ্রামের মানুষ সাপের সাথেই বসবাস করে অভ্যস্ত। নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু- কেউ সাপকে ভয় করে না। সাপ ধরে বিক্রি করেই এদের সংসার চলে। জীবন বাজি রেখে এরা এ কাজ করে যাচ্ছে দিনের পর দিন। হতশ্রী এ পল্লীর মানুষ সেই বৃটিশ আমল থেকে সাপ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে। তবে এখন আর আগের মত পর্যাপ্ত সাপ পাওয়া যায় না। যে কারণে অভাব এদের নিত্য সঙ্গী। কিন্তু এ পেশা ছেড়েও দিতে পারছেন না তারা। তবে কেউ কেউ উপায়ন্তর না দেখে দিনমজুরের কাজ শুরু করেছেন। হঠাত্ করে কোথাও থেকে সাপ ধরার ডাক আসলে গ্রামের লোকজন ছুটে যায়। চুক্তির বিনিমিয়ে এরা সাপ ধরে আনে। বিনিময়ে পায় কিছু নগদ অর্থ। এভাবেই কোনরকমে চলছে পরিবার-পরিজন নিয়ে তাদের সংসার। গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি নগেশ্বরী রাউথ (৯৫) বলেন, বনে জঙ্গলে সাপের চলার চিহ্ন দেখে বুঝতে পারি সাপ আছে কিনা। গর্ত খুঁড়ে সাপ বের করে আনি। অনেক সময় ৩-৪ দিন বনবাদাড়ে ঘুরেও সাপের দেখা মেলে না। হতাশ হয়ে ফিরে আসি। তবুও পেশা ছাড়তে পারি না। সাহা রাউথ (৪৫) বলেন, সাপ ধরতে কোন মন্ত্র লাগে না। সাপ ধরা একটা কৌশল। তবে সাপ ধরার সময় ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি যেন কোন বিপদ না হয়। গৃহবধূ মিসরী রাউথ বলেন, বাড়ির পুরুষেরা সাপ ধরতে গেলে আতংকে থাকি। স্বামী-সন্তানেরা যেন সাপ ধরে ভালোভাবে বাড়ি ফিরে আসে সেই প্রার্থনাই করি। তবে আমরা সাপে কাটার রোগীর চিকিত্সা করি না। তাবিজ বিক্রি করি না। রামরশি রাউথ (৯৫) বলেন, সাপুড়েরা এসে এ গ্রাম থেকে সাপ কিনে নিয়ে যায়। সাভারের বক্তারপুর এলাকা থেকে মহাজনরা এসে একসাথে অনেক সাপ কিনে নেয়। প্রতিটি সাপ ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে ইদানিং সাপ বিক্রি কমে যাওয়ায় তিনি অভাবের মধ্যে আছেন। রাজদেও রাউথ (৭৫) অভিযোগ করে বলেন, আমাদের খোঁজ-খবর কেউ নেয় না। এমনকি চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও তাদের গ্রামটির দিকে দৃষ্টি দেন না। এ ব্যাপারে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম জানান, ঐ গ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। সরকারি কোন সাহায্য থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয় না।