পদ্মা ফুঁসছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে বন্যা, মাওয়ায় তীব্র ভাঙন
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫১
পদ্মা ও মহানন্দা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নদীর উপচেপড়া পানিতে তলিয়ে গেছে সদর উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন। দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছে এসব ইউনিয়নের ৫ হাজারেরও বেশি পরিবার। অন্যদিকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এছাড়া পদ্মার অব্যাহত ভাঙ্গনে বুধবার বিকালে মাওয়ার আরও একটি অংশ বিলীন হয়ে গেছে। নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে দেখা গেছে শত শত পরিবারকে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হঠাত্ এই বন্যায় সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা, শাহজাহানপুর, আলাতুলি, নারায়ণপুর, সুন্দরপুর, দেবীনগর, চরঅনুপনগর ও ইসলামপুর ইউনিয়ন তলিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আলাতুলি ইউনিয়নের। এই ইউনিয়নের ৯৮৭টি ঘরবাড়ি, ৩টি মাদ্রাসা, ২টি প্রাইমারি স্কুল ও ১৬ কি.মি রাস্তা নদীতে বিলীন হয়েছে। হতদরিদ্র ২৫টি পরিবারকে কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ড. চিত্রলেখা নাজনীন। তাদের মাঝে শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জ্বালানি সরবরাহের দাবি উঠেছে।
জানা গেছে, জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা এবং সদর উপজেলায় পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে ৬ সে.মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অপরদিকে মহানন্দা প্রবাহিত হচ্ছে ১৩ সে.মিটার উপর দিয়ে।
সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা খায়রুল আনাম জানান, এই ৮টি ইউনিয়নে বন্যায় সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির সংখ্যা ২ হাজার ২৪৭টি এবং আংশিক ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার ৮০৬টি পরিবারের। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে হস্তচালিত নলকূপ উঁচুকরণের কাজ শুরু করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে ২৫ মে.টন চাল বিতরণ করা হয়েছে।
গোদাগাড়ী (রাজশাহী) সংবাদদাতা জানান, গোদাগাড়ীতে পদ্মা নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অস্বাভাবিকভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকালে পদ্মা নদীতে বিপদসীমার ৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বলেন, গতকাল পর্যন্ত চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের ২০ টি গ্রামের ৪ হাজার পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। আর ১ হাজার পরিবারের বাড়ি-ঘর বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় এসব পরিবারের লোকজন উঁচু এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বন্যা দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানি, পশুখাদ্য সংকট দেখা দেয়ায় মানুষের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস.এম. তুহিনুর আলম বলেন, তিনি নিজেই বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে বন্যা দুর্গতদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন। ইতিমধ্যেই চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের জন্য ৪ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বরাদ্দকৃত চাল আগামী শুক্রবার বন্যা দুর্গতদের মাঝে বিতরণ করা হবে।
এদিকে উপজেলার বাসুদেবপুর, মাটিকাটা ও দেওপাড়া ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হওয়ায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, রাক্ষুসী পদ্মার ভাঙনে গত ৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে মাওয়ায় অন্তত ১৫টি বসতবাড়ি ও ৭টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অর্ধশতাধিক স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়েছে। এ সময় একটি মসজিদের অবশিষ্ট অংশ ও একটি মাজারও পদ্মা গর্ভে চলে যায়। নদী পাড়ের আতঙ্কিত লোকজন এখন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘরসহ স্থাপনা সরিয়ে নিচ্ছেন। গত শনিবার বিকালে আকস্মিক পুরাতন ফেরিঘাট এলাকার ভাঙ্গন ও অসংখ্য ফাঁটল দেখা দেয়। এতে মাওয়া পুরাতন ৩ নং রো রো ফেরিঘাট ও ২নং ফেরিঘাট এলাকায় নদী ভাঙন ছড়িয়ে পড়ে।
সেতু কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে বিআইডব্লিউটিএ মাওয়ায় ভাঙন রোধক বাঁধ তৈরি করছে। কিন্তু ভাঙনরোধে এটি কাজে আসছে না। বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান ড. খন্দকার সামসুদ্দোহা জানান, মাওয়ায় প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ে নদী ভাঙ্গন প্রকল্পটির ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে বাকি ৩০ শতাংশ কাজ শুরু হবে। তিনি বলেন, যে এলাকায় এখন নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে প্রকল্পটি সেই এলাকায় নয় বলে তিনি জানান।
মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রহুল আমিন জানান, মাওয়ায় বিআইডব্লিউটিএ যে বাঁধ নির্মাণ করেছে তার সামান্য পূর্ব দিকে এই ভয়াবহ ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এই বাঁধ নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে কোন সমন্বয় করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এদিকে এখনো নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে এখানকার অর্ধসহস্রাধিক পরিবার। মঙ্গলবার দুপুরে এখানে ক্ষণিকের প্রবল বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়া দেখা দেয়ায় মাওয়া ফেরিঘাট এলাকায় নতুন করে আবারো ভাঙন আতঙ্ক দেখা দেয়। ফেরিঘাট এলাকার মূল সড়কে রয়েছে আরো একটি ফাটল। ফাটলটি ধসে পদ্মা গর্ভে চলে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মঙ্গলবার সেখানে লাল নিশানা টাঙ্গানো ছাড়া ভাঙনরোধের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
কীর্তনখোলার এক তীরে ভাঙন অপর তীরে নাব্য সংকট
বরিশাল অফিস জানায়, নগর সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীর একপ্রান্তে ভয়াবহ ভাঙন ও অপর প্রান্তে পলি পরে নাব্য সংকটের কারণে চরম দুর্ভোগ পড়েছেন লঞ্চযাত্রীরা। নদী ভাঙনে চরকাউয়া ফেরিঘাট ও খেয়াঘাটসহ বাজারের বিশাল একটি অংশ ইতিমধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে। একই সময় ভরাট হয়ে যাওয়ায় পশ্চিম তীরের লঞ্চঘাটটি নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে বর্ষা মৌসুমেও এ ঘাট থেকে নৌযান চলাচল করতে পারছে না। ফেরি চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে মারাত্মক ভাবে। প্রায়ই যানবাহন নিয়ে ফেরিগুলো মাঝ নদীতে আটকা পড়ছে।
গতকাল বুধবার ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে আসা এমভি সুন্দরবন ঘাটে নোঙর করতে প্রায় এক ঘন্টা সময় লেগেছে। নাব্য সংকটের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে লঞ্চ মালিক ও বরিশাল চেম্বার অব কর্মাসের সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু জানান। একই দুর্ভোগের শিকার হতে হয়েছে এমভি সুরভীকে। এ লঞ্চের মালিক রিয়াজ উল কবির ইত্তেফাককে জানান, নৌ- বন্দরের ড্রেজিংয়ের জন্য লঞ্চ মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বিআইডব্লিউটিএ কে পত্র দেয়া হয়েছে।
বরিশাল বিআইডব্লিটিএর নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আশরাফ হোসেন বলেন, এ সমস্যা সমাধানে ড্রেজিং করে যে পরিমাণের পলি অপসারণ করতে হবে তাতে বড় আকারের বরাদ্দ দরকার। সংস্থার পক্ষ থেকে খুব শিঘ্রই ড্রেজিংয়ের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে তিনি জানান।