বিশ্বব্যাংকের পরামর্শেই কোম্পানি, তারাই বলছে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২৩:০১
দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃংখলা আনতে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের পরামর্শ মানার পরও পরিস্থিতির ক্রমাবনতি ঘটেছে। অথচ সেই বিশ্বব্যাংকই আবার এখন বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো দেশ ও দেশের বাইরে আস্থা হারিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলেছেন, বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর এ ধরনের স্ববিরোধী বক্তব্য প্রমাণ করে যে, সংস্থাগুলো আসলে সমস্যার মূলে প্রবেশ করতে পারে না। সে কারণে তাদের দেয়া প্রেসক্রিপশনে বরং ক্ষতিই ডেকে আনছে।
ব্যাংকিং সূত্রগুলো জানিয়েছে, ওসব উন্নয়নসহযোগী সংস্থার সিদ্ধান্ত বিপর্যয় ডেকে আনলেও তাদের সুপারিশ প্রণয়ন অব্যাহত রয়েছে। একশ্রেণির নীতি-নির্ধারক তাদের এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে। অথচ তাদের সুপারিশ বাংলাদেশের জন্য মোটেই লাগসই হয়নি।
সূত্র মতে, বিশ্বব্যাংকের চাপে সরকার ব্যাংকিং খাতে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করে। এর আওতায় নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়। অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে ব্যাংক সংস্কারে কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে কোম্পানিতে রূপান্তরের জন্য উপযোগী করতে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানও নিয়োগ দেয়া হয়। এসব পরামর্শক বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে যান। তাদের পরামর্শে ব্যাংকগুলোর অবস্থার মোটেও উন্নতি হয়নি।
আর এখন বিশ্বব্যাংকই বলছে, বিদ্যমান অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এ ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকটে পড়বে। বিদেশি ব্যাংক এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণপত্র গ্রহণে আপত্তি জানাতে পারে বলেও আশংকা প্রকাশ করা হয় সংস্থাটির পক্ষ থেকে। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. আসলাম আলমকে লিখিত এক চিঠিতে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর যোহানেস জাট এসব আশংকার কথা তুলে ধরেন। সূত্রগুলো বলেছে, এটাও বিশ্বব্যাংকের নতুন কোন পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। তাদের পরামর্শে চালানোর পর এ ধরনের পরিস্থিতি কেন হয় সে প্রশ্ন করাই বরং শ্রেয়।
ব্যাংকগুলো বর্তমানে খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত। খেলাপি ঋণের প্রভিশন ঘাটতি মেটাতে গিয়ে মূলধন ঘাটতিও বেড়েছে। মূলধন ঘাটতির কারণে বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে ব্যাংকগুলো। ২০১৩ সালের জুনভিত্তিক আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি ‘ক্যামেলস রেটিং’-এ চার ব্যাংকের সম্পদ বা ঋণের গুণগত মান অসন্তোষজনক বলে মন্তব্য করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে, রাষ্ট্রায়ত্ত চারটি ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি ৯ হাজার ৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের ৪ হাজার ৫৪৪ কোটি, জনতা ব্যাংকের ১ হাজার ৬২৩ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ২ হাজার ৪৮১ কোটি ও রূপালী ব্যাংকের ৪১৪ কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করার সময় প্রত্যাশা ছিল এসব ব্যাংকের লোকসানি শাখা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। অথচ তা হয়নি। বরং বেড়ে যাচ্ছে। মার্চভিত্তিক বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, চার ব্যাংকে লোকসানি শাখা ২৪৯টি। অথচ ২০১২ সাল শেষে লোকসানি শাখা ছিল ১৮২টি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকও মনে করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে মূলধন যোগানো জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি এমনই পরিস্থিতি হয় তাহলে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ মেনে কি ফল হলো?
প্রসঙ্গত, রূপালী ব্যাংক কোম্পানি হিসাবে পরিচালিত হয়ে আসছে ১৯৮৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে। আর সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংককে কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয় ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর।