হজ্বযাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা

হজ্ব ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম। দৈহিক, আর্থিক ও রাস্তার নিরাপত্তার দিক থেকে সক্ষম প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর জীবনে একবার হজ্ব করা ফরজ। আল্লাহতাআলা বলেছেন, “মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ্ব করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য” (সূরা আল ইমরান, আয়াত ৯৭)। এ ছাড়া আল-কুরআনের অনেক আয়াতে এবং বহু হাদীসে নববীতে মানাসেখে হজ্ব বা হজ্বের হুকুম আহকাম বর্ণিত হয়েছে। একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে বিশুদ্ধ নিয়তে ফরজ, ওয়াজিবসহ যাবতীয় হুকুম আহকাম আদায়ের মাধ্যমে “হজ্বে মাবরূর” বা কবুল হজ্ব অর্জন করা যায়। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে “হজ্বে মাবরূর এর প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত” বুখারী, হাদীস নং ১৬১৫)। যারা হজ্বে যাচ্ছেন তাদেরকে চার দিন আগে ঢাকাস্থ আশকোনা হাজী ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হবে। এই রিপোর্টিংয়ের তারিখ ও নিয়মাবলী ইতোমধ্যে হজ্বযাত্রীদের নিকট হজ্ব অফিস কর্তৃক প্রেরিত “অনুমতিপত্রে” লিখিত আছে। বাড়ী হতে রওয়ানা হওয়ার সময় সঙ্গে আনতে হবে হজ্বে যাওয়ার অনুমতিপত্র, ব্যাংকে টাকা জমা দেয়ার ডুপ্লিকেট রিসিপ্ট, মেডিক্যাল রিপোর্ট, দুই সেট ইহরামের কাপড় ও প্রয়োজনীয় পরিধেয় বস্ত্র, আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র। তবে মহিলাদের ক্ষেত্রে ইহরামের পৃথক কোন কাপড় নেই। হজ্বযাত্রিগণ ৮ জিলহজ্ব সকালে ফজরের নামাজ পড়ে অথবা প্রয়োজনে ৭ জিলহজ্ব রাতে এশার নামাজ পড়ে হজ্বের প্রথম ফরজ ইহরামের নিয়ত করে মুখে বলুন ‘লাব্বায়েকা হাজ্জান’। এরপর বেশি করে পড়তে থাকুন তালবিয়া তথা “লাব্বায়েকা আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক, লাব্বায়েকা লা-শারীকা লাকা লাব্বায়েক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্নি’য়ামাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা-শারীকা লাক” (বুখারী, হাদীস নং ৫৪৬০)। তালবিয়াকে হাদীসের ভাষায় হজ্বের শ্লোগান বলা হয়েছে (ইবনে খুজায়মা হাদীস নং ২৬২৮)। মক্কা হতে মিনা মুআল্লিম প্রদত্ত বাসযোগে যেতে হবে এবং সেই বাস মিনায় আপনাদের জন্য নির্ধারিত তাঁবুতেই পৌঁছে দিবে। অবশ্য মক্কা হতে মিনা খুব দূরে নয়, পাঁচ কিলোমিটারের মত দূরত্ব, হেঁটেও যাওয়া যায়। কিন্তু হেঁটে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না তাতে তাঁবু খুঁজে নাও বের করতে পারেন। সাথে এহরামের এক সেট কাপড়, কিছু হালকা কাপড়-চোপড় পরার জন্য, শুকনো খাবার, ভাঁজ করা একটা পাটি, একখানা চাদর নিয়ে নেবেন। মিনায় একদিনের মত প্রথম পর্যায়ে এরপর হজ্বের দিতীয় ফরজ আদায় করার জন্য আরাফায় রওয়ানা হবেন। হজ্বের দ্বিতীয় ফরজ ওকুফে আরাফা তথা আরাফায় অবস্থান করার জন্য ৯ জিলহজ্ব ফজরের নামাজ আদায় করার পর অথবা প্রয়োজনবোধে ৮ জিলহজ্ব রাতে এশার নামাজের পর মুআল্লিম সরবরাহকৃত বাসযোগে মিনা হতে আরাফা যাবেন। আরাফায় নির্ধারিত তাবুতে উঠে সামান্য বিশ্রামের পর সম্ভব হলে গোসল করে অথবা ওযু করে যোহরের নামাজের প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন। যোহরের নামাজ আদায় যদি মসজিদে নামিরার জামায়াতে আদায় করেন তবে এক আযান ও দুই একামতে যোহর ও আসরের নামাজ কসর তথা দুই রাকায়াত করে একসঙ্গে আদায় করবেন। এই দুই ওয়াক্ত যোহর আসরের নামাজ একত্রে পড়ার মাঝখানে অন্য কোন নামাজ পড়া যাবে না এবং নবী করীম (স.) ও এভাবেই আদায় করেছিলেন (মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮)। তবে যারা মসজিদে নামিরায় যেতে না পারেন তারা আরাফার এই দিনের যোহর আসরের নামাজ আদায়কে বিশেষ বিবেচনায় এবং নবী (স.) এর এক্ষেত্রে গৃহীত সুন্নাত সরাসরি আমল করার লক্ষ্যে তাবুতে বসেও কসরের সাথে যোহর ও আসর একত্রে পড়া বাঞ্ছনীয়। এরপর মুআল্লিম প্রদত্ত হাদিয়া হিসাবে দুপুরের খাবার গ্রহণ করে সামান্য বিশ্রামের পর সেখানে পছন্দমত স্থানে কেবলামুখী হয়ে ওকুফে আরাফা তথা আরাফায় অবস্থানের ফরজ কাজ শুরু করতে হবে। নিজের ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়কৃত সকল গুণাহ মাফ চেয়ে তওবা করে নিজেকে এমনভাবে আল্লাহর দরবারে সঁপে দিতে হবে যেন আল্লাহতায়ালা সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিয়ে সদ্য ভূমিষ্ট সন্তানের ন্যায় নিষ্পাপ করে দেন। হাদীসে এসেছে আরাফার দিনে উত্তম দোয়া হচ্ছে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লাশারীকালাহ; লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদীর।” এই ওকুফ বা আরাফার ময়দানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করবেন। সূর্যাস্তের পর এইদিন মাগরিবের নামাজ আরাফায় আদায় করা যাবে না। বরং মুজদালীফায় গিয়ে এশা ও মাগরিবের নামাজ একসাথে পড়তে হবে। অবশ্য যারা ৯ জিলহজ্ব দিনের বেলায় আরাফায় ওকুফ হতে পারেননি তারা ৯ যিলহজ্ব রাতের মধ্যে যেকোন অংশে কিছুক্ষণ ওকুফ করলে তা আদায় হবে। মনে রাখবেন ৯ জিলহজ্ব সূর্যাস্তের পূর্বে কোন অবস্থায় আরাফার ময়দান ত্যাগ করা যাবে না। সূর্যাস্তের পর ত্যাগ করতে হবে। আর ওকুফ করতে হবে আরাফার চিহ্নিত ময়দানে। বাইরে করলে ওকুফ হবে না। মুজদালীফায় গমন এবং সেখানে রাত যাপন: মুজদালীফার ময়দানে ৯ যিলহজ্ব খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন হজ্বের একটি অন্যতম ওয়াজিব। আরাফা হতে মাগরিবের নামাজ আদায় না করে মুজদালীফায় এসে এশা মাগরিব এক সাথে আদায় করতে হবে। এরপর খাওয়া-দাওয়াসহ অন্যান্য কাজ সেরে সুবহে সাদিক পর্যন্ত খোলা আকাশের নিচে শুয়ে ঘুমানো উত্তম। রসূলুল্লাহ (স.) তাই করেছেন (বুখারী, মুসলিম)। অত:পর ফজরের আউয়াল ওয়াক্তেই নামাজ আদায় করে কিছুক্ষণের জন্য মুজদালীফার মূল ওয়াজিব ওকুফে মুজদালীফা তথা মুজদালীফার অবস্থানকরত: আল্লাহর কাছে তওবা করে নিজের গুনাহের মাফ চাইতে হবে। এরপর সূর্যোদয়ের পূর্বেই আবার মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হতে হবে (মুসলিম ও বুখারী হাদীস নং ১৫৬৪)। ওকুফে মুজদালীফা চলাকালে জামারাতে নিক্ষেপের জন্য অনূর্ধ্ব ৭০টি পাথর কুড়িয়ে নেয়া উত্তম। এরপর মুজদালীফা হতে আবার মিনার তাবুতে ফিরে যেতে হবে। এ সময় রাস্তায় ভিড়ের কারণে মুআল্লিমের গাড়ি পাওয়া সম্ভব হয় না। ১০ যিলহজ্ব মিনার তাঁবুতে ফেরার পর প্রথম কাজ হলো শুধু বড় জামারায় ৭টি পাথর নিক্ষেপ। ঐদিন দুপুরের পূর্বে পাথর নিক্ষেপ সুন্নাত। তবে ওজরের কারণে দুপুরের পর এমন কি সারারাত নিক্ষেপ করা যায়। বড় জামারায় পাথর মারার পূর্ব মুহূর্তে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করতে হবে। এরপর কিরান ও তামাত্তু হজ্ব আদায়কারিগণ কুরবানি করবেন। কুরবানির বাজারে গিয়ে পশু কিনে নিজ হাতে কুরবানি করা উত্তম। না পারলে ব্যাংকের মাধ্যমে করবেন। সাবধান! কোন দালালের মাধ্যমে কুরবানি করাবেন না। তাতে প্রতারিত হওয়ার আশংকা থাকে। মনে রাখবেন কুরবানি করা ওয়াজিব। তবে ইফরাদ হজ্বকারীর ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব নয়। এরপরের কাজ হলো মাথা মুন্ডানো বা চুল ছোট করার মাধ্যমে ইহরাম খুলে হালাল হয়ে স্বাভাবিক জীবনে এবং স্বাভাবিক পোশাকে ফিরে আসা। এ কাজটি ১০ যিলহজ্ব সেরে নেয়াই উত্তম। সম্ভব না হলে ১২ যিলহজ্ব মতান্তরে ১৩ যিলহজ্ব সূর্যাস্তের পূর্বে করতে হবে।