হজ্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:২৫
হজ্বের সাথে মানব জাতির তিনটি মাইল ফলকের গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। মানব জাতির পিতা হযরত আদম (আ.) বেহেশ্ত থেকে দুনিয়ায় নেমে আসার পর ৩শ’ বছর হযরত হাওয়া (আ.) থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। এরপর তাঁদের মিলন ঘটেছিলো আরাফাতের ময়দানে অবস্থিত জাবালে রহমাতে। পরবর্তী পর্যায়ে এই পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়েই মহানবী (স.) লক্ষাধিক সাহাবীর সামনে বিদায় হজ্বের বিখ্যাত ভাষণ প্রদান করেন। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে হজ্বের বিভিন্ন ওয়াজিব আর সুন্নতের মধ্যে। হযরত ইব্রাহীম (আ.) তাঁর শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.) ও স্ত্রী হযরত হাজেরা (আ.)- কে মক্কার মরু প্রান্তর বায়তুল্লাহ্র পাশে রেখে যান। সেখানে ইসমাইল (আ.) পানির জন্য ছট্ফট্ করতে থাকলে তাঁর পায়ের নিকট থেকে যমযম পানির শ্রোতধারা প্রবাহিত হতে থাকে। সেটাই এখনও আবে যমযম হিসেবে প্রবাহমান। তাওয়াফের পর যমযমের পানি পান অন্যতম সুন্নত হিসেবে হাজিগণ আমল করে থাকেন। একইভাবে সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ একটি অন্যতম ওয়াজিব। ইসমাইল (আ.) পানির জন্য ছট্ফট্ করছিলেন আর তাঁর মা হযরত হাজেরা (আ.) তখন আল্লাহ্র কাছে দু’আ চাইতে চাইতে সাফা আর মারওয়া পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে ছুটাছুটি করছিলেন। সেটাই হাজি সাহেবদের আমল করতে হয়। যে স্থনটুকু থেকে বিবি হাজেরা (আ.) শিশু ইসমাইলকে দেখতে পাচ্ছিলেন না সে স্থনটা তিনি দ্রুত দৌড়ে পার হচ্ছিলেন। ঐ স্থানটাতে এখনও হাজি সাহেবদের দৌড়ে পার হতে হয়। হাজি সাহেবদের বোঝার সুবিধার্থে বর্তমানে সবুজ আলো দিয়ে স্থানটাকে চিহ্নিত করা রয়েছে।
পুত্র ইসমাইল (আ.) একটু বড় হলে হযরত ইব্রাহীম (আ.) পুনরায় আল্লাহ্র পরীক্ষার সম্মুখীন হন এবং তাঁকে নিয়ে আল্লাহ্ উদ্দেশ্য কুরবানি দেয়ার জন্য মিনার পথ দিয়ে যখন তিনি যাচ্ছিলেন তখন শয়তান ইসমাইল (আ.)- কে বারবার বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছিলো। শয়তান তিনটি স্থানে হযরত ইসমাইল (আ.)-কে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করলে তিনটি স্থানে হযরত ইসমাইল (আ.) পাথর নিক্ষেপ করে শয়তানকে তাড়িয়ে দেন। জামারাতের ঐ তিন স্থানে হাজি সাহেবদের পাথর নিক্ষেপ করা অন্যতম ওয়াজিব। হজ্বের অপর ওয়াজিব কুরবানি করাও ইব্রাহীম (আ.)-এরই সুন্নত। হযরত ইসমাইল (আ.) যখন আরও একটু বড় হলেন হযরত ইব্রাহীম (আ.) তখন তাঁকে নিয়ে বায়তুল্লাহ্ শরীফ মেরামতের কাজ সমাধা করেন। মেরামতের সময় তিনি যে পাথরের ওপর পা রেখে ওপরের কাজ করতেন সেটাই এখন মাকামে ইব্রাহীম হিসেবে পরিচিত। কথিত আছে পাথরটি তখন লিফেটর মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওপরে ওঠা-নামা করতো। মাকামে ইব্রাহীমে এখনও হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর পায়ের ছাপ বিদ্যমান রয়েছে। তাওয়াফ শেষ করে এর সামনে দাঁড়িয়ে ওয়াজিবুত তাওয়াফ নামায আদায় করতে হয়। এভাবে হযরত আদম (আ.) ও হযরত ইব্রাহীম (আ.)-এর স্মৃতি বিজড়িত ঐ সকল স্থানে নবীকূল শিরোমনী হযরত মুহাম্মদ (স.) যেভাবে হজ্বব্রত পালন করে গেছেন বর্তমান হাজি সাহেবদেরও সেই অবস্থায় সেই পথ অনুসরণ করে হজ্ব পালন করতে হয়। তাই হজ্বের সাথে গুরুত্বপূর্ণ নবী ও রসূল (আ.)-গণের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে ওতপ্রোতভাবে। হজ্বের সময় আরও যে সকল স্থানের সাথে পরিচয় ঘটবে তার অনেকগুলোই আমরা পবিত্র কুরআন ও হাদীসের পাতায় বর্ণিত ইতিহাস থেকে পাই। নবী করিম (স.)-এর জন্মস্থান অর্থাত্ মা আমিনার ঘর, জাবালে নূর, যে পাহাড়ের হেরা গুহায় বসে মহানবী (স.) ওহীপ্রাপ্ত হলেন; জাবালে সউর, যেখানে মদীনায় হিজরতের সময় মহানবী (স.) হযরত আবু বকর (রা.)-সহ আত্মগোপন করেছিলেন এবং সাপ হযরত আবু বকর (রা.)-কে কামড় দিয়েছিলো; জাবালে রহমত, যেখানে দাঁড়িয়ে মহানবী (স.) বিদায় হজ্বের ভাষণ দিয়েছিলেন; জাবালে আবু কোবায়েস, যেখানে দাঁড়িয়ে নবী (স.) চাঁদকে দ্বিখন্ডিত করেছিলেন। এছাড়াও রয়েছে জান্নাতুল মোয়াল্লা, যেখানে নবীপত্নী হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.)-সহ অসংখ্য সাহাবা (রা.) চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন; আছে ইসলামের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র দারুল আরকান, মসজিদে বেলাল, মসজিদে আয়শা, মক্কা-মদীনার পথ ইত্যাদি। এসব স্থানের সাথে জড়িয়ে রয়েছে মহানবী (স.)-এর পবিত্র স্মৃতিমাখা গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যসমূহ।