বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ

করিম রহিম জব্বার অথবা যদু মধু রাম শাম, যেকোনো একটি নাম হলেই চলবে। যদি করিমই মনে করি, তাহলে করিম একজন শিল্পপতি। যে পূর্বে ছিল একজন আমলা। তারও পূর্বে ছিল বিখ্যাত কোনো এনজিওর পরিবেশ বিষয়ক গবেষক। করিম নির্বাচন করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। করিম জেনেছে, দেশে কিছু দোদুল্যমান ভোটার আছে যারা একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীর কথাবার্তার ওপর নির্ভরশীল। করিম বলে, এসব বুদ্ধিজীবীর মতামতটা আবার পুরুষের বিশেষ অঙ্গের মতো দোদুল্যমান। এটাকে শক্তভাবে দাঁড় করাতে হলে বুদ্ধির দরকার। বুদ্ধিটাকে শিল্পপতি করিম বলে ফর্মুলা। করিম একটি ফর্মুলা গ্রহণ করেছে। ফর্মুলার সামান্য অংশ : আগামী যেকোনো দিন বিখ্যাত কোনো আর্টগ্যালারিতে চিত্র প্রতিযোগিতার (প্রদর্শনীর) আয়োজন করা হবে। প্রদর্শনীর শর্তসমূহ : ১. যেকোনো বয়সের চিত্রশিল্পী এতে অংশ গ্রহণ করতে পারবে। ২. চিত্রশিল্পীদের অ্যাকাডেমিক শিক্ষা জরুরি নয়। ৩. চিত্রে দেশীয় সংস্কৃতির প্রাধান্য থাকতে হবে। ৪. প্রদর্শনীতে উপস্থিত দর্শকদের মতামত গ্রহণ করা হবে। ৫. চিত্রে অভিনবত্ব থাকতে হবে। (পাঠক, ক্রমশ শর্ত এবং ফর্মুলার বিস্তারিত জানা যাবে) সাতদিনের মধ্যে চিত্রপ্রদর্শনী শুরু হয়ে গেল। প্রতিযোগিতার পঞ্চম দিনে শিল্পী জহিরুল ইসলাম হঠাত্ কোকিলের ডাক শুনতে পেলো। ‘...এখন তো কোকিল ডাকার সময় নয়। তাছাড়া আর্টগ্যালারির বাইরে কোকিল ডাকলেও প্রদর্শনীর ভেতরে সেই ডাক প্রবেশের কোনো পথ নেই।’ অনেক পরে শিল্পী জহিরুল ইসলাম বুঝতে পারল, কোকিল তার মনের ভেতর ডেকে চলছে। কারণ তার চিত্রকর্মের সামনে লোকজনের ভিড় সবচেয়ে বেশি। তার চিত্রকর্ম দেখে দর্শকরা নানান মন্তব্য করছে। মন্তব্যসমূহ : ১. চিত্রকর্মের নামটা খুব চমত্কার—বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ। কিন্তু চাঁদটা গোলাকার না হয়ে চৌকা হয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। ২. এটা চৌকা চাঁদ না, এটা একটা চৌকা পরোটা। তেলে ভাজা পরোটার মাঝখানে ডিমের ওমলেট, সম্ভবত ডিমটা দেশি মুরগির, তা না হলে কুসুমটা এত গাঢ় হলুদ হতো না। ৩. শিল্পীর চোখে সমস্যা আছে। অথবা চিত্রকর্মটি আঁকার সময় শিল্পীর মানসিক বিভ্রাট ঘটেছে এবং এটাই আধুনিক ফর্ম। ৪. এটা বাণিজ্যিক কৌশল ছাড়া আর কিছু না। ৫. কাজলা দিদি মরে বেঁচে গেছে। বেঁচে থাকলে এমন চৌক চাঁদের তেজস্ক্রিয়তায় যতীন্দ্রমোহন বাগচীকে সঙ্গে নিয়ে নিশ্চিত চিতায় পোড়ত। শিল্পী জহিরুল ইসলামের মনে আবার কোকিল ডেকে উঠল। কিন্তু পরমুহূর্তে সেখানে বসন্তচিন্তা সরে গিয়ে কাক উড়তে লাগল। কে যেন বলেছে, শিল্পপতি করিম খুব চালাক লোক। করিম কথায় কথায় বলে, এখানে ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না। টাকা দিলে শিল্পীরা তার জন্য মাঠে নামতেও দ্বিধা করবে না। জহিরুল ইসলামের নিকট কোকিলের কুহুতান থেকে কাকের কা...কা... ভালো লাগে। ‘...শিল্পপতি করিম নিজেকে কী মনে করে? করিম প্রমাণ করতে চেষ্টা করছে সে সংস্কৃতিবান? আইচ্ছা...!’ শিল্পপতি করিমের মগজে আরও কতরকম ভাবনা : শ্রেষ্ঠ ১০টা চিত্রকর্ম নির্বাচন করে নির্বাচকদের মন্তব্যসহ বই বের করা হবে। ক্যালেন্ডার করা হবে। প্রতিটি বইয়ে চিত্রকর্মগুলোর উত্সমূলের কথা লেখা থাকবে। জহিরুল ইসলাম তার চিত্রকর্মের অনুপ্রেরণা বা উত্সমূলের কাহিনি মনে করে হাসে। শব্দহীন নীরব হাসি। হাসির শানে-নজুল : একটা কাক একটা রুমাল নিয়ে উড়তে থাকে। উড়তে উড়তে তাদের উঠানের মাঝ বরাবর এলে তার মা গালি দেয়, ‘শুয়োরের বাইচ্চা, শহর থেকে আইছে, অমানুষ...!’ প্রতিযোগিতায় শিল্পী জহিরুল ইসলামের চিত্রকর্মটি প্রথম হয়। তবে নির্বাচকরা আপত্তি করেছে, চিত্রে দুটি পরস্পরবিরোধী মাধ্যম ব্যবহার করা হয়েছে, জল রং এবং তেল রং। দুটি রং ব্যবহার করে বির্তকের সৃষ্টি করেছে শিল্পী জহিরুল ইসলাম। শিল্পপতি করিম আগবাড়িয়ে শিল্পী জহিরুল ইসলামের সাথে কথা বলে। ‘চিত্রে কয়টি মাধ্যম ব্যবহার করেছেন?’ ‘দুটি, জল এবং তেল।’ ‘দুটি মাধ্যম কি মিশেল খায়?’ ‘খায় না জানি, যেমন মিশেল খায় না শিল্পী এবং শিল্পপতি, অথচ রান্নার ক্ষেত্রে জল এবং তেল দুটিই মেশাতে হয়। সেখানে প্রয়োজন হয় উত্তাপের।’ ‘ছবির ক্ষেত্রে উত্তাপটা কিসের?’ ‘হূদয়ের।’ ‘আচ্ছা, চাঁদটা চৌকা কেন?’ ‘এটা আমার চেয়ে আমার মা ভালো জানেন।’ ‘কারণটা সংক্ষেপে যদি আমাকে বলেন।’ ‘মায়ের মুখে শুনলে আপনি সবচেয়ে বেশি অবাক হবেন।’ ‘আপনি কি চিত্রকর্মটির অনুপ্রেরণার সঙ্গে আপনার মাকে সংশ্লিষ্ট করতে চাচ্ছেন?’ তখন শিল্পী জহিরুল ইসলাম অন্যমনস্ক হয়ে অন্যরকম কথা বলে, ‘কাকের এই এক সমস্যা—এরা একসঙ্গে ঝাঁক বেঁধে থাকতে চায়।’ শিল্পপতি যেন ঝাঁকুনি খেয়ে জানতে চায়, ‘কী বললেন?’ শিল্পী জহিরুল ইসলাম বলে, ‘যা বলেছি শুনে আপনার লাভ হবে না। যে সাক্ষাত্কার গ্রহণ করবে তাকে আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দিন। আপনি কষ্ট করে এসব শুনতে আসছেন কেন?’ শিল্পীর কথা শুনে শিল্পপতি চমকে ওঠে। অথচ শিল্পপতির ইশারায় যেকোনো চিত্রকর্মের মনোনয়ন বাতিল হয়ে যেতে পারে। এটা শিল্পীও জানে। কিন্তু জহিরুল ইসলাম খুব রগচটা। ‘এই শিল্পীরা ধনীদের সাহায্য নেয় এবং ধনীদের ঘৃণাও করে।’ শিল্পপতি এগিয়ে এসেছে নন্দনপুর নামটি শুনে। শিল্পীর গ্রামের নাম নন্দনপুর। শিল্পপতির স্মৃতিতে এক নন্দনপুর উজ্জ্বল হয়ে আছে। অসম্ভব সুন্দর এক গ্রাম কিন্তু সেখানে বিশুদ্ধ পানির খুব অভাব। শিল্পপতি শিল্পীকে নিয়ে নন্দনপুর যাত্রা করে। একান্ত ভ্রমণে শিল্পপতি ড্রাইভার সঙ্গে নেয় না। নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে। ভ্রমণে শিল্পপতির শরীর ঘামে। তখন শিল্পপতি সুগন্ধি টিস্যুপেপার ব্যবহার করে। যখন টিস্যুর প্রচলন ছিল না তখন ব্যবহার করত রুমাল। তখন শিল্পপতির একটা দ্বিতীয় নাম জনান্তিকে প্রচলিত ছিল। অনেকে তখন করিম বলতে রুমাল করিম বা উড়াল করিমকেই বুঝত। করিম নাকি প্রতিদিন চার-পাঁচটা রুমাল ব্যবহার করত। আর করিম বলত, টাকা উড়াইতে পারি না তাই রুমাল উড়াই। গাড়িতে শিল্পপতি প্রথমে কথা বলে, ‘শিল্পীরা খুব রাগী হয় কেন? বিশেষ করে বড়লোকদের ক্ষেত্রে তাদের রাগটা এত বেশি কেন?’ ‘আসলে কোকিলগুলো হারামজাদা’ শিল্পপতি আবার চমকে ওঠে। কিন্তু মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারে না। শিল্পীরা নাকি এমন হয়। উদ্ভট সব বাক্য আওড়ায়। যেন আধুনিক দরবেশ। সবকিছু দেখে, তবু মনে হয় কিছুই দেখে না। ছবির মূল্য কম শুনলে হয়তো লাফিয়ে উঠবে অথবা কিছুই বলবে না, আবার হয়তো বিনামূল্যে কাউকে চিত্রকর্মটি দিয়ে দেবে। না খেয়ে মরে যাবে কিন্তু আক্ষেপ করবে না। এদের হাতে শাসনভার দিলে কী হবে? হয়তো বলবে, এসব আমাদের কাজ নয়। একজন তো একবার বলছিল, আঙ্গুর পচলে মদ হয়। মানুষ পচলে রাজনীতিবিদ হয়। শিল্পপতি ভাবে—কোকিলগুলো খুব হারামজাদা—এ কথার মানে কী? কী কারণে চাঁদটা চৌকা হলো, শিল্পী কিছুই ব্যাখ্যা করে বলছে না। তারচেয়ে ভালো নন্দনপুর সম্পর্কে দু-চারটা কথা বলা। ... ‘নন্দনপুর সম্পর্কে বলুন।’ শিল্পপতির অনুরোধে নরম একটা সুর ছিল। শিল্পী নিজের গ্রাম সম্পর্কে খুব স্পর্শকাতর। অথবা কড়া কথার বিপরীতে নরম মেজাজটা সক্রিয় হয় তার। শিল্পী বলে, ‘ ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডের পাশে মাটির রাস্তা, সেখান থেকেও বেশ দূরে...।’ ‘সেখানে কি অনেকে চিত্রকর্মের সাথে জড়িত?’ ‘না...না...। আমার জানামতে নতুন করে এখনো কেউ তৈরি হয়নি। ছবি এঁকে নিজেকে রক্ষা করা কঠিন—এ খবর পাড়া-গাঁয়ের লোকজন ভালোই জানে। নন্দনপুর অজপাড়াগাঁ। আমার মা আছে। এখনো গ্রামেই থাকেন। বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তবে এখনো চোখে দেখেন। মা বলেন, আমার ছবি দেখার জন্য আল্লাহ এখনো তাঁর দৃষ্টি কেড়ে নেয়নি। আমি মাঝে-মধ্যে গ্রামে যাই।’ শিল্পপতি বলে, আসলে আমিও একসময় নন্দনপুর নামক এক গ্রামে গিয়েছিলাম। আমার মনে হচ্ছে, আপনার গ্রামেই গিয়েছিলাম। অতি আকাঙ্ক্ষা থেকে আমার এই যাওয়া..., হা বলেন, আপনি বলতে থাকুন। আমি শুনছি...।’ শিল্পী বলতে থাকে। ‘লালমাটি, শক্ত, খুব শক্ত মাটি, এখানে সেখানে মাটির ঘর। বাঁশ আর শালের মঞ্জিল, বাতাস লাগলে শন্শন্ করে। শীতে ছাগলের লেদীর মতো ফরফর পাতা ঝরে। বুড়ো পাতার অবিরাম নৃত্য চলে। কুড়ানিদের পাতার স্তূপ যেন মায়ের উদোম দুধ। চৈত্রের রোদে এই মাটি বড় বেশি ফোঁপায়। রোদ গিলে গিলে মাটির নাভিশ্বাস ওঠে। মাটির এক হাত ওপরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে সব ঝিলমিল—ধোঁয়া আর ধোঁয়া। মনে হবে প্রকৃতি ভিজে একশা, এই বুঝি কাঁদছে। এই কান্না ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছা জাগলেও জাগতে পারে। যদি সত্যি কারও জাগে তার জন্য মহাবিভ্রাট অবধারিত। মনে হবে একটু এগিয়ে গেলে নাগাল পাবে। কিন্ত সে এগিয়ে যাবে, এগিয়ে যাবে, এভাবে যেতেই থাকবে। যেতে যেতে ক্লান্ত হলে চোখে কষ ধরে যাবে। মনে হবে, আকন্দের কষে চোখের পাতা আটকে গেছে। তখন তার প্রচণ্ড তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে যাবার উপক্রম হবে কিন্তু সে পানযোগ্য এক ফোঁটা পানি পাবে না। শিল্পীর বর্ণনা শুনে শিল্পপতি উহ! বলে চিত্কার করে ওঠে। ‘কী বললেন? পানি পাবে না? আপনার বর্ণনা শুনে আমার দম আটকে আসছিল। আমি স্মৃতি-আক্রান্ত। আমার মনে হয় আপনি নন্দনপুরের যে বর্ণনা দিয়েছেন, হুবহু একটা দৃশ্য আঁকলেই প্রথম হয়ে যেতেন। মনে কিছু করবেন না, এই প্রকৃতি আপনাকে বিভ্রান্তি শিক্ষা দিয়েছে কি না, জানি না। আপনার আঁকা চৌকা চাঁদটা একটা মহাবিভ্রান্তি তৈরি করেছে। চৌকা চাঁদটা সম্পর্কে কিছু বলুন।’ শিল্পীর মনে হয় লোকটাকে আরও বিভ্রান্ত করা উচিত। শিল্পপতি মনে মনে মনে ভাবে, এই নন্দনপুর গ্রামে সে একদিন নিশ্চিত গিয়েছিল। কাকতালীয়ভাবে শিল্পপতিও নিজ থেকে বিভ্রান্ত হওয়ার প্রস্তাব করলে শিল্পী আনন্দিত হয়ে ওঠে। কারণ সে চৌকা চাঁদের কাহিনিটা মায়ের মুখ থেকে শিল্পীপতিকে শোনাবে। যদিও সে চৌকা চাঁদের কাহিনিটি ভালো করেই জানে। তবু সে বলতে নারাজ। বিভ্রান্ত হওয়ার এবং বিভ্রান্ত করার কাজটা দুজনে শুরু করে। পথ অতিক্রম করতে করতে দুজনে এ খেলায় মেতে ওঠে। প্রথম দৃশ্য : একজন কৃষক জমিতে সার দিচ্ছিল। শিল্পপতি বলে, লোকটা কী করছে? শিল্পী বলে, ওইগুলো হলো চিনি। কমপক্ষে তিন প্রকার চিনি না হলে আজকাল জমি ফসল দিতে চায় না। সাদা চিনি, লাল চিনি, মেটে চিনি। কৃষকরা বলে, দেশের হগ্গলে ঘুষ খায়, তাহলে জমি ঘুষ খাবে না কেন? চিনি হলো জমির ঘুষ। ঘুষ না দিলে জমিও বিরাগ হয়। শিল্পপতির মুখে হাসি। তবে উচ্চকিত হাসির ব্যাপারে সে সাবধান। যদি ব্যক্তিত্ব ঢিলে হয়ে যায়। দ্বিতীয় দৃশ্য : ভার টানে কয়েকজন কৃষি-শ্রমিক। তাদের এবড়ো থেবড়ো উঁচু কাঁধ, মনে হয় কুমারের হাতে তৈরি ছোট ছোট টংকর’। শিল্পপতি বলে, তাদের কাঁধ এমন কেন? শিল্পী বলে, নাগরিক জীবন, আধুনিক জীবনে সাফল্যের পুরস্কার রয়েছে—নগদ টাকা, গলায় ঝুলানো সোনার মেডেল, রুপার মেডেল এবং তামার মেডেল। কিন্তু প্রান্তিক শ্রমিকদের কাজের পুরস্কার কোনো জায়গায় নেই। তাই শরীর নিজের মতো মেডেল তৈরি করে। তবে এগুলো গলায় না ঝুলে কাঁধের শোভা বর্ধন করে। অতএব বলা যায়, এগুলো প্রাকৃতিক সনদ। গাড়ি চলছে ধীরগতিতে। দ্বিতীয় বিভ্রান্তিতে শিল্পপতি আরও বেশি অনুপ্রাণিত হয়। শিল্পীর কথায় শিল্পপতির প্রাণ উচ্ছল হয়ে ওঠে। তার ইচ্ছে হয় জিজ্ঞেস করতে, চাঁদটা কেন চৌকা আঁকলেন? কিন্ত শিল্পীর মা ঘটনা জানে, অতএব শিল্পীর মায়ের থেকে জেনে নেয়াই ভালো। তৃতীয় দৃশ্য : একটা দোচালা ঘর। শিল্পপতি বলে, এই দোচালা ঘরের ব্যাখ্যাটা কী? শিল্পী বলে, আবহমান বাংলার দুই নারীর রূপ। দু-প্রান্তে দু-নারীর ঘোমটা, একটা মায়ের অপরটা বোনের অথবা একটা মায়ের অপরটা বউয়ের। এর ভেতর পুরুষ আদর্শ পৃথিবীর পাঠ নেয়। পৃথিবীর সব বই এই কাঠামোতে তৈরি। (একটা বই উপুর করে দেখবেন) এর পরতে পরতে মানুষ হওয়ার মন্ত্রগাথা। কেউ পড়তে পড়তে শেখে। কেউ না পড়েই শেখে। তাই আমি গ্রামের মানুষকে মূর্খ বলি না। হয়তো কারও কারও অক্ষরজ্ঞান নেই কিন্তু জ্ঞান ঠিকই আছে। গাড়ি নন্দনপুর গ্রামে পৌঁছায়। শিল্পপতি বুঝতে পারে এই গ্রামে সে একদিন এসেছিল। আরও অবাক হয় শিল্পীর বাড়িতে পৌঁছে, সত্যিই সে এ বাড়িতে এসেছিল। তখন এ বাড়িতে প্রচুর বাঁশঝাড় ছিল, এখন আগের মতো নেই। বাঁশঝাড় ছাড়া বাদবাকি সব একই আছে। শিল্পপতি করিমকে নিয়ে শিল্পী তাদের ঘরে প্রবেশ করলে শিল্পীর মা ভেতরঘর থেকে বিশেষ করে বেড়ার পার্টিশনের অপর পাশ থেকে শিল্পপতি করিমকে দেখে চিনতে পারে। শিল্পী যখন তার মাকে বিস্তারিত বলে এবং শিল্পপতি তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে—একথা বলে তখন মায়ের কপাল কুঁচকে যায়, মহা এক বিরক্তিসহ মা বলে, এই অসভ্যটাই একদিন তাদের বাড়িতে এসেছিল। তারপর লোকটি প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদনের জন্য তড়িগড়ি করে তাদের ছাদহীন বা ওপরে আবরণহীন বেড়ার পায়খানাতে যায়। লোকটি অ্যালুমিনিয়ামের বদনায় পানি নিয়ে পায়খানায় প্রবেশ করলেও পানি ব্যবহার করেনি। সে পানির পরিবর্তে ব্যবহার করেছিল রুমাল এবং ছাদহীন খোলা পায়খানার ভেতর থেকে সেই রুমাল কয়েকটা কাকে কাড়াকাড়ি করে বাঁশঝাড়ের মাথায় তুলে নিলে সেখানে রুমালটি চমত্কারভাবে আটকে যায়। ওই বাঁশঝাড়ের শীর্ষ বাঁশটি ছিল মরা। বাঁশটির পাতা ঝরে গিয়ে ‘ছাটা’গুলো কাঁটার মতো তীব্র ও ছড়ানো অবস্থায় ছিল। সেই ছাটায় উড়াল করিমের ময়লা রুমাল অনেকদিন আটকে থাকলে এক পূর্ণিমায় বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠলে শিল্পীর মা সেই চাঁদ দেখতে দেখতে তার বাড়িতে প্রবেশকারী নাম না জানা শহরের লোকটিকে ‘শহরে শুয়োর’ বলে গালি দেয়। আজ কোন দুঃখে মা এই উড়াল করিমের সঙ্গে দেখা করবে এবং কথা বলবে? শিল্পীর কোনো অনুরোধে কাজ না হলে শিল্পপতি এবং শিল্পী পুনরায় গাড়িতে করে শহরের দিকে রওনা হয় এবং চলতে চলতে শিল্পপতি এবং শিল্পীর মাঝে কথাবার্তা শুরু হয়। : আপনার মা কেন আমার সঙ্গে কথা বলল না? : আপনাকে দেখে উনি রাগ করেছেন। : আপনার মা কি অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলে অভ্যস্ত নয়? : আমি বলছি মা আপনাকে দেখে রাগ করেছেন। : কেন? তখন শিল্পী উড়াল করিমের রুমালবৃত্তান্ত সবিস্তারে বললে উড়াল করিম বা শিল্পপতি করিম বুঝতে পারে চিত্রকর্মটির পেছনের কাহিনিটা খুব বিশ্রী এবং শিল্পী যে তার ওই রুমালকে চৌকা চাঁদ রূপে এঁকেছে তা বুঝতে বিলম্ব হয় না। কিন্তু শিল্পপতি একথা বলতে পারে না যে, সে এই এলাকায় বিশুদ্ধ পানির উত্স খুঁজতে এসেছিল এবং তখনই সে একটি এনজিওর পরিবেশ বিষয়ক গবেষক ছিল এবং ওই এনজিওটি একটি শীতপ্রধান দেশে তাকে পিএইচ ডি করার সুযোগ দিয়েছিল—ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে সেদিন সে রুমাল ব্যবহার করেছিল স্থানীয় পানি দূষিত হওয়ার সম্ভাবনাকে মনে রেখে। রাত্রিবেলা গাড়ি চলছে খুব ধীরগতিতে কারণ রাস্তার অবস্থা তত ভালো নয়। যাবার সময় শিল্পপতি টের পায়নি। শিল্পী এবং শিল্পপতি দুজন নীরব। গাড়িতে হেডলাইটের আলো রাস্তার দুপাশের খালে পড়লে দেখা যায় খালে পানি নেই, খালও নীরব। দুই নীরবতা পরস্পরকে দুর্বল করতে চেষ্টা করে কিন্তু শিল্পপতি দুর্বল হলেও শিল্পী দুর্বল হয় না। ‘শুনলাম আপনি শীতপ্রধান দেশে পিএইচ ডি করেছেন। রুমালের এমন অশ্লীল ব্যবহার কি ওই দেশ থেকে রপ্ত করেছেন?’ শিল্পীর কথা শুনে শিল্পপতি বুঝতে পারে, শিল্পী তার চিত্রকর্মটি বিক্রি করবে না। আর চিত্রকর্মটির পেছনের কাহিনি যেহেতু শোভন নয় সুতরাং শিল্পপতিরও ছবি কেনার ইচ্ছে নেই। অন্য নয়টি ছবি দিয়ে বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধিকে নিজের পক্ষে কাজে লাগাতে হবে। শিল্পীর প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, তখন শিল্পপতি বলে, ‘না আমি নন্দনপুরে বিশুদ্ধপানির জরিপ গবেষণায় আসার ১ বছর পর পিএইচ ডি করতে ডাই।’ ‘এ অভ্যাসটা কোত্থকে আত্মস্থ করলেন?’ ‘আমি নন্দনপুরের পানির উত্সগুলোর ওপর সন্দিহান ছিলাম।’ ‘তাই রুমাল দিয়ে এই কর্ম সম্পাদন, বাহ! আর কাকগুলোও আপনার রুমালটাকে পছন্দ করে আমার মায়ের পূর্ণিমা দেখার দৃষ্টির সামনে ঝুলিয়ে দিল। কাকের জাত আসলে খারাপ।’ শিল্পীর মনের ভেতর একটি আহত কোকিল গান গাইতে চেষ্টা করে বারবার ব্যহত হয়। শিল্পপতি তখন গলা পরিষ্কার করে, তার মনে হয় তার গলার ভেতর দলা পাকিয়ে কী যেন উঠেছে। গাড়ি চলছে। গল্পটা এভাবে শেষ করা যায় : শিল্পী শিল্পপতির সাথে আর্টগ্যালারিতে পৌঁছার পর তার চিত্রকর্মটি নিয়ে সোজা বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। অথবা এভাবে শেষ করা যায় : শিল্পী তার চিত্রকর্মটি বিক্রি করে দেবে, শিল্পপতি কাউকে দিয়ে একটা উত্সমূলের গল্প লেখিয়ে নেবে। অথবা এভাবে শেষ করা যায় : চিত্রকর্মটি নিয়ে শিল্পী বাড়ি ফেরার পথে শিল্পপতির নিয়োগ করা কয়েকজন খুনি শিল্পীকে খুন করে ফেলবে তখন শিল্পপতি শিল্পীর মাকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে সাহায্য করবে এবং সেই কাহিনিটা হবে চিত্রকর্মটির উত্সমূলের সবচেয়ে করুণ কাহিনি। না গল্পটা শেষ হবে অন্যভাবে। শিল্পপতি দ্রুত একটা প্রস্তাব দেয় শিল্পীকে। ‘মি. জহিরুল ইসলাম, চৌকা চাঁদের গল্পটা আপনি যদি বদলে দেন তাহলে আপনার ইচ্ছার ওপর বিক্রির মূল্যমানটা আমি ছেড়ে দেব।’ ‘বলুন, গল্পটা কেমন হবে?’ শিল্পী বলে। ‘ আপনি বলবেন, শিল্পপতি করিম আজ থেকে কয়েক বছর আগে নন্দনপুর যায় বিশুদ্ধ পানির উত্স সমূহের গবেষণায়। যাবার পথে গাড়ি থেকে নেমে একটি আইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে যখন নন্দনপুরের শেষ মাথায় পৌঁছায় তখন ঠিক মধ্য দুপুর। এক বৃদ্ধের মাথায় বিশাল একটি লাকড়ির বোঝা। বৃদ্ধের চোখে কপাল চুঁইয়ে ঘাম পড়ছিল। নোনাঘামে বৃদ্ধের চোখ পুড়ছিল। শিল্পপতি করিম এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধের দু-চোখ মুছে দিলে বৃদ্ধ উচ্চকণ্ঠে শিল্পপতি করিমকে দোয়া করে। শিল্পপতি আরও এগিয়ে যায়। খালের পানি, পুকুরের পানি, দীঘির পানি, কলের পানি—বিভিন্ন উেসর পানি সংগ্রহ করছিল করিমের অধীনে কর্মরত আরও কয়েকজন। শিল্পপতি করিম একপর্যায়ে আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে। উঠানে দাঁড়িয়ে হাঁক দেয়, কে আছেন..., এক গ্লাস খাবার পানি দেবেন...? মা ঘরের পৈঠা লেপছিল, মায়ের দুহাতে কাদা, মা পানি আনার জন্য যখন উঠবে তখন শিল্পপতি করিম এগিয়ে গিয়ে মায়ের হাত রুমাল দিয়ে মুছে দেয়। কিন্তু খাবার পানি পান না করে সামান্য নমুনা সংগ্রহ করে ফেরার সময় শিল্পপতি করিম মন ভুল করে তার রুমালটি ফেলে আসে। বিকেল বেলা আমার বাবা এসে শুনতে পায়, এক ভিনপুরুষ মায়ের হাতের কাদা রুমাল দিয়ে মুছে দিয়েছে। বাবার রাগ এতে এতটা বেড়ে যায় যে, বাবা জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে এবং অশ্লীল ভাষায় আজকের এই শিল্পপতি করিমকে গালিগালাজ করে এবং বাবার সমস্ত ক্রোধ গিয়ে পতিত হয় শিল্পপতি করিমের ফেলা আসা ওই রুমালের ওপর। বাবা রুমালটা প্রথমে ছুড়ে দিলে তা অসহায়ের মতো ঘুরতে ঘুরতে উঠানের ওপর পড়লে বাবার ক্রোধ আরও বেড়ে যায়। দ্বিতীয়বার রুমালটি হাত দিয়ে ছুঁতে বাবার ঘৃণা লাগে। একটি বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বাবা রুমালটি আবার ছুঁড়ে দিলে তা বাঁশঝাড়ে গিয়ে পড়ে। আর একঝাঁক উত্সাহী কাক রুমালটি নিয়ে খেলতে শুরু করলে এক পর্যায়ে রুমালটি বাঁশঝাড়ের একটি মরা বাঁশের অগ্রভাগে আটকে যায়। বাবা প্রতিদিন কিছু সময়ের জন্য ওই রুমালের দিকে তাকাত আর অশ্লীল ভাষায় আজকের শিল্পপতিকে গালিগালাজ করত। কিন্তু যেদিন বৃদ্ধের চোখ মোছার ঘটনাটি বাবার কানে আসে সেদিন বাবা স্তব্ধ হয়ে যায়। তারপর হতে রুমালটি বাঁশবাগানের ঝোপের মগডালে আটকে ছিল এবং যেদিন আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠত সেদিন মা এবং বাবা বিস্ময়ভরা দৃষ্টি দিয়ে চাঁদ দেখত এবং বলত : পৃথিবীতে এখনো মানুষ আছে। ভালো মানুষ শেষ হয়ে যায়নি। সেই ঘটনা যখন আমি আমার মা এবং বাবার মুখে শুনি তখন থেকে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, ওই রুমালকে থিম করে একটি ছবি আঁকব। আজ বলছি, সেই অনুপ্রেরণা ও প্রতিজ্ঞা থেকে সৃষ্ট আমার ছবি : ‘বাঁশ বাগানের উপর চাঁদ উঠেছে ওই।’ এর জন্য আমি আংশিক হলেও শিল্পপতি করিমের কাছে ঋণী। শিল্পপতি করিমের সমস্ত ভাষণটি বা প্রস্তাবটি শোনার পর শিল্পী জহিরুল ইসলাম ভাবতে থাকে—‘এই আমলারা আসলে ধুরন্দর। ও আসলে উড়াল করিম।’ শিল্পী জহিরুল ইসলাম এবার তীক্ষ দৃষ্টিতে উড়াল করিমকে লক্ষ করে। শিল্পী জহিরুল ইসলাম শব্দ করে গলা পরিষ্কার করলে শিল্পপতি বা উড়াল করিম জানতে চায়, সে প্রস্তাবটা গ্রহণ করবে কি না। তখন তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। ‘আপনার কী করে বিশ্বাস হলো—এমন একটা মিথ্যা গল্প আমি আমার গল্পের অনুপ্রেরণা হিসেবে মেনে নেবো?’ ‘আপনি গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিশ্বাস করছি না। এটা সামান্য প্রস্তাব মাত্র।’ ‘ জীবনে এমন প্রস্তাব কতবার দিয়েছেন?’ ‘কাকে?’ ‘যেহেতু আমলা ছিলেন, অতএব সরকারকে।’ ‘আপনি আমাকে যতবার বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন তার চেয়ে একশ গুণ বেশি।’ ‘আপনারা সবসময় বেঁচে যান, তাই না?’ শিল্পপতি আরও একবার লম্বা করে বলে, ‘আমি তো বলি এমন করে..., আমলা নয়, আ-ম-লা, যা হয়নি-মলা (যা বা যাকে মর্দন করা হয়নি।’ ‘বাহ! চমত্কার তো। আমার মা-বাবার মুখ থেকে অশ্লীল গালিগালাজসহ সমস্ত গল্পটি আমাকে গিলাতে আপনার বাজেট কত শুনি?’ ‘এতক্ষণে আপনি লাইনে এসেছেন। লক্ষ রাখবেন গাড়ির মিটারের সূচকের দিকে। আপনার মনমতো হলে ইয়েস বলবেন। গাড়ির গতি সূচক যদি ৩০-এ থাকে এবং আপনি যদি ইয়েস বলেন, আপনি পাবেন ৩০ লক্ষ। যদি ৪০-এ থাকে এবং আপনি যদি ইয়েস বলেন, তাহলে আপনি পাবেন ৪০ লক্ষ। তবে আপনার নন্দনপুরের রাস্তা খুব বাজে, আপনার ছবির মূল্য বেশি পাবেন না। দেখতে পাচ্ছেন গাড়ি কেমন ধীরে চলছে। তবে আমি গাড়ির গতি বাড়ানোর চেষ্টা করছি। মনে রাখবেন, হাইওয়েতে উঠলে আপনি কোনো টাকা পাবেন না।’ গাড়ির গতি ৩০। ভাঙাচূরা রাস্তা। শিল্পী নিশ্চুপ। গাড়ির গতি ৪০। শিল্পীর চোখ বড় হয়ে যাচ্ছে। গাড়ির গতি ৪৫। শিল্পী স্বপ্নে বিভোর। শিল্পীর বাড়ি পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। কাঁচা পায়খানা পাকা হয়ে যাচ্ছে। বাঁশঝাড়ের জায়গায় বাহারি রংয়ের ফুলের গাছ লাগানো হচ্ছে। পুরাতন মাটির ঘর হয়ে যাচ্ছে আধুনিক দোতলা। গাড়ির গতি ৫০। মায়ের হা-করা মুখ। মা জানতে চায় : বাবা জহির, এত টাকা পাইলি কই? এই দেশে এত টাকা দিয়ে কেউ ছবি কিনে? গাড়ির গতি ৫৫। অথবা আরও বেশি। শিল্পী জহিরুল ইসলাম এবং শিল্পপতি করিম বা উড়াল করিম চোখ বন্ধ করে চিত্কার দেয়। গাড়ি রাস্তা থেকে সোজা নিচে। পানিবিহীন খাল। এর মাঝখানে কোমরসমান নির্ভেজাল কাদা। তারপর বিশাল নীরবতা। দ্বৈত নীরবতা। খালের কাদায় আটকে যাওয়া গাড়িতে বসে শিল্পী ভাবে, ‘কী কারণে চাঁদের আকৃতিটা পরিবর্তন করে দিলাম। আর শিল্পপতি বা আমলাপতি বা উড়াল করিমকে কী কারণে নন্দনপুর নিয়ে এলাম। সেই থেকে একটার পর একটা দুর্ভোগ আসছে।’ শিল্পী গাড়ির ভেতরের বাতির সুইচটা তার ডান হাত চালিয়ে খুঁজতে থাকলে তার হাত আমলাপতির বা শিল্পপতির বা উড়াল করিমের পাছা, মুখ, প্যান্টের জিপার এবং মাথার চুল স্পর্শ করে। অবশেষে সুইচটি পেয়ে গেলে গাড়ির ভেতর আলো জ্বলে ওঠে। শিল্পী চেয়ে দেখে, উড়াল করিম তার দিকেই তাকিয়ে আছে। উড়াল করিম ভাবে, ‘এই শিল্পী জহিরুল ইসলাম আসলে লোভী। গাড়ির গতি সূচক কমপক্ষে ৬০ বা ৭০-এ উঠেছিল। কিন্তু লোকটা তাতেও ইয়েস বলল না। ছবি আঁকতে কত টাকা লাগে? সামান্য কয়েক টাকার রং, ক্যানভাস, তুলি—তাতেই লক্ষ টাকার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে এরা। এজন্যই এদের অনেকে সারা জীবন দরিদ্র থাকে। কেউ কেউ না খেয়েও মরে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তারপরও এদের তেজ কমে না। উড়াল করিম তবুও আশা ছাড়ে না। গলাটা পরিষ্কার করে বলে, তাহলে আপনাকে কত টাকা দিতে হবে? শিল্পী তার শরীরটা সামান্য ঝুঁকিয়ে গাড়ির মিটারের দিকে দৃষ্টি দেয়। ভালো করে মিটারের সূচকটা দেখার পর উড়াল করিমকে বলে, ‘জনাব, আপনার গাড়ির সূচকটা যেখানে বর্তমানে স্থির আছে ঠিক তত লক্ষ টাকা দিতে হবে।’ উড়াল করিম দ্রুত সূচকটা দেখার জন্য মাথাটা এগিয়ে দিয়ে চমকে ওঠে। কারণ সূচকটা তখন শূন্যে স্থির।