সমাজ-বাস্তবতার গল্প

আজ রাতে পার্টি হবে না জামাল উদ্দীন প্রচ্ছদ : আশেক-উল হক প্রকাশক : সাকী পাবলিশিং ক্লাব মূল্য : ১২০ টাকা ‘পার্টিতে উত্সব হবার কথা। কিন্তু বিনিয়োগকারী আসতে না পারায় পার্টি হবে না। এতে শুধু একজন ব্যবসায়ীর সমৃদ্ধি থেমে থাকেনি, বাধা পড়েছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধিতেও। জামাল উদ্দীনের গল্পগ্রন্থ ‘আজ রাতে পার্টি হবে না’। আজ রাতে পার্টি হবে না—শিরোনাম গল্পটির বিষয় বর্তমান বাংলাদেশের রুঢ় বাস্তবতারই অংশ। ‘মার্টিনের আসায় বিঘ্ন ঘটায় জোবায়ের আশাভঙ্গের বেদনায় ব্যথিত। ...জোবায়েরের আশা দুজনের যৌথ বিনিয়োগে এদেশে এমন কিছু করা, যাতে বাংলাদেশ লাভবান হয়।’ গল্পের আরেক স্থানে লেখা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইন শৃঙ্খলার অবনতি—এসবের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। ...শঙ্কা আরও অনেক কিছুতেই আছে। তার বন্ধু শাফিন সেদিন বলেছিলো, দোস্ত, ইন্ডাস্ট্রি করবা, গ্যাস কই, বিদ্যুত্ নাই।’ এই গল্পগ্রন্থে স্থান পেয়েছে মোট দশটি গল্প। গল্পগুলো হচ্ছে—বিয়ে ও বিদ্যুতের গল্প, প্রযত্নে বিন্দুর মোড়, আজ রাতে পার্টি হবে না, কালো দিন, বাঁশ, মৌনতা, প্রকাশিত গল্পের প্রতিবাদ, বৈশাখে তুমি, পরী এলো জোছনা রাতে এবং লাল গোলাপ ও নিরেট ছেলেমি। কানসাটে বিদ্যুত্ নিয়ে উত্তপ্ত দিনগুলো নিয়ে লেখা হয়েছে ‘বিয়ে ও বিদ্যুতের গল্প’। সেখানে উঠে এসেছে সংগ্রামী সাধারণ মানুষের কথা, আন্দোলনমুখর দিনে সজল ও তমার বিয়ে এবং বুদ্ধিমান পুলিশ কর্মকর্তার বিষয়টি। ‘বিকেলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফোন করেছিলেন সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে। প্রয়োজনে আরও কটা লাশ ফেলে হলেও পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ইঙ্গিত পেল সে। কিন্তু সে কাজটি করতে রাজি নন নাঈমুল। আর একটিও লাশ নয়, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে এই স্লোগানে নাঈমুলেরও একাত্মতা।’ ‘বিন্দুর মোড়’ গল্পে—নায়কের প্রথম দেখা অচেনা ভালো লাগার মানুষকে চিঠি লেখেন আকাশের ঠিকানায়। ‘মনে হয়েছিলো আকাশ থেকে কোনো পরী যেন নেমে এসেছে ধরায়। হালকা নীলের আভরণে তোমাকে দেখতে দারুণ লাগছিলো। তুমি এত সুন্দর করে ঘোমটা টেনেছিলে, যেনো গ্রামের লাজুুক বধূ। ঘোমটার ফাঁকে তোমার মুখায়ব নয়, আমি যেনো দেখেছি এক ফালি চাঁদ।’ গল্পের শেষ দিকে নায়ক রাজু আহমেদ বলেন, ‘লোকে পাগল বলবে? বলুক। হাসবে যদি—হাসুক। আমার প্রথমাকে আমি মনে রাখবো চিরকাল। অন্তত রাজশাহীর কথা মনে হলে, কখনো বা সশরীরে এলে, বিন্দুর মোড়ে তোমাকে হয়তো খুঁজবো আরেকবার।’ পাঠকের আক্ষেপ—কে সেই ভাগ্যবতী যে জানে না তার নামে চিঠি লেখা হয় আকাশের ঠিকানায়! ‘কালো দিন’ গল্প শেয়ার বাজার লুটেরাদের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদপত্র। শেয়ার বাজার লুট করেন আরমান নামের এক কালোবাজারি। সর্বস্ব হারিয়ে আত্মহত্যা করেন এক বিনিয়োগকারী। আরমান সাহেবের মেয়ে সীন বিষয়টি জেনে নিজেও আত্মহত্যা করে। গল্পে লেখক আরমান সাহেবের যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে পাঠকের উদ্ধার করতে কষ্ট হবে না কে সেই কালোবাজারি। ‘বাঁশ’ একটি রূপক গল্প। বাঁশ গল্পে উঠে এসেছে সমাজের নানা অসঙ্গতি। এক কথায় বলা যায়, কুচক্রীদের বাঁশ দেওয়া ও নিরীহদের বাঁশ খাওয়ার বিষয়টি এখানে উঠে এসেছে। ‘জনগণের ক্ষমতা এখানেই। যারা আমাগো লগে নাই, আমরাও তাদের লগে নাই। আর এইডাই হইলো বাঁশ দেওয়া।’ ‘...তার মাথায় ঘুরপাক খায় গিন্নির কথা, বসের বিরক্তি। তবে তাদের বক্তব্য অসমর্থন করতে পারেন না। যারা বাঁশ দিয়ে বিদ্যুত্ লাইনে ঠেস দিতে বলে, তাদের তো বাঁশই প্রাপ্য।’ ‘মৌনতা’ গল্পে উঠে এসেছে একাকী জীবনের কথা। ‘ছুটির দরখাস্তখানা হাতে নেন ইমরান। সই করবেন কী করবেন না, বুঝতে পারছেন না। স্ত্রীর শরীর ভালো না তাতেই দুদিন ছুটি। কথায় কথায় ছুটি। একদিন দিলে হবে কি না—জিজ্ঞেস করতে চান তিনি। আবার থেমে গেলেন। ভাবলেন, পিয়ন যদি বলে বসে, আপনার তো বউ নেই স্যার। বউয়ের দরদ বুঝবেন কী?’ গল্পকার জামাল উদ্দীন কর্মজীবনে সংবাদকর্মী হওয়ায় জীবনকে দেখেছেন খুব কাছ থেকে। তাঁর গল্পে উঠে এসেছে সমাজের ননা অসঙ্গতি, উঠে এসেছে প্রতিবাদী কিছু চরিত্র। গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকটের বিষয়টি প্রায় প্রতিটি গল্পেই উঠে এসেছে। তাঁর গল্পে চাঁদের উপস্থিতি বেশি, নায়িকাদের সবার চেহারাই চাঁদের মতো গোলগাল!