আবাসন সংকটে ছাত্রী ও কর্মজীবী নারী

ভয়াবহ আবাসন সংকটে আছেন রাজধানীর শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী নারীরা। বাড়িভাড়া চাইতে গেলে মুখের ওপরে বাড়িওয়ালার ‘না’ বলে দেয়া। চাহিদার তুলনায় মেয়েদের হোস্টেলের সংকট, হোস্টেল কর্তৃপক্ষের অসৌজন্যমূলক আচরণ, অতি নিম্মমানের খাবার পরিবেশন, কথায় কথায় ভাড়া বাড়ানো এবং বাড়তি টাকা আদায়, প্রভাবশালীদের কারণে সরকারি হোস্টেলে প্রকৃত কর্মজীবীদের সিট না পাওয়া, আয়া-বুয়া ও পিওনদের দুর্ব্যবহার এবং অহেতুক নিয়ম-নীতির বাড়াবাড়িতে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী নারীরা। দেশের জেলা-উপজেলা শহরগুলো থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার মেয়ে রাজধানীতে আসছেন কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়তে। বাড়ির বাইরে এসে তারা প্রথম যে সমস্যাটির সম্মুখীন হন, তা হচ্ছে তাদের আবাসিক সমস্যা। অভিভাবকরা দুঃচিন্তায় থাকেন, মফস্বল শহর থেকে আসা মেয়েটি হটাত্ করে কোথায় থাকবে! কারণ রাজধানীতে আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় দু’একদিনের বেশি থাকা যায় না। বাসাভাড়া চাইতে গেলে বাড়িওয়ালা প্রথম কথা—‘ব্যাচেলর মেয়েদের বাড়ি ভাড়া দেয়া হয় না।’ বাড়িওয়ালার এমন আচরণের কারণে বাধ্য হয়েই, হোস্টেল হয়ে উঠে মেয়েদের একমাত্র সহায়। আর মেয়েদের সেই অসহায় অবস্থাকে পুঁজি করে রাজধানীর বেসরকারি হোস্টেলগুলো করছে রমরমা ব্যবসা। সৈয়দপুরের মেয়ে শাহীনা আক্তার। উচ্চ শিক্ষার্থে ঢাকা আসতে চাইলে বাদ সাধে তার পরিবারের অভিভাবকরা। অনেক কষ্টে বাবাকে রাজি করাতে পারলেও বেঁকে বসেন মা। এসব করতেই শাহীনার আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়া হয় না। অবশেষে তার জায়গা হয় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই সূত্রে তাকে দীর্ঘ কয়েকবছর থাকতে হয় একটি বেসরকারি হোস্টেলে। বর্তমানে শাহীনা এখন একটি ওষুধ কোম্পানিতে ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তবে এখনো তাকে থাকতে হচ্ছে হোস্টেলে। শুধু শাহীনা নয়, উচ্চ শিক্ষা নিতে আসা প্রায় সব শিক্ষার্থীর গল্প একই রকম। রাজধানীতে ব্যাঙের ছাতার মতো বেসরকারি ইউনিভার্সিটিগুলো গড়ে উঠলেও; সেসব প্রতিষ্ঠানে নেই আবাসিক ব্যবস্থা। এই সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের কথা মাথায় রেখে, রাজধানীর ফামগের্ট, পান্থপথ, বেইলী রোড, লালমাটিয়া, মোহম্মদপুর, মগবাজার, মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাট ও টিনসেট বাসাবাড়া নিয়ে হোস্টেল পরিচালনা করছেন কিছু ব্যবসায়ী। এসব হোস্টেল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী নারীদের সামান্য সুবিধার কথা মাথায় না রেখে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ে কেবল তারা ব্যস্ত। এসব হোস্টেলের বেশিরভাগেরই কোন রেজিস্ট্রেশন নেই। নেই তেমন কোন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, খাবারের মান অতি নিম্ম। বিভিন্ন অজুহাতে বাড়তি টাকা আদায়, জরিমানা, আর বছরে একাধিকবার কর্তৃপক্ষের খেয়াল-খুশি মতো ভাড়া বাড়ানো হয়। এসব হোস্টেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের রাখলেও কর্তৃপক্ষ ঈদ-পূজায় তাদের খেয়াল খুশিমত দীর্ঘমেয়াদি হোস্টেল বন্ধ দিয়ে রাখেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় সারা বছরেই পরীক্ষা লেগে থাকে এবং ছুটিও তারা খুব কম পান। অনুরূপ কর্মজীবীদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। কিন্তু হোস্টেল কর্তৃপক্ষ এসব বিষয় তোয়াক্কা না করে তারা কেবল তাদের ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত। এসব বিষয়ে কোন ধরনের অভিযোগ করলেই সিট বাতিল করার হুমকি দেন কর্তৃপক্ষ। হোস্টেলের লিফলেটে আকষর্ণীয় সুবিধাদির কথা লেখা থাকলেও বাস্তবে তার কোন কিছুই মেলে না বোডারদের জন্যে। রুম রেন্ট আকাশ ছোঁয়া। হার্ডবোর্ড দিয়ে ঘেরা সিঙ্গেল রুমের ভাড়া ৬ থেকে দশ হাজার টাকা। চারজনের রুম কিংবা ছয়জনের রুমের ভাড়া সর্বনিম্ন সাড়ে ৩ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। মাসের প্রথম সপ্তাহের একদিন পিছিয়ে গেলেই জরিমানা দিতে হয়। রাত আটটার একটু পরে হোস্টেলে ফিরলেই জরিমানা। এমনি হাজারো জরিমানা বাবদ দিতে হয় আরো বাড়তি টাকা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চমাপের খরচ আর হোস্টেল কর্তৃপক্ষের কথায় কথায় বাড়তি ভাড়ার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে মফস্বল শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। গাইবান্ধা থেকে পড়তে আসা সুরাইয়া ইসলামের বাবা শফিকুল ইসলাম বলেন, মেয়ের আগ্রহের দিকে তাকিয়ে ঢাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠিয়েছি। কিন্তু এখন দেখছি বাজেটের তুলনায় দ্বিগুণ টাকা প্রতিমাসে খরচ হচ্ছে। এখন না পারছি মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ করতে, না পারছি প্রয়োজনমত টাকার জোগান দিতে। তিনি আক্ষেপ করে এই প্রতিবেদককে বলেন, মধ্যবিত্তদের এসব সমস্যার কথা বলে কী হবে! মধ্যবিত্তের এ সব সমস্যা দেখার কেউ নেই! মহিলা বিষয়ক অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, কর্মজীবী নারীদের জন্যে রাজধানীতে মোট ৩টি সরকারি হোস্টেলের মধ্যে নীলক্ষেতে ৪৯৭, মিরপুর হোস্টেলে ১৪৫ এবং খিলগাঁওয়ে ১৮৮টি সিট রয়েছে। কিন্তু কর্মজীবী নারীদের আবাসস্থলের সংকট কাটাতে প্রয়োজন আরো কয়েকগুণ বেশি হোস্টেলের। তাছাড়া বেসরকারি হোস্টেলগুলোতে সিট পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় ৮ থেকে ১০টি ডকুমেন্টস জমা দিতে হয় যা একজন কর্মজীবী নারীকে যোগাড় করতে নানা ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। ফরম জমা দেয়ার পর প্রায় ৬ থেকে ৮ মাস লেগে যায় সিট পেতে। তাই সরকারি হোস্টেলে সিট এখানকার কর্মজীবী নারীদের কাছে রীতিমত সোনার হরিণ বলে জানন ভুক্তভোগী বোর্ডাররা।