অবৈধ গ্যাস সংযোগ বৈধ করতে চলছে টাকার খেলা

অবৈধ গ্যাস সংযোগে ছেয়ে গেছে। যে যার ইচ্ছেমত এখনও অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিচ্ছেন। দালাল, ঠিকাদার, তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী আর একশ্রেণীর অসাধু ব্যক্তি মিলে গড়ে তুলেছে চক্র। শুধু আবাসিক নয়, কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠানও ছোট কমেপ্রসার বসিয়ে অবৈধভাবে গ্যাস টেনে নিচ্ছে। অনুমতি না থাকলেও সিএনজি স্টেশনগুলো যানবাহন ছাড়াও বোতলে করে গ্যাস বিক্রি করছে। সরেজমিন ঘুরে এবং তিতাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এই পরিস্থিতি জানা গেছে। অবৈধ গ্যাস লাইনের কারণে বড় ধরনের বিপদ হওয়ার আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। যেসব পাইপ বা অন্য যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে তা মানসম্মত নয়। ফলে এইসব পাইপ ছিদ্র হয়ে গ্যাস বের হতে পারে। এমন অবৈধ লাইন হাজার হাজার কিলোমিটার হতে পারে বলে মনে করেন তিতাসের কর্মকর্তারা। কিছু কিছু অবৈধ সংযোগের এমন অবস্থা যে, বৈধ করার যে সুযোগ দেয়া হয়েছে তাতেও লাভ হচ্ছে না। কারণ সে সব অবৈধ লাইনে মানসম্মত পাইপ আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার কোন উপায় নেই। ফলে সেগুলো বিপজ্জনক। বিপজ্জনক পাইপে বৈধ সংযোগ দিতে সম্মত হচ্ছেন না প্রকৌশলীরা। অবৈধ সংযোগ বৈধ করার ঘোষণা দিয়ে আবেদন জমা নেয়া হয়েছে। কিন্তু অবৈধ সংযোগ বৈধ করা শুরু হয়নি। এজন্য অবৈধ সংযোগ বৈধ করার ঘোষণার পরেও অনেকে নিজেদের ইচ্ছেমত লাইন টেনে সংযোগ নিয়েছেন। এখনও নিচ্ছেন। আর এই অবৈধ সংযোগকে ঘিরে চলছে হাজার হাজার টাকার লেনদেন। সাধারণ এক বা দুই চুলার জন্যই দিতে হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। কোন কোন ক্ষেত্রে ৫০ হাজার, এক লাখ টাকাও লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজধানী ঢাকা, সাভার ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এই পরিস্থিতি দেখা গেছে। তিতাসের আঞ্চলিক কয়েকটি অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, বৈধ-অবৈধ সব লেনদেন চলছে প্রকাশ্যেই। বহু ঠিকাদার আর দালালে ভরা তিতাসের স্থানীয় অফিসগুলো। কে কর্মকর্তা বা কর্মচারী, কে তিতাসে চাকরি করেন বা করেন না, তা বোঝা মুশকিল। দালাল আর ঠিকাদার ছাড়া দরজা দিয়ে ঢোকা কষ্টকর। এর ফলে অনেক সময় সত্যিকারের ঠিকাদার চিনতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে অনেককে। অনেকে দালালকে ঠিকাদার ভেবে কাজ দিচ্ছেন। অনেক ঠিকাদার নিজেই দালাল হয়ে আবির্ভূত হচ্ছেন। অনেকে কম টাকা নিয়ে কাজ শুরু করছেন। পরে মাঝ পথে গিয়ে বলছেন আরো টাকা দিতে হবে। বাধ্য হয়ে আরো টাকা দিতে হচ্ছে। আর এ সবকিছুই হচ্ছে মৌখিক চুক্তিতে। ফলে ঠিকাদারদেরকে অকাট্য প্রমাণের মাধ্যমে ধরাও সম্ভব হচ্ছে না। তিতাস গ্যাসের সাভার আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের সামনে গেলেই অর্থের দরকষাকষি আর গ্রাহকদের ভোগান্তি চোখে পড়ে। যার কাছ থেকে যেমন অর্থ আদায় করা যায় তাই নেয়া হচ্ছে। টাকা নেয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। পেট্রোবাংলার নিয়ম অনুযায়ী ঠিকাদার ছাড়া সংযোগ নেয়ার কোন উপায় নেই। তাই ঠিকাদারের কাছে যেতেই হয়। এজন্যই বেশি অর্থ আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। ঠিকাদারদের কাছেই যেন জিম্মি তিতাস ও গ্রাহকরা। আর ঠিকাদারদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন তিতাসের চাকরিজীবীরা। এজন্য ঠিকাদাররা হুমকি দিয়ে বেশি টাকা আদায় করছেন। এমনই ঠিকাদারের হুমকির শিকার শহীদ আনোয়ার। শহীদ আনোয়ারের দুই চুলা আছে। তিনি আরো দুই চুলা নিতে চান। এরজন্য ঠিকাদারের শরণাপন্ন হলে তিনি অতিরিক্ত অর্থ চান। তা দিতে সম্মত না হলে তার পুরো সংযোগই বিচ্ছিন্ন করে দেবেন বলে হুমকি দিয়েছেন ঐ ঠিকাদার। সাভার ঠিকাদার সমিতির সভাপতি ও মেসার্স আকাশ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. নজরুল ইসলাম শোভা ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা গ্রাহককে কম টাকায় সংযোগ পেতে সহায়তা করি। অনেক সময় তিতাসের কর্মকর্তাদের কারণে বেশি টাকা নিতে হয়। তবে এখন এক বা দুই চুলার জন্য ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা নিচ্ছি। এরমধ্যে খরচ বাদ দিয়ে খুব বেশি লাভ থাকে না।’ তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির তালিকাভুক্ত এক ঠিকাদার একটি রাইজারসহ তিন চুলায় সংযোগ দিতে ৪০ হাজার টাকা চাইলেন। গাজীপুর গিয়ে জানা গেল, কেউ কেউ তিনশ ফুট লম্বা পাইপ লাইন স্থাপন করে গ্যাসের অবৈধ সংযোগ নিয়েছেন। অনেকে এখনও সংযোগ নেননি। কিন্তু অবৈধ সংযোগ আছে বলে আবেদন করেছেন। নিশ্চিত পাওয়ার আশায় বৈধ সংযোগের আবেদন না করে অবৈধ সংযোগের জন্য আবেদন করা হচ্ছে। গ্রাহকদের মধ্যে নানা প্রচারণা চালিয়ে অবৈধ সংযোগ নিতে ঠিকাদাররাই মূলত উত্সাহিত করছেন। কিছু অসাধু গ্রাহকও আছে। তারা সব জেনেই অবৈধ সংযোগ নিচ্ছেন। আবার আবাসিক সংযোগ নিয়ে বাণিজ্যিক কাজেও ব্যবহার করার নজির আছে। এই অবস্থা শুধু সাভার বা গাজীপুরে নয়। গ্যাসের আঞ্চলিক যত বিপণন বিভাগ আছে সবগুলোতেই একই চিত্র। ঢাকার বাড্ডা, মতিঝিলসহ কয়েকটি আঞ্চলিক বিপণন বিভাগ ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে। সরকার নির্ধারিত মূল্য ঠিক করা আছে ঠিকাদারের জন্য। কিন্তু সে অর্থে কাজ করেন এমন একজনও পাওয়া গেল না কয়েকটা তিতাস কার্যালয় ঘুরে। এ নিয়ে তিতাসের বা পেট্রোবাংলার উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাথাব্যথাও নেই। এ বিষয়ে তারা সবই জানেন কিন্তু সমস্যা সমাধানে কোন উদ্যোগ নেই। কারণ প্রকাশ্যেই হচ্ছে এসব। যে কোন তিতাস বিপণন কার্যালয়ে যে কোন সময় গেলে অবৈধ আর ভোগান্তির চিত্র দেখা যাবে। গ্যাস সংযোগের চাহিদাপত্র (ডিমান্ড নোট) নিতে গেলে ঠিকাদার লাগবেই। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এই ঠিকাদার ছাড়া চাহিদাপত্র হবে না। ফলে তারা তাদের ইচ্ছেমত দাম হাঁকিয়ে টাকা নিচ্ছেন। গাজীপুর অফিসে গ্যাস সংযোগ নিতে আসা একজন গ্রাহক জানান, ‘তিতাসের সংযোগ পেতে মূল হচ্ছে ঠিকাদার। তাই ঠিকাদাররা তাদের ইচ্ছেমত টাকা চায়। দরদাম করে যে যেভাবে পারে সেভাবে এখন গ্যাসের সংযোগ নিচ্ছে। আগে থেকে সংযোগ নিয়েছিলাম। এখন টাকা দিয়ে অনুমতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবে গ্যাস ব্যবহার করার জন্য এসেছি।’