ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র তৃণমূলের বাতিঘর

যশোর সদর উপজেলার পতেঙ্গালী গ্রামের তরুণ এস এম আরিফুজ্জামান। ১৯৯৬ সালের শেষের দিকে যশোর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে সিভিলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাঘ করে সাব-অ্যাসিসট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০০১ সালে কম্পিউটারে হাতেখড়ি হয় তার। এরপর কম্পিউটার শিখে গ্রামের শিশুদের জন্য গড়ে তুলেন একটি কম্পিউটার স্কুল। সেই সময়ে গ্রামের মধ্যে এমন উদ্যোগে সবার কাছ থেকে উপহাসই পেয়ে এসেছেন আরিফ। তবে দমে যান নি। পরে বিএ এবং এমএ পাস করার পর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে কম্পিউটারের উপর ৬ মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর নিজ উদ্যোগেই গড়ে তোলেন একটি আইটিনির্ভর তথ্য কেন্দ্র। সে সময়েও সাড়া পান নি সবার কাছে; কিন্তু মনোবল হারাননি তিনি। ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন দেশব্যাপী ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্রের উদ্বোধন করলেন, তখন তার ইউনিয়নে তার তথ্য কেন্দ্রটিই পরিচিত হয়ে ওঠে আরবপুর ই-সেবা কেন্দ্র নামে। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি আরিফুজ্জামানকে। তার তথ্য কেন্দ্রটি ইউআইএসসি (ইউনিয়ন ইনফরমেশন সার্ভিস সেন্টার) সেন্টারের একটি মডেল হিসেবে পরিগণিত হয়। বিশ্ব ব্যাংক থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এই সেবা কেন্দ্রটি নিয়মিত পরিদর্শন করে থাকেন। সেই হিসেবে সফলতার পথেই রয়েছেন আরিফুজ্জামান। ২০১০ সালে সরকারের উদ্যোগে সারাদেশে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র (ইউআইএসসি) চালুর ব্যবস্থা নেয়া হলে আরিফুজ্জামানের মতো হাজারো তরুণ এই কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এসব তরুণের হাত ধরেই এখন প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তির সেবা। একটা সময়ে ইউনিয়ন পর্যায়ের একজন মানুষের সরকারি কোনো ধরনের তথ্য প্রয়োজন হলে থানা শহরে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে জেলা শহরে দৌড়াতে হতো। সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে ইউআইএসসির বদৌলতে। এখন ইউনিয়নে ইউনিয়নে তথ্য কেন্দ্রে মানুষের ভিড়। সরকারিভাবে বিদেশে যাওয়ার জন্য চাকরির আবেদন থেকে শুরু করে কোনো কিছু প্রিন্ট করার জন্য এখন ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্রেই ছুটছে মানুষ। আর এসব মানুষকে সেবা প্রদানের জন্য তথ্য কেন্দ্রের মূল উদ্যোক্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তরুণরাই। শুরুর দিকে নানা ধরনের প্রতিকূলতা কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত সেবা যখন ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের কাছে, তখন সবাই একে স্বাগত জানিয়েছে। এখন জরিনা বেগমরা চুলায় ভাত চাপিয়ে ইউআইএসসিতে বিদ্যুত্ বিল দিয়ে বাড়ি ফিরে ভাতের মাড় গালেন; বীথিকা ভট্টাচার্যরা বিদেশ বিভূঁইয়ে থাকা স্বজনদের সাথে কথা বলেন স্কাইপের মাধ্যমে, মরিয়ম বেগমরা মসলার কৌটায় জমানো টাকা শিক্ষার্থী সন্তানদের কাছে নিজ হাতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠান, দ্বারে দ্বারে ঘোরা সুফিয়া বেগমরা জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করে বয়স্ক ভাতা লাভ করেন, স্কুল ছাত্রী তমা-নিশি-সোনিয়ারা বখাটেদের উত্পাতে জেলা বাতায়নে অভিযোগ করে প্রতিকার পায়, রেশমা-তানিয়ারা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিয়ে খুঁজে পায় কর্মসংস্থান, বিদেশ প্রবাসী স্বামীর কাছে সদ্য প্রসূত সন্তানের ছবি মেইল করে পাঠাতে পেরে শাড়ির আঁচলে চোখ মোছেন হেনা খাতুনরা, পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্টের দিন রেজাল্ট দেখতে ইউআইএসসিতে জমা হন হাজারও মানুষ। এ রকম শত চিত্র নিয়ে এগিয়ে চলেছে ইউআইএসসির সেবা কার্যক্রম। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রামে’র কমিউনিকেশন অফিসার হাসান বেনাউল ইসলাম জানান, দেশের মোট ৪,৫৪৬টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৪,৪১৬টি ইউনিয়নে রয়েছে তথ্য ও সেবা কেন্দ্র। এ পর্যন্ত ৫০ লাখ মানুষকে সেবা প্রদান করেছে এই কেন্দ্রগুলো। এর সাথে জড়িত রয়েছেন ১০ হাজারেরও বেশি তরুণ উদ্যোক্তা। এই সেবা কেন্দ্রগুলো দিয়েই মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু সাড়ে ১৪ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছেন। বেনাউল আরো জানান, সেবা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৩ হাজার ৬০০ কেন্দ্রেই চালু রয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং। ফলে এসব কেন্দ্র থেকেই প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন। পাশাপাশি ২৭৬৮টি কেন্দ্রে রয়েছে জীবন বীমা সুবিধা গ্রহণের সুযোগ। এ পর্যন্ত এই ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্রগুলো থেকে ৪ লাখ জমির পর্চা প্রদান করা হয়েছে। আর এসব সেবা দিয়ে তরুণরা এ পর্যন্ত ১৩২ কোটি টাকা উপার্জন করেছে। এখন সেবার সাথে পাল্লা দিয়ে সমৃদ্ধ হচ্ছে ইউআইএসসি। দেশের সীমানা পেরিয়ে আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে পরিচিতি পাচ্ছে ইউআইএসসি। এত গুণীজন এসেছেন এখানে, যাদের দেখতে পাবেন তা কল্পনাতেও আনতে পারেন নি গ্রামের মানুষ। জাতিসংঘ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এডিবিসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সুধীজনদের প্রতিনিয়ত পদধুলি পড়ছে ইউআইএসসিগুলোতে। তৃণমূলের সাধারণ মানুষের বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটে না। আর সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, এত বড় বড় মানুষ এসে জড়ো হচ্ছেন কিন্তু গ্রামের কোনো এক সাধারণ তরুণের উদ্যোগের মঞ্চেই।