একজন গরীব লোক গৌতম বুদ্ধকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আমি এত গরীব কেন? ‘কারণ, তুমি দান করো না এবং করতেও জানো না,’ উত্তরে বলেছিলেন গৌতম বুদ্ধ। ‘আমার তো দান করার মতো কিছু নেই। ব্যথিত হয়ে বলেছিলেন লোকটি। ‘দান করার মতো অনেক কিছুই আছে তোমার কাছে, যা ধনী-গরীব কারো কাছেই কম নেই। তা হলো- চেহারা: যা দ্বারা তুমি সুখ ও আনন্দের হাসি উপহার হিসেবে অন্যদের দিতে পারো। মুখ: যা দ্বারা তুমি মাধুর্যপূর্ণ ভালো কথা বলে মানুষকে আনন্দ ও উত্সাহ দিতে পারো। হূদয়: যা তুমি আন্তরিকতা ও উদারতা দ্বারা অন্যদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারো। চোখ: যা দ্বারা তুমি দয়া ও ভালোবাসার সাথে অন্যদের দেখতে পারো। দেহ: যা দ্বারা তুমি নিজের শ্রমের মাধ্যমে অন্যদের সাহায্য প্রদান করতে পারো। ‘আর তাই তো তুমি একেবারেই গরীব নও। মূলত হূদয়ের দারিদ্র্যই প্রকৃত দারিদ্র্য। আর্থিক দরিদ্রতা মূল দরিদ্রতা নয়।’
বুদ্ধদেবের কথাগুলোর অন্য অর্থ করলে বোঝা যায় মানবীয় গুণাবলীর পূর্ণ বিকাশই দানের প্রকৃত রূপ। মানুষ যখন নিজের আচার ব্যবহার এবং কর্মকাণ্ডে অন্যকে মুগ্ধ করবে তখন পৃথিবীতে তার জীবন যাপন আনন্দময়, সহজ ও সচ্ছল হয়ে উঠবে। পরোপকারী ব্যক্তি সর্বদাই তার সাহায্যকারী এবং শুভাকাঙ্ক্ষী পেয়ে যান। কখনোই তার জীবনের অভাব নামক বস্তু প্রভাব ফেলতে পারে না। আমি বাস্তব জীবনে দেখেছি কোনো বাড়ির বিশ্বস্ত ভৃত্যকে তার মালিক বিশ্বস্ততার প্রতিদান হিসেবে জীবনভর ভালোভাবে চলার জন্যে নিজের সম্পত্তি থেকে বেশ কিছু অংশ দান করে গেছেন। এই প্রাপ্তি আসলে ভৃত্যের দানের প্রতিদান। প্রত্যেকের কর্মক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত দানের সুযোগ রয়েছে। আমরা যদি কর্মক্ষেত্রে আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সচেতনতার সাথে হাসিমুখে পালন করি তাহলে অবশ্যই কর্মক্ষেত্রে সফলতা আসবে। জাতীয় দৈনিকে প্রায়ই খবরের শিরোনাম হয় সরকারি চাকরিরত অনেক পেশার মানুষই কর্মক্ষেত্রে বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকেন। এক্ষেত্রে ডাক্তার এবং শিক্ষকদের কথা বেশি শোনা যায়। যা আমাদের সবাইকে ব্যথিত করে। কারণ প্রখর মেধাসম্পন্ন ডাক্তার বা শিক্ষকরা জনসেবা ও জাতি গঠনের উদ্দেশ্যে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। তাদের কিছু সংখ্যক ব্যক্তির বিবেচনাবোধের অভাবে ডাক্তার ও শিক্ষকদের সম্পর্কে আমাদের সমাজে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমার মতে, ডাক্তার ও শিক্ষকদের দান করার সুযোগ সবচাইতে বেশি। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লুটে শেরিং-এর একটা উক্তি আমার কানে বাজে: ‘ভালো ডাক্তার হতে হলে ভালো মানুষ হওয়া চাই। আমাদের মনে রাখতে হবে একজন রোগী জীবনের সংকটময় মুহূর্তে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। তাই সময়মতো ডাক্তারের উপস্থিতি একান্তভাবে কাম্য।’ তবে আমাদের সমাজে ডাক্তারদের একনিষ্ঠতা ও একাগ্রতার চিত্রও রয়েছে। ২/৫/২০১৯ তারিখে একটি জাতীয় দৈনিকের খবরের শিরোনাম: ‘শিশুবিশেষজ্ঞ ডাক্তার রকিউরকে বদলি, ভেড়ামারায় চরম ক্ষোভ’। এলাকাবাসীর বর্ণনা মতে ডাক্তার রকিউর ছিলেন শিশু রোগীদের ত্রাণকর্তা। তার হাতের ছোঁয়ায় বহু শিশু মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছে। তার সুনামের কারণে ভেড়ামারা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী এলাকার শিশু রোগীরাও এই হাসপাতালে আসতো। চিকিত্সা বিষয়ে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ এবং একাগ্র। তার ধ্যান-জ্ঞানই ছিলো মানবতার সেবার মাধ্যমে দানের মাহাত্ম্যকে সমুন্নিত রাখা। আমার মতে সমালোচিত ডাক্তাররাও মেধাবী এবং প্রত্যয়ী। শুধু তাদের অনুধাবন করতে হবে একাগ্রচিত্তে কর্মের মধ্যে সাধিত হবে দান। এই দানই তাদেরকে করবে সুখী, সচ্ছল ও সম্মানজনক জীবনের অধিকারী। মনোজগতের এমন পরিবর্তন সাধিত হলে প্রত্যেকটি চিকিত্সালয় হয়ে উঠবে এক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনরক্ষা কেন্দ্র।
আমি শিক্ষক। শিক্ষক হিসেবে দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলতে পারি ভালো শিক্ষক হতে হলে প্রথমে ভালো মানুষ হওয়া চাই। আমাদের উচিত ফাঁকি না দিয়ে শিক্ষাক্রম পরিচালনা করা। এটাই আমাদের জন্য ইবাদত।
n লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর-১৭০৭