কারাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠছে কিশোরগঞ্জের কিশোরীরা

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার গাইটাল এলাকার কিশোরী রুপা আক্তার। তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া বাধে তার বন্ধুদের। এর জের ধরেই পুরাতন কোর্ট এলাকার কয়েকজন মাস্তান মার্কা ছেলে রুপার ভাইকে বাড়ির সামনে থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে। এ ঘটনাটি দেখতে পেয়ে রুপা তার কারাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বান্ধবী শিল্পীকে নিয়ে তাদের প্রতিহত করার চেষ্টা করে। প্রথমে মাস্তানরা তাদের পাত্তা দেয়নি। পরে শিল্পী তার প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এক বখাটের শার্টের কলার ধরে হুড়হুড় করে মাইক্রো থেকে টেনে নামায়। অন্য একজন তাকে বাধা দিতে আসলে তাকে কনুই দিয়ে ঘায়েল করে মাটিতে ফেলে দেয়। পরে রুপা তার ভাইকে মাইক্রো থেকে নামিয়ে আনে। অবস্থা বেগতিক দেখে মাস্তানরা মাইক্রো নিয়ে দ্রুত কেটে পড়ে। এভাবেই শিল্পী একটি অপরাধ সংঘটনের আগেই শারীরিক ক্রীড়াশৈলী প্রয়োগ করে তা ব্যর্থ করে দেয়। মিসরাত জাহান ওরফে শিল্পী এই প্রতিনিধিকে জানান, তার বাবা নেই। প্রায়শই রাস্তা-ঘাটে তাকে একা একাই চলাফেরা করতে হয় এবং নানারকম প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। মা রাহেমা বেগমের উত্সাহেই সে কারাতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। এলাকার লোকজন এটাকে প্রথমে ভালো চোখে দেখেনি। নানারকম কটূ মন্তব্য করতো। কিন্তু তাতে সে পিছপা হয়নি। সে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নারী উদ্যোগ কেন্দ্রের (নউক) সঙ্গে যোগাযোগ করে কারাতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। শিল্পী জানায়, আগে সে শারীরিকভাবে খুব দুর্বল ছিল। প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার পর তার শারীরিক ও মানসিক শক্তি এবং আত্মবিশ্বাস দারুণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সে এখন নিয়মিত অন্যদের কারাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। প্রায় একই কথা জানাল ভোকেশনালের ছাত্রী সুরমা আক্তার। সে-ও কারাতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। হালকা পাতলা গড়নের মেয়ে হলেও সুরমা দৃঢ় মনোবলের অধিকারী। সে একাই কয়েকবার রাস্তা-ঘাটে ছোট-খাট বিপদ মোকাবেলা করেছে বলে জানাল। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তাসনিয়া তানজিন তূর্ণার বাবা মো. মজিবুর রহমান গোলাপ জানান, তার মেয়ে জেলা স্মরণী উচ্চ বিদালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী। বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। কিন্তু মেয়ে স্কুলে যাবার জন্য বাড়ি থেকে বের হবার পর ঘরে না ফেরা পর্যন্ত আর পাঁচজন মেয়ের অভিভাবকের মতো টেনশন করার কথা থাকলেও উনারা তা করেন না। কারণ তারা নিশ্চিত যে, ছোটখাট অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এখন নিজেই সামাল দিতে পারার মতো মনোবল ও দক্ষতা তাদের কন্যার জানা আছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নারী উদ্যোগ কেন্দ্র (নউক) সমাজের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা ছাড়াও নারীর প্রতি যে কোন সহিংসতা রোধকল্পে নারীর ক্ষমতায়ন এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯১ সাল থেকে নারী শিক্ষা সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রীদের জেন্ডার ও মানবাধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। তাছাড়াও ২০০৮ সাল থেকে স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে ছাত্রীদের উত্ত্যক্তকরণ ও ইভটিজিংয়ের সমস্যার প্রেক্ষিতে নারীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে অধিকতর শক্তিশালী করে তোলার লক্ষ্যে মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রীদের কারাতে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। নারী উদ্যোগ কেন্দ্র প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু কিশোরগঞ্জ জেলায় এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে জেলার পাঁচ উপজেলায় কারাতে প্রশিক্ষণ চলছে। এ পর্যন্ত জেলায় মোট ৭৩০ জন স্কুলছাত্রী কিংবা স্কুল থেকে ঝরে পড়া সুবিধাবঞ্চিত কিশোরীকে কারাতে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছে কিশোরগঞ্জ সদরে ২৬০ জন, পাকুন্দিয়ায় ১৬০ জন, হোসেনপুরে ১০০ জন, করিমগঞ্জে ৭৫ জন, নিকলীতে ৭৫ জন ও কটিয়াদীতে ৬০ জন। প্রতি ব্যাচে ২৫ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। মোট ক্লাস চলে ৪৮টি। সাধারণত: বিদ্যালয় আঙ্গিনাতেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। বন্ধের দিন কিংবা স্কুল ছুটির পর প্রশিক্ষণ চলে। নারী উদ্যোগ কেন্দ্র কিশোরগঞ্জ জেলা ছাড়াও দেশের আটটি জেলায় গার্ল পাওয়ার প্রজেক্টের ৯টি সহযোগী সংস্থাকে কারাতে প্রশিক্ষণ পরিচালনায় কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করছে। ইতিমধ্যে উল্লেখিত জেলাসমূহে মোট ৬০০ কিশোরীকে কারাতে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। গাজীপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্ল্যান বাংলাদেশের আর্থিক সহযোগিতায় জেলার ৮টি স্কুল ও ২টি কলেজে মোট ৪০০ ছাত্রীদের কারাতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে নারী উদ্যোগ কেন্দ্র কারিগরি সহায়তা প্রদানের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। নারী উদ্যোগ কেন্দ্রের (নউক) গার্ল পাওয়ার প্রজেক্টের প্রকল্প সমন্বয়কারী সাকের আহম্মেদ জানান, কারাতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের বিষয়টি পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ইতিমধ্যে তাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তিন কারাতে বালিকা নেপালে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে ভালো ফলাফল বয়ে এনে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। নউক-এর নির্বাহী পরিচালক মাশহুদা খাতুন শেফালী জানান, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে, নারীদের নেতৃত্ব বিকাশে, আত্মরক্ষার্থে, আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মান বাড়ানোর জন্য কারাতে প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই। তিনি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের জন্য কারাতে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার জন্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।