দারিদ্র্য জয়ের লক্ষ্যে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা বিল

এগিয়ে যাচ্ছে ভারত— এর উন্নতির কথা বলতে বলতে অনেকে মুখে ফেনাও তুলছেন; কিন্তু ভারত বিষয়ক কিছু উপাত্ত জানার পর মন খারাপ হয়ে যেতে বাধ্য। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ৭৯টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ৬৫। সরকারের হিসেব অনুযায়ীই তাদের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর প্রায় অর্ধেক মারাত্মক অপুষ্টির শিকার। ২০০৫ থেকে ২০১০— এই সময়ে কম ওজনের শিশুর প্রশ্নে ১২৯টি দেশের মধ্যে ভারত নিচের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। তাদের উপরে ছিল ইথিওপিয়া, নাইজার, নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দেশ। এক দশক আগের একটি জরিপে দেখা গিয়েছিল, ভারতে সন্তান জন্মদানের বয়সসীমার ৩৬ শতাংশ নারীই কম ওজন বিশিষ্ট। অথচ এ সংখ্যাটা তেইশটি সাব-সাহারান দেশের বেলায় ছিল ১৬ শতাংশ। ক্ষুধা, অপুষ্টি তথা দারিদ্র্যকে জয় করার লক্ষ্যে গঠিত ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা বিল নিয়ে আলাচনা-সমালোচনা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। অনেক টানাপড়েনের পর এই বিল নিয়ে অধ্যাদেশের পথে হেঁটে ছিল মনমোহন সরকার। বিরোধীদের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও সেই বিল এবার উচ্চ কক্ষে পাস হয়েছে। কাজেই বিল কার্যকর হওয়ার পথে এখন কার্যত কোন বাধাই থাকলো না। রাষ্ট্রপতির সই, তাও হয়ে যাবে খুব শীঘ্রই। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ এখন পর্যন্ত এতো বড় খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি হাতে নেয়নি। প্রায় সোয়া এক লাখ কোটি রুপির খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পে সরকারের খাদ্য ভর্তুকি অন্তত ৪৫ শতাংশ বেড়ে যাবে। এই প্রকল্পে প্রতি মাসে তিন রুপি কেজি দরে মাথাপিছু পাঁচ কেজি চাল, দুই রুপি কেজি দরে গম এবং এক রুপি কেজি দরে ভুট্টার মতো খাদ্যশস্য পাওয়ার হকদার বনে যাবে দেশের ৭০ শতাংশ লোক। সরকারকে এখন ৭০ লাখ টন খাদ্যশস্য অধিগ্রহণ করতে হয়। খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পের জন্য ৬ কোটি ২০ লাখ টন খাদ্যশস্যের প্রয়োজন পড়বে। একেবারে গরিব তালিকাভুক্ত আড়াই কোটি পরিবার অবশ্য অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনার আওতায় মাসে ৩৫ কেজি করেই খাদ্যশস্য পাবে। বিল পাসের পরেও প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হতে হতে আরো কয়েক মাস পেরিয়ে যাবে বলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ধারণা। কারণ কারা এই প্রকল্পের আওতায় পড়বেন, রাজ্য সরকারকে সেই তালিকা চূড়ান্ত করতে হবে। তার মানে, গোটা দেশে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হতে লাগবে আরো অন্তত মাস ছয়েক। বিল পাস হওয়ার কারণে দেশের উপচে পড়া সঞ্চয় কেন্দ্রগুলো থেকে বিপুল পরিমাণের খাদ্যশস্য দেশের ১২০ কোটি লোকের ৭০ শতাংশের কাছে ৯০ শতাংশ ভর্তুকিতে পৌঁছে যাওয়ার স্বীকৃতি পেয়েছে। কংগ্রেস পার্টির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন কোয়ালিশন সরকারের জন্য এটি হতে পারে বিরাট এক সফলতা। ধারণা করা হচ্ছে, ২০১৪ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে এবং ভোটযুদ্ধে আবারো জিতে যেতে পারে কংগ্রেস। ভারতের ৫০ শতাংশ শহুরে বাসিন্দা এবং ৭৫ শতাংশ গ্রামীণ জনগণ সস্তায় গম, চাল ও ভুট্টার মতো মোটা খাদ্যশস্য পাওয়ার অধিকার রাখে এখন। সমালোচকরা বলছেন, এতে করে খাদ্য বাবদ সরকারের ভর্তুকি খরচ আরো বেড়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে বাড়বে বাজেট ঘাটতি। এই মুহূর্তে ভারত সরকারের ভর্তুকি বাবদ ব্যয়ের ৪০ শতাংশেরও বেশি হয় খাদ্য বাবদ। গত অর্থ বছরে এ খাতে খরচের পরিমাণ ছিল ১.০ ট্রিলিয়ন ভারতীয় রুপি (১৮.৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)। খাদ্যমন্ত্রী কে.ভি থমাস এ সম্পর্কে গত ফেব্রুয়ারির শুরুতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘নানা চিন্তা-ভাবনা করেই আমরা এ ধরনের বিল পাসের উদ্যোগ নিয়েছি। আশা করি, কেউই তেমন বিরোধিতা করবে না।’ খাদ্য নিরাপত্তা বিল পাস হওয়ার কারণে ভারতীয় রাজনীতির জন্য সংসদের চলতি বাদল অধিবেশনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে এই বিলটি সংসদীয় প্যানেলে প্রথম উপস্থাপিত হয়েছিল ২০১১ সালের ডিসেম্বরে। বিলটি সংসদে উপস্থাপনে দেরি হওয়ার পেছনে যাচাই-বাছাই ছাড়াও অন্য কারণ ছিল। বেশ কয়েকটি রাজ্য সরকার সুবিধাভোগীদের সংখ্যা এবং বিতরিত হবে এমন খাদ্যশস্যের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। তবে তামিলনাড়ু ছাড়া বাকি সব রাজ্যই বিলের ব্যাপারে তাদের আপত্তি তুলে নিয়েছিল। অনেকে বলছেন, এই সোয়া এক হাজার কোটি রুপিই যদি রাস্তাঘাট, বিদ্যুত্, বিদ্যালয় ও আইন-শৃঙ্খলার পেছনে খরচ করা হয় তাহলে বেশি সুফল আসবে। এতে করে উদ্যোক্তারা নতুন ব্যবসা খোলার জন্য উত্সাহিত হবে। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হবে দীর্ঘস্থায়ী চাকরি, বাড়বে সরকারের কর রাজস্ব। এবং এতে করে বাড়বে লোকজনের জীবনমান। তাদের কথা মতে, খাদ্য নিরাপত্তা বিলের মাধ্যমে কাজের কাজ কিছুই হবে না: বাড়বে দুর্নীতি ও কালোবাজারি। ভারতে রেশনের দোকানগুলো থেকে প্রায় অর্ধেক সামগ্রী সরিয়ে নেয়া হয়। তারপর বিক্রি হয় খোলাবাজারে। তাছাড়া কয়েকটি রাজ্য খাদ্যশস্য বাবদ ব্যাপক ভর্তুকি দেয়া সত্ত্বেও কমাতে পারছে না অপুষ্টিতে আক্রান্ত লোকের সংখ্যা। অনেকে বলছেন, সস্তায় খাদ্যশস্যের বদলে নগদ অর্থ দিয়ে সাহায্য করলেই বরং বেশি ফল পাওয়া যাবে। আসলে ভোটের যুদ্ধে জিততেই কংগ্রেস সরকার জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা বিলটি সামনে নিয়ে এসেছে। তবে বিলের একটি দিক খুবই ভাল— শিশু, গর্ভবতী ও স্তন্যপান করানো মায়েদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অনেক সমালোচনা সত্ত্বেও খাদ্য নিরাপত্তা বিল উপস্থাপনের উদ্যোগ নেয় কংগ্রেস সরকার। নানা চিন্তা-ভাবনা থেকেই তাদের এমন সিদ্ধান্ত ছিল। অপুষ্টি ভারতীয়দের কাছে নতুন কোন বিষয় নয়। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রদত্ত ২০১১ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে দেখা যায়, ভারতের ৬০ মিলিয়ন শিশু কম ওজন ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত। আর মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ অপুষ্টির শিকার। বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্ট অনুসারে, ব্যাহত শারীরিক প্রবৃদ্ধি, আয়োডিন ও আয়রনের ঘাটতিতে উত্পাদনশীলতার ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ৩ শতাংশের সমান। ঔপনিবেশিক আমলের দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টির কথা না হয় মানা যায়; কিন্তু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বর্তমান ভারতে অপুষ্টির বিষয়টি কিছুতেই মানা যায় না। সেজন্যই আইন প্রণেতা ও অর্থনীতিবিদদের কাছে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এই অপুষ্টি। খাদ্য নিয়ে দুর্ভোগের চিত্রটা ভারতে নতুন নয়। এখানে শেষ মহাদুর্ভিক্ষ হয়েছিল ১৯৪৩ সালে। ভারতের নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ তার ‘পোভার্টি এন্ড ফ্যামিনস’ শিরোনামের কেইস স্টাডিতে দেখিয়েছেন, ওই দুর্ভিক্ষে খাদ্যাভাবের অবদান খুব কমই ছিল। বড় ভূমিকা রেখেছিল হস্তক্ষেপ করা যায় এমন অর্থনৈতিক ফ্যাক্টরগুলো, যেমন— বেকারত্ব, হ্রাসমান মজুরি এবং দুর্বল খাদ্য বিন্যাস ব্যবস্থা। ভারতের বর্তমান অপুষ্টি সমস্যা অনেকটা সেরকম। এমনটা নয় যে, শুধু পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের অভাবেই তারা অপুষ্টির শিকার। বরং বলা যায়, ফুড সাপ্লাই চেইনের দুর্বলতার কারণেই অপুষ্টিতে আক্রান্ত লোকের সংখ্যা দিনে দিনে আরো বাড়ছে। একটি উদাহারণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে— ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল এশিয়া রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, ভারতে উত্পাদিত মোট টমেটোর বিশ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায় পথিমধ্যে। তার ওপর রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। ফুড সাপ্লাই চেইনের অদক্ষতার কারণেই মূলত ভারতের বেশিরভাগ লোকজন অপুষ্টির শিকার। খাদ্য নিরাপত্তা বিলের আওতায় লোকজনকে কম মূল্যে খাবার পাওয়ার অধিকার প্রদান করা যাবে; কিন্তু তাদের খাবার পাওয়া নিশ্চিত করা যাবে না। কাজেই বিলটি নিয়ে সমালোচনার সুযোগ থেকেই যাবে। সবার আগে প্রয়োজন ফুড সাপ্লাই চেইনকে শক্তিশালী করা। এটির দিকে খুব বেশি নজর দিচ্ছে না কোনো সরকারই; দিলে আমজনতার খাদ্যকষ্ট লাঘব হতো। সবার আগে এই বিষয়টি নিয়ে ভাবা জরুরি।