প্রস্টেট ক্যান্সার ও চিকিত্সা

প্রস্টেট ওয়াল নাট আকৃতির ছোট ফাইব্রো মাসকুলার গ্লান্ড যেটা প্রস্রাবের থলির নীচের দিকে তলপেটে অবস্থিত। ইউরেথ্রা বা প্রস্রাবের নালী প্রস্রাবের থলি থেকে যে স্থানে বাহির হয় এটা সেখানে প্রস্রাবের নালী ঘিরে রাখে। প্রস্টেট গ্রন্থি সারা জীবন বৃদ্ধি পেতে পারে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই বৃদ্ধির পরিমাণ বেশী হলে মূত্র নিঃসরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রস্টেট গ্রন্থীতে ক্যান্সার রোগ দেখা দিতে পারে। প্রস্টেট ক্যান্সার ৫০-এর বেশি বয়সের পুরুষের অন্যতম ঘাতক ব্যাধি। প্রস্টেট গ্রন্থিতে ক্যান্সার দেখা দিলে মূত্র নিঃসরণে প্রতিবন্ধকতাসহ প্রস্রাব জনিত নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগ কোন রকম উপসর্গ দেখায় না যখন রোগের লক্ষণ দেখা যায় ধরে নিতে হবে ক্রমান্বয়ে রোগের ব্যপ্তি ঘটছে। রোগের উপসর্গগুলো খুব বেশী দিনের পুরোনো হয় না। উপসর্গের মধ্যে রয়েছে খুব ঘন ঘন প্রস্রাব, রক্ত বর্ণ প্রস্রাব, প্রস্রাব আটকে যাওয়া, রক্ত মিশ্রিত বীর্যপাত হওয়া, পায়খানার রাস্তার আশে-পাশে ব্যথা হওয়া প্রভৃতি। কখনও কখনও এই রোগ ছড়িয়ে যাওয়ার ফলে যে সমস্ত উপসর্গ দেখা দেয় তা নিয়ে রোগী আসতে পারে। যেমন- হাড়ে ব্যথা, মেরুদন্ড বা কোমড়ে হালকা ব্যথা, পা দূর্বল লাগা বা জ্বালা যন্ত্রণা করা, ক্ষুধা মন্দা, ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি নিয়েও রোগী ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হতে পারেন। ইউরোলজিস্টরা রোগীর বর্ণনা ও দৈহিক পরীক্ষার মাধ্যমে মোটামুটিভাবে এ রোগ সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন। উন্নত দেশগুলোতে পঞ্চাশ উর্ধ্ব পুরুষরা বত্সরে অন্তত একবার সেরাম PSA করিয়ে থাকেন বা করাবার চেষ্টা করেন। যদি PSA বেশি থাকে তবে তা মূল্যায়নের জন্য ইউরোলজিস্টদের স্মরণাপন্ন হন। PSA প্রস্টেট ক্যান্সার ছাড়াও প্রোস্টাইটিস, প্রস্টেট এবসেস কিংবা ডিজিটাল রেকটাল এক্সামিনেশন, ট্রান্সরেক্টাল আল্ট্রা সাউন্ড ও ইউরেথ্রাল ইন্সট্রুমেন্টেসন বা ক্যাথেটার করার কারণে বাড়তে পারে। প্রস্টেটের আয়তন বৃদ্ধির সাথে সাথে PSA কিছুটা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং ভুল এড়াবার জন্য ডাক্তাররা সন্দেহজনক ক্ষেত্রে PSA velocity, PSA density, PSA ratio এবং Age adjusted reference range of PSA দেখে থাকেন। PSA velocity হচ্ছে PSA পরিবর্তনের হার, যে সব রোগীর PSA বত্সরে ০.৭৫ mg/ml/gm-র বেশী বাড়তে থাকে তাদের ক্যান্সারের সম্ভবনাও বাড়ে। তবে এখানে শর্ত থাকে যে বেশ কয়েকবার PSA একই ল্যাবরেটরী থেকে অন্তত ১৮ মাস করতে হয়। PSA density হচ্ছে প্রস্টেট গ্লান্ডের আয়তনের সাথে PSA-র যে অনুপাত তাই। PSA level প্রতিগ্রাম প্রস্টেট বৃদ্ধির সাথে ০.১২ mg/ml/gm বাড়তে পারে। যদি এই অনুপাত ০.১৫ mg/ml/gm-এর বেশী হয় এবং PSA ৪.০ থেকে ১০.০ mg/ml হয় এবং DRE ও TRUS-এ সন্দেহজনক না হলেও প্রস্টেট বায়োপসি করার জন্য বলা হয়ে থাকে। Age adjusted reference range of PSA হচ্ছে বয়স বাড়ার সাথে সাথে PSA বৃদ্ধির হার। সাধারণত ৪০-৫০ বত্সর বয়সের জন্য ০-২.৫ mg/ml, ৫০-৬০ বত্সর বয়সের জন্য ০-৩.৫ mg/ml, ৬০-৭০ বত্সর বয়সের জন্য ০-৬.৫ mg/ml. ফ্রি এবং টোটাল PSA অনুপাত নির্ণয়ের মাধ্যমে ক্যান্সার এবং ক্যান্সার বিহীন রোগীদের আলাদা করা যায়। কাট অফ ভেল্যু ১৮% বা তার নীচে হলে ক্যান্সার সন্দেহ করা হয়। ট্রান্সরেক্টাল আল্ট্রা সাউন্ড মেশিনের প্রোব পায়খানার রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে প্রস্টেটের আল্ট্রা সাউন্ড করা হয়। সাধারণত PSA বেশী থাকলে বা ডিজিটাল রেক্টাল পরীক্ষায় সন্দেহ হলে এই পরীক্ষা করা হয়। একই সাথে প্রস্টেটের সন্দেহজনক এলাকা থেকে বায়োপসি নেয়া হয়। প্রস্টেট ক্যান্সারের চিকিত্সা আধুনিক চিকিত্সা বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে প্রস্টেট ক্যান্সারের চিকিত্সারও উন্নতি হয়েছে। ক্যান্সার প্রস্টেটের ভিতরে রয়েছে বা না ছড়িয়েছে তার উপর নির্ভর করে কোন ধরণের চিকিত্সা করা হবে। চিকিত্সার মধ্যে রয়েছে রেডিক্যাল প্রস্টেকটিম, রেডিও থেরাপি, কম্বাইন্ড সার্জিক্যাল ও হরমোন থেরাপি এবং কেমোথেরাপি। প্রতিটি চিকিত্সা পদ্ধতির জন্য রোগী নির্বাচন, সুবিধা অসুবিধা এই স্বল্প পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয়। কারও প্রস্টেট ক্যান্সার ধরা পড়লে ইউরোলজিস্টের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করে চিকিত্সা পদ্ধতি ঠিক করে নেবেন। এখন পর্যন্ত ডাক্তাররা একমত হতে পারেননি কোন চিকিত্সা পদ্ধতি প্রস্টেট ক্যান্সারের জন্য সবচেয়ে ভাল। এর একটা কারণ এই যে প্রস্টেট ক্যান্সার ধীর গতিতে অগ্রসর হয় এবং মারাত্মক আকার ধারণ করতে অনেক বত্সর সময় নেয়। প্রস্টেট ক্যান্সারের প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। খাদ্যাভ্যাসের উপর প্রস্টেট ক্যান্সারের একটা ভূমিকা আছে মনে করা হয়। বিশেষত যারা বেশী চর্বিযুক্ত খাদ্য খান তাদের মধ্যে প্রস্টেট ক্যান্সারের প্রকোপ বেশী দেখা যায় সুতরাং বেশী চর্বিযুক্ত খাদ্য বর্জন বাঞ্ছনীয়। যারা বেশী পরিমাণ সবজি খান বিশেষ করে টমোটো ও সয়া তাদের মধ্যে প্রস্টেট ক্যান্সারের প্রকোপ কম। এছাড়াও ৫০ উর্ধ্ব পুরুষরা নিয়মিত প্রস্টেট ক্যান্সারে স্ক্রিনিং টেস্ট করতে পারেন। এতে ক্যান্সারের সূচনাতেই রোগ ধরা পড়ে এবং তখন এর চিকিত্সা সহজ হয়।