আর্থিক প্রতিবেদনে ভুল তথ্যের প্রবণতা চরমে

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা আনতে ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরেই ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট পাস ও তা কার্যকর করার দাবি জানিয়ে আসছেন শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা। সমপ্রতি বিভিন্ন কোম্পানিতে দুর্নীতি হওয়ার পর নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট না হওয়ায় এ দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাবিত ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হয়েছে। কিন্তু এ আইনের বিরোধিতা করছে নিরীক্ষকদের নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠন আইসিএবি (ইন্সটিটিউট অব চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ)। শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের বেশিরভাগ কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনেই ত্রুটি দেখা যায়। এসব ত্রুটি চিহ্নিত করে কোম্পানির দুর্নীতি ও প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিরীক্ষকদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় প্রস্তাবিত আইনটি হলে অনেক ক্ষেত্রেই নিরীক্ষদের দুর্নীতি বন্ধ হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া নিরীক্ষকদের দুর্নীতি ও ভুলের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা থাকায় প্রতিবেদনের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত হবে। যা চূড়ান্তভাবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের ত্রুটির সংস্কৃতি অনেক পুরনো। ভুল তথ্য দিয়ে ফায়দা লুটে নেয়ার জন্য অনেক কোম্পানিই এ কাজ করে থাকে। এ প্রসঙ্গে সমপ্রতি বিএসইসি’র সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কোম্পানির যে প্রতিবেদন দেয়া হয় তা দেখলে মনে হয়, দেশ অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। কোম্পানিগুলোর পরিস্থিতি অনেক ভালো। একই কোম্পানির যে প্রতিবেদন রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) দেয়া হয় তা দেখলে মনে হয় ওই কোম্পানির দৈন্যদশা চরমে পৌঁছে গেছে। এ থেকেই স্পষ্ট হয়, আর্থিক প্রতিবেদনে ভুল তথ্য দেয়ার প্রবণতা কতটা চরমে উঠেছে। তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট দ্রুত পাস করা ও তা কার্যকর করা প্রয়োজন। জানা গেছে, ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্টের আওতায় ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, এসইসি চেয়ারম্যান, আইডিআরএ’র চেয়ারম্যান, আইসিএবি প্রেসিডেন্টদের নিয়ে এ কাউন্সিল করা হবে। এই কাউন্সিল নিরীক্ষা কার্যক্রমের ‘সুপার নিয়ন্ত্রক’ হিসাবে কাজ করবেন। আইসিএবি’র দাবি, এ পেশায় বিশেষজ্ঞ না হয়েও পেশার নিয়ন্ত্রণে কাউকে সংযুক্ত করা হলে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। আইসিএবি প্রেসিডেন্ট মো. আবদুস সালাম এফসিএ বলেন, আইসিএবি নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করে। এ অবস্থায় ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) গঠনের মাধ্যমে সুপার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হলে কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। আইনটির বিভিন্ন ধারা-উপধারা একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে আবদুস সালাম আরও বলেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবতা বিবর্জিত ও আইনের অস্পষ্টতার কারণে মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। সরকার যে উদ্দেশ্যে এটি করতে চাচ্ছে আইসিএবি অর্ডারের সংশোধনীর মাধ্যমেই সেটি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, নিরীক্ষা সংক্রান্ত আইন, বিধি বা বিধান লঙ্ঘন করলে এমন শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে যা নিরীক্ষকদের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এর ফলে মেধাবী কোন ছাত্র ভবিষ্যতে পেশাদার হিসাববিদ হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করবে না। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রেসিডেন্ট আহসানুল ইসলাম টিটু এ প্রসঙ্গে বলেছেন, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ করে। কিন্তু কোম্পানির সংখ্যা ও নিরীক্ষকের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় এখন পৃথক নিয়ন্ত্রক জরুরি হয়ে পড়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে নিরীক্ষকদের কার্যক্রমে আইসিএবি’র ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এজন্যই সুপার নিয়ন্ত্রক প্রয়োজন। তাছাড়া দেশিয় হিসাব ও নিরীক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক কাঠামোতেও আনা দরকার। আহসানুল ইসলাম টিটু আরও বলেন, আইসিএবি নিরীক্ষকদের নিয়ন্ত্রণের জন্য যা করেছে তা খুব খারাপ নয়। তবে তা যথেষ্টও নয়। স্বচ্ছতার জন্য এফআরসি’র প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার যে আইন করছে তাতে কিছু অসঙ্গতি থাকতে পারে। আইসিএবি’র সঙ্গে আলোচনা করে এর সমাধান করা যেতে পারে। তাছাড়া এফআরসিতে সিএদের অংশগ্রহণ বাড়ানোও উচিত বলে মত দেন ডিএসই প্রেসিডেন্ট। একই কথা বলছেন খোদ আইসিএবি’র একাধিক সদস্য। ফেরদৌস আহমেদ খান এফসিএ বলেন, আইসিএবি’র নিয়ন্ত্রণ বিতর্কিত হয়ে গেছে। ফলে পরিবর্তনকে (নতুন অ্যাক্ট) স্বাগত জানিয়ে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।