রামপাল বিদ্যুেকন্দ্র : সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য

পরিবেশ রক্ষার জন্য একটি দেশের মোট বনভূমির ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা দরকার। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে এই বনাঞ্চলের মাত্র ৭ শতাংশ রয়েছে। আর এই ৭ শতাংশের বেশি অংশ রয়েছে আমাদের সুন্দরবনকে ঘিরে। সমপ্রতি এই সুন্দরবনও ধ্বংসের পথে। এককথায় বলতে গেলে রামপাল কয়লা বিদ্যুেকন্দ্র সুন্দরবনের ধ্বংস ডেকে আনবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কয়লা দিয়ে বিদ্যুত্ উত্পাদনের ঘোর আপত্তি করছে। কারণ এতে পরিবেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। কিন্তু আমাদের দেশে কেন এমন একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো তা বোধগম্য নয়। ভারত বাংলাদেশে এই বিদ্যুত্ প্রকল্প করতে বেশ আগ্রহী। অথচ খোদ তাদের দেশে এই বিদ্যুত্ প্রকল্প তারা করেনি। ২০১০ সালে ভারতের ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়— ‘মধ্যপ্রদেশে এনটিপিসির কয়লাভিত্তিক প্রকল্প বাতিল’ এমন শিরোনামে একটি খবর। খবরে বলা হয়, জনবসতি সম্পন্ন এলাকায় কৃষিজমির ওপর তাপ বিদ্যুেকন্দ্র গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে ১৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুেকন্দ্র উত্পাদন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়নি। তাহলে প্রশ্ন— বাংলাদেশে কেন এমন বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ করার অনুমতি দেওয়া হলো? বাংলাদেশ ভারত জয়েন্ট ভেঞ্চারে বাগেরহাটের রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াটের (২×৬৬০) একটি বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও ভারতের ন্যাশনাল থার্মান পাওয়ার কোম্পানি (এনটিপিসি)-এর যৌথ অর্থায়নে এই বিদ্যুেকন্দ্রটি নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে ২৯ জানুয়ারি ২০১২। বিদ্যুতের দাম, কয়লার উত্স নির্ধারণ না করেই এবং কৃষিজমি নষ্ট ও পরিবেশগত প্রভাব বিষয়ক আপত্তি উপেক্ষা করেই এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। রামপাল উপজেলার সাপমারি, কাটাখালি ও কৈগরদাসকাঠি মৌজায় বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ১,৮৩৪ একর ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু করেছে। এর ফলে ৮ হাজার পরিবার উচ্ছেদ হবে। রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রে কর্মসংস্থান হতে পারে সর্বোচ্চ ৬০০ জনের, ফলে উদ্বাস্তুু এবং কর্মহীন হয়ে যাবে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ পরিবার। শুধু তাই নয়, আমরা প্রতিবছর হারাবো কয়েক কোটি টাকার কৃষিজ উত্পাদন। গবেষকদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— অবারিত কয়লা পোড়ানোর ফলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, সালফার-ডাই-অক্সাইড, নাইট্রিক অ্যাসিড বায়ুমণ্ডলে নির্গত হবে। ৫০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক একটি বিদ্যুেকন্দ্র ১৮ মিলিয়ন টন সালফার-ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছাড়ে। সেই হিসেবে রামপালে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুেকন্দ্র থেকে ৪০ মিলিয়ন টনের মতো সালফার-ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে। এসব রাসায়নিক উপাদান বৃষ্টির পানির সঙ্গে ক্রিয়া করে অ্যাসিড বৃষ্টি ঘটাবে। এতে মাটির উর্বরতা হ্রাস পাবে। উদ্ভিদের বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুন্দরবন সংলগ্ন পশুর নদীতে পানির সংকট দেখা দেবে। সুন্দরবনকে বাঁচাতে সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন। সেইসঙ্গে কৃষিজমি রক্ষা কমিটির দাবি খাসজমিতে এ প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত। এ বিদ্যুেকন্দ্রর জন্য কয়লার পরিবর্তে ফার্নেস ওয়েল ব্যবহারের বিষয়টি আরেকবার ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই। সুন্দরবনকে বাংলাদেশের পরিবেশের ক্ষেত্রে একমাত্র প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। সুন্দরবন কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয় আমাদের জীবন-জীবিকার জাতীয় স্বার্থেই নিশ্চিত হওয়া দরকার, কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুেকন্দ্রটি আসলেই কতখানি ক্ষতি করবে সে স্বার্থকে? পরিবেশের এই অপার সৌন্দর্য তাই ধ্বংস নয় তাকে রক্ষার জন্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসা জরুরি। প্রয়োজনে আমাদের অবহেলিত বিদ্যুত্ প্রকল্পগুলোর উন্নয়ন করলে আরো ভালো বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে পারবে। চট্টগ্রাম কলেজ